এই আলোটাই পানসে হয়ে গিয়েছিল এক ফাইনালে। যে ফাইনাল 'মারাকানা ট্র্যাজেডি' নামেই ইতিহাসে খ্যাত। আর তাতে যাবজ্জীবন নির্বাসিত জীবন বরণ করতে হয়েছিল এক খেলোয়াড়কে। তিনি ব্রাজিলের তখনকার গোলরক্ষক মোয়াকির বারবোসা নাসিমেন্তো।
সে সময় বারবোসা ব্রাজিল তো বটেই, বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক ছিলেন। ১৯৫০ বিশ্বকাপেও দারুণ খেলেছিলেন, কিন্তু ফাইনালে মাত্র একটা ভুলের কারণে সারাজীবনের মতো ব্রাজিলিয়ানদের কাছে খলনায়ক হয়ে যান তিনি। মৃত্যুর আগপর্যন্ত ছিলেন নির্বাসিত।
.png)
বারবোসার এই অবস্থার পেছনের গল্প জানতে হলে ফিরতে হবে ১৯৫০ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের চতুর্থ আসরে। সেবার বিশ্বকাপের আসর বসেছিল ব্রাজিলে। তখনো ব্রাজিলের শিরোপার ভান্ডার খালি। এই আক্ষেপটা ঘোচাতে তারা বেছে নিয়েছিল ঘরের মাঠে।
দলের গোলকিপার ছিলেন বারবোসা। ১৯৪৫ সালে যোগ দিয়েছিলেন রিও ডি জেনিরোর ক্লাব ‘ভাস্কো ডা গামা’তে। সেখানে ৫ বছরে তিনবার জেতেন সিটি চ্যাম্পিয়নশিপ, ১৯৪৮ সালে জেতেন ‘আমেরিকানো ডি ক্যাম্পিওস’, যা বর্তমানে ‘কোপা লিবার্তোদোরেস’ নামে পরিচিত।
দারুণ একটা দল নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল ব্রাজিল, আর বারবোসা ছিলেন সেই দলের অন্যতম সারথী। সেবার বিশ্বকাপের নিয়ম ছিলো চার গ্রুপের চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে আরেকটা গ্রুপ করা হবে। সেখানে নিজেদের মধ্যে খেলার পর পয়েন্টের ভিত্তিতে শীর্ষ দল পাবে বিশ্বসেরার খেতাব।
হিসেব অনুযায়ী চার গ্রুপের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলো ব্রাজিল, স্পেন, সুইডেন আর উরুগুয়ে। শুরু হলো শিরোপার লড়াই। স্পেন আর সুইডেনকে গুঁড়িয়ে দিল ব্রাজিল। অপর দিকে দ্বিতীয় ম্যাচে সুইডেনকে হারাতে পারলেও স্পেনের সাথে প্রথম ম্যাচ ড্র করল উরুগুয়ে।
সেই আসরে কোনো দল জিতলে পেতো ২ পয়েন্ট, ড্র হলে ১। ফলে প্রথম ২ ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের সংগ্রহ হলো ৪ পয়েন্ট, উরুগুয়ের ৩। তাতে ব্রাজিলের সাথে শেষ ম্যাচটা উরুগুয়ের জন্য হয়ে গেল অঘোষিত ফাইনাল। অন্যদিকে শিরোপা জিততে ব্রাজিলের চাই ড্র।
ব্রাজিলিয়ানরা ধরে নিয়েছিল, উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করে শিরোপা উল্লাসে মেতে উঠবে তারা। সে হিসেবেই আগাম উৎসবের প্রস্তুতি নিয়ে রাখলো ব্রাজিলিয়ানরা। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগ দেয় ব্রাজিলের সংবাদপত্রগুলোও।
দেশটির প্রভাবশালী দৈনিক ’ও মুন্ডো’ জাতীয় দলের বিশাল এক ছবিসহ ক্যাপশনে ‘এরাই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’ লিখে ম্যাচ শুরুর আগেই একটা সংস্করণও প্রকাশ করে ফেলে। এমনকি জাতীয় দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের নামাঙ্কিত স্মারক মুদ্রা পর্যন্ত বাজারে ছাড়া হয়েছিলো!
