২০১৪ সালে পর্বত অভিযানের ওপরে ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক প্রশিক্ষণ নেন শাকিল। এরপর ২০১৮ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে পর্বতের উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন তিনি।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রাম থেকে বেড়ে ওঠা শাকিল এখন পর্যন্ত ‘হিমলুং’, ‘মাউন্ট কেয়াজো-রি’, ‘দ্রোপদি-কা-ডান্ডা-২’ এবং সবশেষ ‘ডোলমা খাং’ জয় করেছেন।
.png)
বর্তমানে ১৭'শ কিলোমিটার দীর্ঘ, সবচেয়ে উঁচু ও দুর্গম ট্রেইল ‘গ্রেট হিমালয়ান ট্রেইল’-এ অভিযান করছেন শাকিল। এরই মধ্যে ট্রেইলের ৭৫ শতাংশ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। এ অভিযান সম্পন্ন করতে পারলে বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রথম এবং বিশ্বের ৩৩তম অভিযাত্রী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবেন এ পর্বতারোহী।
শাকিলের পর্বতারোহী হয়ে ওঠার আদ্যপান্ত নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য তিন পর্বের সিরিজ সাজানো হয়েছে। আজকের পর্বে শাকিলের পর্বতারোহী হওয়ার পেছনের গল্প তুলে ধরেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ।
২০১২ সাল। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে গেছেন দুই বাংলাদেশি এম এ মুহিত ও নিশাত মজুমদার। পর্বতাভিযানে তাদের সাফল্যের গল্পটি নিমিষেই সারাদেশে ছড়িয়ে গেল। এরপর অভিযান শেষ করে দেশে ফিরলেন মুহিত-নিশাত।
এভারেস্ট জয় করে ফেরার পর দেশের বিভিন্ন স্যাটেলাইট টেলিভিশনে তখন নিয়মিত সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন মুহিত ও নিশাত। এমন সময় হঠাৎ করেই টিভির পর্দায় ইকরামুল হাসান শাকিলের চোখ আটকে যায়। তাদের রোমাঞ্চকর সাফল্যের গল্পে অনুপ্রাণিত হন তিনি। এরপর যেই চিন্তা, সেই পদক্ষেপ।
পর্বতের অভিযাত্রী হওয়ার বিষয়টি নিয়ে শাকিল বলেন, ‘টিভিতে যখন মুহিত ভাই ও নিশাত আপুর ইন্টারভিউ দেখছিলাম তখনই একটা সিদ্ধান্ত নিই। এরপর মনে হলো যে, আমি যেহেতু ফুটবলার হতে পারছি না, ক্রিকেটার হতে পারছি না; অবশ্য এসব খেলার জন্য অনেক শক্তির প্রয়োজন। যা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। কিন্তু আমিতো স্পোর্টসের সঙ্গে থাকতে চাই।’
তার কথায়, ‘ছোটবেলা থেকেই বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগতো। সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে বেশকিছু অ্যাডভেঞ্চারমূলক প্রোগ্রাম দেখতাম। মূলত সেসব থেকেই আমার আগ্রহ জাগে। যেহেতু আমার বাসা গাজিপুরের প্রত্যন্ত এলাকায়, সেখানে গজারি বন ছিল। এগুলোর যে লতা ছিল, এসব ধরে ঝুলে ঝুলে উপরে ওঠার চেষ্টা করতাম।’
বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এম এ মুহিত ও প্রথম নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন। যা দেখে পর্বতারোহণে শাকিলের কৌতুহলটা বেড়ে দ্বিগুণ হয়।
তিনি বলেন, ‘মুহিত ভাই ও নিশাত আপু যখন এভারেস্ট জয় করে দেশে ফিরলেন তারপর কোনো একটা টেলিভিশনে তারা ইন্টারভিউ দিচ্ছিলেন। এ সময় তারা জানালেন যে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং এন্ড ট্রেকিং ক্লাবে (বিএমটিসি) নতুনদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তখন ভাবলাম বিএমটিসি নতুনদের নিয়ে ভাবছে এ সুযোগ হাতছাড়া করব কেন?’
এরপর শুরু হয় শাকিলের মুহিত-নিশাকে খোঁজার যাত্রা। তাদের কাছে কিভাবে পৌঁছানো যায় দিন-রাত সে প্রচেষ্টায় চালিয়ে যান তিনি। একপর্যায়ে সেই সুযোগ চলেও আসে।
এ বিষয়ে শাকিল বলেন, ‘এরপর আমি মনস্থির করি যে তাদের খুঁজে বের করে সে পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। একটা সময় গিয়ে প্রথমে নিশাত আপুর কাছে পৌঁছাই। তারপর সেখান থেকে মুহিত ভাইয়ের নম্বর পাই। তখন মুহিত ভাই ক্লাব প্রেসিডেন্ট ছিলেন, এখনো আছেন।’
‘মুহিত ভাইকে প্রথম ফোন কলেই জানালাম, ভাই আমিও এভারেস্টে যেতে চাই। তখন তিনি বললেন, এভারেস্টে তো সরাসরি যাওয়া যায় না। এর জন্য নিজেকে আগে সেভাবে প্রস্তত করতে হয়। ফিটনেস তৈরী করতে হবে, প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এসব নিয়েই আমাদের প্রথম কথা’- যোগ করেন শাকিল।
এরপর তিনি বলেন, ‘মুহিত ভাই আামকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কখনো পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন কি না? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা ৪০-৫০ কি.মি. হেটেছেন কখনো? তখন বললাম, আমি গ্রামের ছেলে। সারাদিনই হাঁটাহাঁটির মধ্যে থাকি। এজন্য আমার কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
‘দুইবার এভারেস্ট জয়ী এম এ মুহিতের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন রাত নয়টা কি দশটা বাজে। তার সঙ্গে কথা শেষ করে ঘুমাতে চলে যাই। পরের দিন ভোর পাঁচটায় বিছানা থেকে উঠে উত্তরা থেকে পায়ে হেটে রওনা দিই গাজিপুরের শালনায়।’
ইকরামুল হাসান বলেন, তখন দেখলাম হাটতে ভালোই লাগে কিন্তু পায়ে ফোসকা পড়ে গেল। আমি ভাবলাম, এই অভ্যাস আরো বাড়াতে হবে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়তে শুরু হয়। একপর্যায়ে বিএমটিসির সদস্য হওয়া। এভাবেই পর্বতারোহণের শুরু।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: দ্বিতীয় পর্বে থাকছে ইকরামুল হাসান শাকিলের দুঃসাহসিক পর্বতাভিযান ও পর্বত জয়ের রোমাঞ্চকর গল্প।