কাতার বিশ্বকাপ বঞ্চিতদের শীর্ষ একাদশ
আজ রোববার থেকে কাতারে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের জমজমাট লড়াই। ২০ নভেম্বর শুরু হয়ে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক মাসের ২২তম এই লড়াইয়ে ৩২টি দেশ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে। তবে ইনজুরি এবং নিজ দেশ সুযোগ না পাওয়ায় বিশ্বের অনেক মেধাবী তারকাও নিজেদের দক্ষতা দেখানেরা সুযোগ পাচ্ছেনা এবারের বিশ্বকাপে।
বিশ্বকাপ বঞ্চিত শীর্ষ তারকা একাদশ :
জিয়ানলুইজি ডোনারুমা (ইতালি):
.png)
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গোল রক্ষকদের মধ্যে অন্যতম প্যারিস সেন্ট জার্মেই’র (পিএসজি) ২৩ বছর বয়সি এই গোল রক্ষক ইতালীর হয়ে উত্তর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে প্লে অফে অংশ নিলেও একটি গোল হজম করেছিলেন। ফলে ১-০ গোলে পরাজয় মেনে নিতে হয় চার বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। এখানেই শেষ নয়, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জয় করার মাত্র আট মাসের মধ্যেই এই পরাজয় ইতালিকে ছিটকে দিয়েছে কাতার বিশ্বকাপ থেকে। যে কারণে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোল রক্ষক হওয়া সত্বেও কাতার সফরে যেতে পারছেন না ডোনারুমা। যদিও এখনো বয়সে তরুণ, তাই এক সময় বিশ্ব মঞ্চে দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ তার থাকছে বলেই আশা করছে ভক্তরা।
রিচি জেমস (ইংল্যান্ড):
বিগত চার বছরের মধ্যে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে বেশ দ্রুতই সেরা ফুল ব্যাকের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ২২ বছর বয়সি রিচি জেমস। রাইট ব্যাকের পজিশনে ইংল্যান্ড দলের অনেকগুলো বিকল্প থাকলেও ইতোমধ্যে চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জয় করা জেমসের ছিল ইংল্যান্ড দলের মুল একাদশে খেলার সুবর্ণ সুযোগ। গত সেপ্টেম্বরে জার্মানির বিপক্ষে সাউথ গেটের গড়া পূর্ণ শক্তির দলে যুক্ত ছিলেন জেমস। ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া ওই ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে ছিলেন তিনি। কিন্তু ইনজুরির কারণে কাতার বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পুরণ হলোনা জেমসের।
ডেভিড আলাবা (অস্ট্রিয়া):
বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী অস্ট্রিয়ার ওই আন্তর্জাতিক তারকা বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদের সেন্টার ব্যাক হিসেবে খেলছেন। এর আগে বায়ার্ন মিউনিখে ১৩ বছর কাটিয়ে গত বছর স্প্যানিশ ক্লাবে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। লেফট ব্যাকেও দুর্দান্ত এই ডিফেন্ডার। কারণ জার্মানিতে অধিকাংশ সময় ওই পজিশনে খেলে এসেছেন আলাবা। অস্ট্রিয়ান জাতীয় দলের হয়ে ৯৬ টি ম্যাচ খেলা ৩০ বছর বয়সি এই তারকা এখনো দেশটির জন্য অপরিহার্য্য তারকা। তবে দুর্ভাগ্যজনক সত্য হল তিনি কখনো বিশ্ব মঞ্চে খেলার স্বাদ নিতে পারেননি। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে নিজ গ্রুপে তার দেশ অস্ট্রিয়ার অবস্থান ছিল চতুর্থ। ওই গ্রুপে তাদের চেয়ে এগিয়ে ছিল ডেনমার্ক, স্কটল্যান্ড এবং ইসরায়েল।