খেলা শুরু হওয়ার পর অসাধারণ খেলতে থাকে ব্রাজিল। কিন্তু দুর্দান্ত খেলেও প্রথমার্ধে গোলশূন্য ছিল তারা। বিরতির ঠিক পরেই গোল করে ফ্রিয়াকা ৪৭ মিনিটে এগিয়ে দেন ব্রাজিলকে। ২ লাখ দর্শকের গর্জনে মারাকানা নামের জনসমুদ্র তখন জলোচ্ছ্বাসের মতো ফুঁসে উঠেছে।
তবে ৬৬ মিনিটে গোল করে উরুগুয়েকে সমতায় ফেরান শিয়াফিনো। তখনো আশায় বুক বেঁধে আছে ব্রাজিলিয়ানরা। কারণ একটা ড্র’ই এনে দেবে বিশ্বকাপ। তবে খেলা শেষ হওয়ার ১১ মিনিট আগে দুঃস্বপ্নের মতো একটা কাণ্ড করে বসেন উরুগুয়ের অ্যালসিডেস ঘিগিয়া।
বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে ব্রাজিলের সেন্টারব্যাক বিগোদাকে বোকা বানালেন ঘিগিয়া। উরুগুয়ের প্রথম গোলটির পেছনে ঘিগিয়ার অবদান ছিলো। এবারও ঘিঘিয়া একই জায়গায় এসে দাঁড়ালে সবাই ভাবলো, ঘিগিয়া ক্রস করবেন। তা ভেবে নিজের পজিশন থেকে একটু সরে যান ব্রাজিল গোলরক্ষক বারবোসা। এই ভুলটাই তার বাকি জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। ক্রস না করে শট নেন ঘিগিয়া এবং গোল।
এরপর যা যা হলো, ঠিক সে কারণেই এই ম্যাচ 'মারকানা ট্র্যাজেডি' নামে পরিচিতি লাভ করে। বাঁশি বাজার পর অনেকেই লাফিয়ে পড়েছিলো মারকানার ছাদ থেকে, আত্মহত্যাও করে অনেকে। কয়েকদিন শহরের প্রতিটি ঘরের জানালা বন্ধ ছিল। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে চাপা কান্নার আওয়াজ শোনা যেতো।
আর বারবোসা? মারাকানা বিপর্যয়ের পর তাকেই দায়ী করে গোটা ব্রাজিল। তারা কখনোই আর ক্ষমা করেনি এই গোলরক্ষককে। পদে পদে অবহেলা, লাঞ্চনা, বঞ্চনা আর অবহেলায় কেটেছে তার বাকি জীবন। সেটা কেমন? শুনলে স্রেফ হতবাক হয়ে যেতে হবে।
খেলা ছাড়ার ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন বারবোসাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। যার দরুণ মারাকানা ট্র্যাজেডির ৪৩ বছর পরও বারবোসাকে ব্রাজিলের কোনো ম্যাচে ধারাভাষ্য দিতে দেয়নি তারা। এমনকি ব্রাজিলের রাস্তায় বারবোসাকে দেখলেই সবাই বলতো, ‘দেখো, এই লোকটা ব্রাজিলকে কাঁদিয়েছিল।’
এমন জীবন বোধহয় একজন অপরাধীরও হয় না। শেষ জীবনটা ঘরের চারদেয়ালে বন্দি হয়ে কাটাতে হয়েছিল বারবোসাকে। চরম হতাশ বারবোসা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলের আইনে যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ ৩০ বছর। কিন্তু আমার জন্য তা হয়ে গেছে ৫০ বছর।’
বারবোসা মারা গেছেন প্রায় ২২ বছর হবে। তার মৃত্যুর পরে ব্রাজিলের এক দৈনিক পত্রিকা শিরোনাম করেছিলো, ‘বারবোসার দ্বিতীয় মৃত্যু!’ আসলেই তো তাই। বেঁচে থেকেও তো মৃত্যুসম নির্বাসিত এক জীবনযাপনই করে গেছেন এক সময়ের সেরা গোলরক্ষক।