ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

শতকোটির মালিক রাজউকের নির্মলকে থামাবে কে?

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭:১৪, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শতকোটির মালিক রাজউকের নির্মলকে থামাবে কে?
রাজউকের ইমারত পরিদর্শক নির্মল মালো

বিগত সরকারের আমলে সরকারি চাকরি যেন আলাদিনের চেরাগ হয়ে উঠেছিল—এমন অভিযোগ এখন আর নতুন নয়। তবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একজন ইমারত পরিদর্শকের ক্ষেত্রে সেই অভিযোগ আরও তীব্র ও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। মাত্র ছয়-সাত বছরের চাকরি জীবনে গোপালগঞ্জের নির্মল মালো অগাধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। শতকোটি টাকার মালিকানা, নামে-বেনামে জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাট-গাড়ি, ঘুষ ও হয়রানির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জন—এসব অভিযোগ তাকে ঘিরে ঘনীভূত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, রাজউকের এই কর্মকর্তাকে থামাবে কে?

কে এই নির্মল মালো? মাদারীপুরের রাজৈর থেকে এসে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় বসবাস শুরু করেন তার পিতা নিত্যগোপাল মালো। তিনি পোনা মাছের ব্যবসা শুরু করেন। কোটালীপাড়া আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এবং সনাতন ধর্মের লোক হওয়ায় স্থানীয়দের সহানুভূতি পেয়ে খুব অল্পতেই কোটালীপাড়া উপজেলা মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি পদ বাগিয়ে নেন বলে জানা যায়। নিত্যগোপাল মালোর বড় ছেলে নির্মল মালো ঢাকার এক প্রাইভেট ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেন। বাবার রাজনৈতিক শক্তি ও টাকার জোরে ২০১৮ সালে রাজউকের ইমারত পরিদর্শক পদের চাকরি পান এবং ঢাকার রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে যোগদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি চাকরিতে যোগদান করেই যেন হাতে পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ।

Advertisement

পূর্বে তিনি রাজউকের মহাখালী জোনে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে দক্ষিণখানসহ বিভিন্ন জোনে পদায়ন হয়েছেন। বিভিন্ন জোন ঘুরে ফিরে এখন তিনি অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ নুর আলমের (নূরে আলম) ছত্রছায়ায় রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ছয়-সাত বছর চাকরি করে তার সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠার চিত্র আরও বিস্তৃত। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের আমবাড়ীতে প্রায় ৪০ বিঘা জমির মাছের ঘের, বরিশালের উজিরপুরের সাতলা বাগধায় ৩৫ বিঘা জমির মাছের ঘের, কোটালীপাড়া পৌরসভার বাগান উত্তরপাড়ায় ২০ বিঘা জমির ওপর পোল্ট্রি ফার্ম, একই এলাকার কমলকুড়ী স্কুল সড়কে নিজের নামে ১০ কাঠা জায়গার ওপর কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ডুপ্লেক্স বাড়ি। এছাড়া ঢাকার মগবাজার, আফতাব নগর, পুরান ঢাকার ওয়ারী, কুড়িল বিশ্ব রোডে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট; ঢাকায় দামি প্রাইভেটকার এবং নিজে ব্যবহারের জন্য অন্তত তিনটি দামি মোটরসাইকেল—এসবের কথা উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। এলাকাবাসী ও সূত্রগুলো দাবি করে, নামে-বেনামে বিভিন্ন এলাকায় জমি ক্রয় করেছেন তিনি। বাবার ভাঙা টিনের ঘর ভেঙে পাকা ভবন নির্মাণ এবং পরিবারের প্রভাব বৃদ্ধির চিত্রও বর্ণনা করা হয়েছে।

নির্মল মালো রাজউকের অন্তর্ভুক্ত দক্ষিণখান ও মহাখালী অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে অবৈধ আয়ের অভিযোগের রহস্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার নির্মাণাধীন ভবন মালিকরা বলেন, এলাকায় রাজউকের নিয়ম না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণ হওয়ায় সুযোগ পেয়ে যান ইমারত পরিদর্শক নির্মল মালো। বেশিরভাগ মালিকানা ও ডেভেলপার কোম্পানির যোগসাজশে ঘুষ লেনদেন ও অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে অবৈধ অর্থ কামিয়েছেন বলে অভিযোগ। ডেভিয়েশন, সরু রাস্তা, ভবনের আউটডোর-ইনডোর, রাজউকের নকশা বহির্ভূত বিধিমালায় ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন অজুহাতে নোটিশের মাধ্যমে ভবন মালিক বা ডেভেলপারদের অফিসে ডেকে আনতেন তিনি। এরপর বর্ধিতাংশ অপসারণ, ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধসহ বিভিন্ন রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতি বাড়ি থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিতেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।

নির্মল মালোর বাড়িতে দীর্ঘদিন দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত নিহার রঞ্জন এবং কোটালীপাড়ার একাধিক ব্যক্তি তার অবৈধ সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন। বিষয়টি মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি কর্কশ ভাষা ব্যবহার করেন এবং এক পর্যায়ে পুরো কোটালীপাড়া নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন। তদন্তে জানা গেছে, তিনি এলাকার উঠতিগোছের নেতাদের টাকার বিনিময়ে হাত করে রাখেন বলে অভিযোগ। এমন সব দুর্নীতি-অনিয়ম ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের কথা জানতে তার অফিসে গিয়ে না পেয়ে মুঠোফোনে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ না করে একাধিক মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে রিপোর্ট না করার জন্য অনুরোধ করান।

এদিকে বিভিন্ন জোন ঘুরে ফিরে নির্মল মালো এখন অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ নুর আলমের ছত্রছায়ায় রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নূরে আলমের বিরুদ্ধেও রাজউকে নকশা অনুমোদন, ভবনের অনুমোদন, আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন, ঊর্ধ্বগতি ও অবৈধ অংশসহ নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ভবন মালিকদের জিম্মি করে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ, ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায় এবং শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার মতো অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। এক আবাসন ব্যবসায়ীর কাছে নকশা অনুমোদনের বিনিময়ে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে। নূরে আলমকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেন না। অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায় না।

রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমাতে ডিজিটাল সেবা আরও গতিশীল করা হবে। অবৈধ নির্মাণ ও বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।” তিনি আরও জানিয়েছেন, অনুমোদিত নকশা ও মানদণ্ড নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্ট ও নিয়মিত পরিদর্শন চলমান।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠানে নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ বারবার উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত, সম্পদ যাচাই এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে দুর্নীতির চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া নগর পরিকল্পনা সুরক্ষিত থাকে না।”

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, “অপরিকল্পিত নির্মাণ ও বিধি লঙ্ঘন শুধু ভূমিকম্প ঝুঁকি বাড়ায় না, দুর্নীতির সুযোগও সৃষ্টি করে। কঠোর আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে নূরে আলমের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার বা তদন্ত চলার কথা বলা হয়েছে। তবে নির্মল মালোর বিষয়ে তিনি বলেন, নির্মল তার এখানে নতুন জয়েন করেছে। আগে কোথায় কি করেছে সেবিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দিবেন না। তাছাড়া বিষয়টি তার কর্তৃপক্ষের নজরে আছে বলে তিনি জানান। 
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। এসব অভিযোগ গুরুতর। ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে দুদক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্বচ্ছ তদন্ত, সম্পদ অনুসন্ধান ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। অনুসন্ধান চলমান এবং বিষয়গুলো আরও যাচাই-বাছাইয়ের অপেক্ষায়।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস
স্পটলাইট জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!