অবশ্য নেশন্স লিগের প্লে অফে খেলার মাধ্যমেও এগিয়ে যাবার সুযোগ ছিল অস্ট্রিয়ার। কিন্তু সেখানে তাদেরকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছে গ্যারেথ বেলের ওয়েলস। যার সুবাদে ২৪ বছর পর বিশ্ব মঞ্চে খেলার সুযোগ পেল ওয়েরস।
লিওনার্দো বনুচ্চি (ইতালি):
ইউরো’র ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শিরোপা জয়ী ইতালীর হয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কার পেয়েছিলেন বনুচ্চি। অবশ্য ইউরো ফাইনালে অংশ নেয়া খেলোয়াড়দের সাতজন ফুটবলার উত্তর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে হেরে যাওয়া প্লে অফ ম্যাচে খেললেও সেখানে ছিলেননা বনুচ্চি। ইনজুরির কারণে দলের বাইরে ছিলেন তিনি। যেহেতু ওই পরাজয়ে বিশ্বমঞ্চে যেতে পারেনি ইতালি, তাই বনুচ্চিও বঞ্চিত হচ্ছেনন কাতার সফর থেকে।
জিওর্জিও চিয়েলিনি(ইতালি):
লস এঞ্জেলস এফসির হয়ে খেলা ৩৮ বছর বয়সি এই ইতালীয় তারকার নাম এই তালিকায় কিভাবে আসতে পারে সেটি নিয়ে হয়তো আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু মাত্র এক বছর পেরিয়েছে তিনি ইতালীয় দলের হয়ে ইউরো জয় করেছেন। আর ডিফেন্ডাররা সাধারণত এক বছরের মধ্যেই তাদের পুরো সামর্থ্য হারায় না।
ইতালির হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকা চিয়েলিনি এ পর্যন্ত খেলেছেন ১১৭টি। ইনজুরির কারণে মেসিডোনিয়ার কাছে আপসেট ঘটা ম্যাচে বদলী হিসেবে খেলেছেন তিনি। তবে ওই হার তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্তে ভুমিকা রেখেছে।
এনগোলো কন্টে (ফ্রান্স):
অসাধারণ ক্রীড়া শৈলির কারণে প্রায় এক দশক ধরে বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডাদের তালিকা দখল করে রেখেছেন এই ফরাসি তারকা। তবে এখন বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করেছে ৩১ বয়সি এই তারকার মধ্যে। প্রিমিয়ার লিগে এই মৌসুমে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। যার শেষটি ছিল গত আগস্টে। দীর্ঘ ইনজুরি তাকে বিশ্বকাপের স্কোয়াড থেকেও ছিটকে দিয়েছে। তার অনুপস্থিতি অবশ্য বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের সামর্থ্যের ভাটা পড়তে পারে। চার বছর আগে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ফরাসি দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন কন্টে। আসরে ফ্রান্সের সাত ম্যাচের সবকটিতেই খেলেছেন তিনি।
জর্জিনহো (ইতালি):
স্ট্যান্ডবাই হিসেবে গত ইউরোতে ইতালীয় স্কোয়াডে থাকা জর্জিনহো অবশ্য শেষ পর্যন্ত দলের হয়ে খেলেছেন এবং জিয়ানলুইজি ডোনারুমার সঙ্গে টুর্নামেন্ট সেরার খেতাব পেয়েছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জয়েও চেলসির হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছেন এই ইতালিয় তারকা। ইংলিশ ক্লাবটির হয়ে টানা ৫ বছর ধরে মুখ্য খেলোয়াড়ের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তবে সেই উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে পরাজয় ইতালীকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেয়। সেই সঙ্গে বিশ্ব মঞ্চ থেকে ছিটকে যান জর্জিনহো।
মার্কো ভেরাত্তি (ইতালি): প্রকৃতি পদত্ত বিশ্ব সেরা মেধাবী মিডফিল্ডারদের একজন ভেরাত্তি, যিনি পিএসজির হয়ে প্রায় এক যুগ ধরে নিয়মিত ভাবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এই সময় লিগ ওয়ানের রেকর্ড শিরোপা জয় করেছে প্যারিসের ক্লাবটি।
