চুল পাকার সঙ্গে ক্যানসারের কী সম্পর্ক?
পাকা চুলকে সাধারণত বয়স বাড়ার স্বাভাবিক লক্ষণ হিসেবেই দেখা হয়। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, চুলের রং হারানোর পেছনে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কাজ করতে পারে। গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিছু পরিস্থিতিতে চুল পেকে যাওয়া ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে শরীরের কোষীয় প্রতিক্রিয়ার অংশ হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এর প্রধান প্রমাণ এসেছে ইঁদুরের ওপর গবেষণা থেকে।
গবেষণায় চুলের রং হারানো এবং ক্যানসারের সঙ্গে কোষের ডিএনএ ক্ষতির সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে কোষে ক্ষতি জমতে থাকে। আবার ডিএনএতে ত্রুটি থাকা কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করলে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে মেলানোসাইট স্টেম সেল। চুলের ফলিকলের গভীরে থাকা এসব স্টেম সেল থেকেই মেলানোসাইট তৈরি হয়। মেলানোসাইট চুল ও ত্বকে রং দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পিগমেন্ট উৎপাদন করে। স্বাভাবিক অবস্থায় মেলানোসাইট স্টেম সেল চুলের বৃদ্ধি ও ঝরে পড়ার চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন রং তৈরির কোষ তৈরি করে।
কিন্তু ডিএনএতে গুরুতর ক্ষতি হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। গবেষকরা দেখেছেন, ডিএনএর ডাবল-স্ট্র্যান্ড ব্রেক হলে মেলানোসাইট স্টেম সেল ‘সেনো-ডিফারেনশিয়েশন’ নামের একটি প্রক্রিয়ায় যেতে পারে। এতে স্টেম সেলগুলো স্থায়ীভাবে পরিণত কোষে রূপ নেয় এবং স্টেম সেলের ভান্ডার থেকে হারিয়ে যায়। ফলে নতুন মেলানোসাইট তৈরির ক্ষমতা কমে গিয়ে চুল ধীরে ধীরে পেকে যেতে পারে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়াটি ক্ষতিগ্রস্ত স্টেম সেলকে শরীর থেকে কার্যত সরিয়ে দেওয়ার একটি উপায় হতে পারে। অর্থাৎ, ডিএনএতে গুরুতর ত্রুটি থাকা কোনো স্টেম সেল যদি স্বাভাবিকভাবে নিজেকে পুনরুৎপাদন করতে না পারে, সেটিকে পরিণত কোষে ঠেলে দিয়ে স্টেম সেলের ভান্ডার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ওই কোষের ক্যানসারে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাও কমতে পারে।
তবে সব ধরনের ক্ষতির ক্ষেত্রে একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। গবেষণায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক এবং অতিবেগুনি-বি (UVB) রশ্মির প্রভাবও পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, এসব ক্যানসার-সৃষ্টিকারী চাপ মেলানোসাইট স্টেম সেলের স্বাভাবিক ‘সেনো-ডিফারেনশিয়েশন’ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কিছু স্টেম সেল টিকে থেকে নিজেদের পুনরুৎপাদন করতে থাকে।
গবেষণায় এর পেছনে আশপাশের কোষ ও টিস্যুর সংকেতেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড বিপাক এবং টিস্যু থেকে আসা KIT ligand-সংক্রান্ত সংকেত মেলানোসাইট স্টেম সেলকে স্বাভাবিকভাবে হারিয়ে যাওয়ার বদলে টিকে থাকা ও পুনরুৎপাদনে উৎসাহিত করতে পারে। এর ফলে মেলানোমা তৈরির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।
অর্থাৎ একই ধরনের স্টেম সেল ক্ষতির মুখে পড়লেও তার পরিণতি সবসময় এক নয়। ক্ষতির ধরন এবং আশপাশের টিস্যু থেকে আসা সংকেতের ওপর নির্ভর করে স্টেম সেল হয় নিঃশেষ হয়ে চুল পাকার দিকে যেতে পারে, নয়তো টিকে থেকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে। গবেষকরা এই দুই বিপরীত পরিণতির মধ্যকার সম্পর্ককেই চুল পাকা ও মেলানোমার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পাকা চুল নিজেই ক্যানসারের বিরুদ্ধে কোনো ‘ঢাল’ বা ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি কমানোর নিশ্চয়তা। বরং গবেষণাটি দেখিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট কোষীয় সুরক্ষা প্রক্রিয়ার ফলে মেলানোসাইট স্টেম সেল কমে গেলে তার দৃশ্যমান ফল হিসেবে চুল পেকে যেতে পারে। অন্যদিকে, ক্যানসার-সৃষ্টিকারী পরিবেশ সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করলে একই স্টেম সেল ক্যানসারের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, এর প্রধান পরীক্ষাগুলো ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হয়েছে। তাই মানুষের মেলানোসাইট স্টেম সেল একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। গবেষকেরাও মানুষের ক্ষেত্রে এই ফল সরাসরি প্রয়োগ করার আগে আরও প্রমাণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
তবু এই গবেষণা বার্ধক্য ও ক্যানসারের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে নতুন একটি দিক তুলে ধরেছে। কোন সংকেত স্টেম সেলকে নিঃশেষ করে দেয় এবং কোন সংকেত তাকে অস্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করে, তা আরও ভালোভাবে বোঝা গেলে ভবিষ্যতে ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসার নতুন কৌশল তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে পাকা চুলকে শুধু বয়সের ছাপ হিসেবে দেখার বাইরে গিয়ে গবেষণাটি শরীরের কোষীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি জটিল চিত্র তুলে ধরেছে। চুলের রং হারানো এবং মেলানোমার বিকাশ—দুটি ভিন্ন ফল হলেও, এর পেছনে মেলানোসাইট স্টেম সেলের ভাগ্য নির্ধারণের একই ধরনের জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে।
.png)