ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

চোখের কারণে বিমানচালক হতে না পারা রাজাই এখন জিম্বাবুয়ের স্বপ্নের পাইলট

আসাদুজ্জামান লিটন
প্রকাশিত: ১৮:২৬, ২৮ অক্টোবর ২০২২
চোখের কারণে বিমানচালক হতে না পারা রাজাই এখন জিম্বাবুয়ের স্বপ্নের পাইলট
সিকান্দার রাজা

অষ্টম টি-২০ বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন পাকিস্তানের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের জয়। যেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন জিম্বাবুইয়ান অলরাউন্ডার সিকান্দার রাজা। অবাক হলেও সত্য, এই অলরাউন্ডারের জন্মভূমি পাকিস্তান।

জীবন যদি রুটিন মেনে চলত তা হলে হয়তো পার্থে বল হাতে পাকিস্তানকে শেষ করতে নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে বিমান নিয়ে উড়ে বেড়াতে দেখা যেত সিকান্দার রাজাকে। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার, ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন তিনি কোনো দিনই দেখেনইনি!

রাজার চোখে ছিল পাকিস্তানের বিমানবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধবিমানের পাইলট হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে যায়। এরপর জীবন রাজাকে নিয়ে যায় অন্য পথে। নীল দিগন্তের বদলে তার বিচরণক্ষেত্র এখন সবুজ ঘাস আর ২২ গজ।

Advertisement

পাকিস্তানের শিয়ালকোটে সিকান্দার রাজার জন্ম। বড় হওয়া সেখানেই। পাকিস্তানের লোয়ার টোপায় তিন বছর বিমানবাহিনীর বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তিনি। শেষ ধাপে গিয়ে চোখের সমস্যার জন্য ব্যর্থ হন, বাদ পড়েন।

রাজার ‘বাইলেনট্রিকাল ওপাসিটি’ রয়েছে। অর্থাৎ বেশি উচ্চতায় বিমান ওড়ানোর সময় সামনে কোনো বস্তু চলে এলে সেটি দেখতে পারবেন না। সে সময় তাকে অনেক সান্ত্বনা দেন প্রশিক্ষকরা। বিমানবাহিনীতে অন্য কাজ করতে বলেন।

তখন রাজার জবাব ছিল, আমি এখানে যুদ্ধবিমানের পাইলট হতে এসেছি। সেটা হতে না পারলে থাকার দরকার নেই। এরপর রাজা ঠিক করেন তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হবেন। ভর্তি হন স্কটল্যান্ডের একটি কলেজে।

ঠিক সেই সময়েই রাজার গোটা পরিবার জিম্বাবুয়েতে চলে যায়। স্থানীয় কলেজ এবং ক্লাবে তখন থেকেই রাজার ক্রিকেট খেলা শুরু। কখনোই পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। তবে ভালোবাসার টানে জিম্বাবুয়েতে ফিরে ক্রিকেট খেলতে থাকেন।

জীবন কতই না অনিশ্চিত! একদিন ক্লাবের সতীর্থদের সঙ্গে থ্রো ডাউন সেশন করার মাঝে দেশটির টি-২০ লিগের ক্লাব সাউদার্ন রকসের চেয়ারম্যান রাজাকে দেখে ফেলেন। তিনি তার ক্লাবের নেটে রাজাকে অনুশীলনে আসতে বলেন। পরদিন সকালে তিন ঘণ্টার সড়কপথে অনুশীলনে যান এই অলরাউন্ডার।

কয়েক সপ্তাহ পরেই ব্রায়ান লারার সঙ্গে ক্লাবের হয়ে ওপেন করা শুরু করেন রাজা। প্রথম ম্যাচেই খেলেন ৪০ বলে ৯৩ রানের ঝড়ো ইনিংস। সেই থেকে শুরু। ধীরে ধীরে সুযোগ খুলে যায় জিম্বাবুয়ের জাতীয় দলে খেলার। ওপেনার হিসেবে শুরু করলেও ধীরে ধীরে মিডল অর্ডারে ব্যাট করতে থাকেন রাজা। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি টেস্টে সেঞ্চুরির দেখা পান। 

এসবের পাশাপাশি অফ স্পিন বোলিংয়ে শান দিতে থাকেন রাজা। অনেকেই তার বর্তমান বোলিংয়ের সঙ্গে সুনীল নারাইনের মিল খুঁজে পেয়েছেন। রাজা নিজেও নারাইনের ভক্ত। ক্যারিবিয়ান বোলারের মতোই বল ধরা হাতটাকে পিছনে লুকিয়ে রেখে এগিয়ে আসেন দুলকি চালে। শেষ মুহূর্তে হাত থেকে বল ছুঁড়ে মারেন।

অধিকাংশ সময় ব্যাটাররা বুঝতে পারেন না, রাজা কী ধরনের বল করছেন। ফলে সাফল্য মিলছে আগের চেয়ে বেশি। এখানেও আছে ভাগ্যের অবদান! বছর দুয়েক আগে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ধরা পড়েছিল রাজার। সুস্থ হওয়ার পর বোলিং অ্যাকশন বদলাতে হত। তখনই নারাইনের সাহায্য নিয়ে নিজের বোলিং অ্যাকশন বদলে ফেলেন রাজা। 

পাকিস্তানকে হারিয়ে রাজা বলেন, অনেক দেরিতে ক্রিকেট খেলা শুরু করেছি। এখন সময়টা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। ওপরের দিকে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে খেলার বেশি সুযোগ পাই না। ফ্লাডলাইটে খেলাও আমাদের কাছে স্বপ্ন। পার্থে প্রথমবার ম্যাচ খেলতে নামলাম। সেখানে দলকে জেতাতে পেরে খুব ভাল লাগছে।

এখন রাজার চোখে আরো বড় কিছুর স্বপ্ন। যুদ্ধবিমান নিয়ে দেশের জন্য নীল আকাশে উড়তে না পারলেও জিম্বাবুয়ের জন্য সবুজ গালিচায় উজার করে দেন নিজের সর্বোচ্চ। সবদিন সাফল্য মেলে তা না। তবে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই অলরাউন্ডারের ডানাতেই যে জিম্বাবুয়ের স্বপ্ন ওড়ে, সেটা তিনি নিজেও জানেন।

রাজা উড়ে যাক আরো বহুদূর। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটকে পুরনো মহিমায় ফেরাতে তার উড়ে চলাই যে বড্ড প্রয়োজন। দেশটির স্বপ্নের পাইলট সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠবেন আরো ওপরে, এটাই সবার চাওয়া।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!