ইতালীর হয়ে ২০২০ ইউরোতে প্রথম দুটি ম্যাচে অংশ না নিলেও পরের ম্যাচগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে ইতালিকে পৌঁছে দিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের আসনে। তবে দল ব্যর্থ হওয়ায় তার মতো মেধাবী তারকাও খেলতে পারছেননা কাতার বিশ্বকাপে।
ফেদেরিকো চিয়েজা (ইতালি):
ইতালীর ইউরো জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করা তারকা চিয়েজা স্পেনের বিপক্ষে জয় পাওয়া ওই আসরের সেমি ফাইনালে জিতেছিলেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার। এরপর অবশ্য উত্থান পতনের মধ্যে সময় কাটিয়েছেন ২৫ বছর বয়সি এই তারকা। গত জানুয়ারিতে জুভেন্টাসের হয়ে রোমার বিপক্ষে ম্যাচে ইনজুরিতে পড়েন তিনি। ফলে বাদ পড়েন ইতালির বিশ্বকাপ বাছাইয়ের স্কোয়াড থেকে। চলতি মাসের শুরুতে অবশ্য জুভেন্টাসের হয়ে মাঠে ফিরেছেন তিনি। পিএসজির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বদলী হিসেবে খেলেছেন। তবে ইতালী যদি বিশ্বকাপে খেলার যোগত্যা অর্জন করতো তাহলেও ফিটনেস জনীত কারণে কাতারে খেলার সুযোগ পেতেন না এই ফুটবলার।
মোহামেদ সালাহ (মিশর):
বেশ কয়েক বছর ধরে প্রিমিয়র লিগে তারকা দ্যুতি ছড়িয়ে ইতোমধ্যে লিভারপুলের কিংবদন্তী তারকার আসন লাভ করেছেন মিশরের এই ফরোয়ার্ড। আরেকটি ভালো মৌসুম কাটাতে পারলে তিনি ছাড়িয়ে যেতে পারবেন কেনি ডালগ্লিশ, স্টিভেন জেরার্ড ও রবি ফলারদের মতো কিংবদন্তী তারকাদের। অবশ্য ক্লাবের সর্বকালের সেরা গোলদাতা ইয়ান রাসকে ধরতে হলে আরো কিছুটা সময় নিতে হবে সালাহকে। তিনি ৬৬০টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৩৪৬টি। তার ওই পথটি সুগম হয়েছে গত জানুয়ারিতে লিভারপুলের হয়ে চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়ায়। তবে নিজ দেশ মিশর বিশ্বকাপে অংশগ্রহনের যোগ্যতা অর্জন করতে না পারায় সেরা মেধাবী তারকা হয়েও কাতার বিশ্বকাপে খেলতে পারছেন না সালাহ।
আর্লিং হালান্ড (নরওয়ে):
শুধু প্রিমিয়ার লিগে নয়, বরং এই মুহুর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ফর্মে থাকা ফুটবলার হচ্ছেন আর্লিং হালান্ড। বিশ্বের যে কোন ক্লাবকে যদি বিনা ট্রান্সফার ফিতে বিনা পয়সায় দলের জন্য শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড়কে পছন্দ করতে বলা হয় তাহলে বেশীর ভাগ ক্লাবের পক্ষ থেকে তার নামটিই আসবে সবার আগে।
শীর্ষ লিগে এ পর্যন্ত ১৩ ম্যাচে ১৮ গোল করেছেন তিনি। নিকটতম প্রতদ্বন্দ্বী হ্যারি কেনের চেয়ে ছয় গোলে এগিয়ে রয়েছেন হালান্ড। এছাড়া নিজ দেশ নরওয়ের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৬ গোল করেছেন তিনি। তবে গ্রুপ পর্বে নেদারল্যান্ডস ও তুরস্কের পেছনে পড়ে যাওয়া কাতার বিশ্বকাপে অংশগ্রহনের সুযোগ পায়নি নরওয়ে। যে কারণে বিশ্বমঞ্চে অংশগ্রহনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই প্রজন্মের সেরা তারকাদের একজন হওয়া সত্বেও। উল্লেখ্য বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র তিনটি আসরে খেলার সুযোগ পেয়েছিল নরওয়ে, ১৯৩৮, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালে। অপরদিকে ইউরো আসরে শুধুমাত্র ২০০০ সালে খেলার টিকিট পেয়েছিল নরওয়ে।
বঞ্চিত একাদশ ( ফর্মেশন ৪-৩-৩): ডোনারুমা (গোলরক্ষক), জেমস, আলাবা, বনোচ্চি, চিলিয়ানি, কন্টে , জর্জিনহো, ভেরাত্তি, চিয়েজা, সালাহ, হালান্ড।