ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

‘এভারেস্টের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছি’

আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশিত: ১৭:৪৯, ৫ এপ্রিল ২০২৩
‘এভারেস্টের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছি’
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ইকরামুল হাসান শাকিল। দুরন্তপনায় ভরা শৈশব কাটিয়ে আজ তিনি তরুণদের স্বপ্নের সারথী। প্রাথমিকে পড়ার সময় হতে চেয়েছিলেন সাপুড়ে, গ্রাম্য পুলিশ কিংবা খবরের কাগজে বড় অক্ষরে শিরোনাম। তবে সব স্বপ্নকে ছাপিয়ে তিনি হয়েছেন দুঃসাহসিক পর্বত অভিযাত্রী।

২০১৪ সালে পর্বত অভিযানের ওপরে ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক প্রশিক্ষণ নেন শাকিল। এরপর ২০১৮ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে পর্বতের উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন তিনি। 

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রাম থেকে বেড়ে ওঠা শাকিল এখন পর্যন্ত ‘হিমলুং’, ‘মাউন্ট কেয়াজো-রি’, ‘দ্রোপদি-কা-ডান্ডা-২’ এবং সবশেষ ‘ডোলমা খাং’ জয় করেছেন।

Advertisement

বর্তমানে ১৭'শ কিলোমিটার দীর্ঘ, সবচেয়ে উঁচু ও দুর্গম ট্রেইল ‘গ্রেট হিমালয়ান ট্রেইল’-এ অভিযান করছেন শাকিল। এরই মধ্যে ট্রেইলের ৭৫ শতাংশ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। এ অভিযান সম্পন্ন করতে পারলে বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রথম এবং বিশ্বের ৩৩তম অভিযাত্রী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবেন এ পর্বতারোহী।

শাকিলের পর্বতারোহী হয়ে ওঠার আদ্যপান্ত নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য তিন পর্বের সিরিজ সাজানো হয়েছে। আজকের পর্বে শাকিলের পর্বতারোহণের শুরু ও তার অর্জন তুলে ধরেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ।

২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, বাংলা ভাষা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে পায়ে হেঁটে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন শাকিল। পরে দেশের বিভিন্ন জেলা হয়ে মাত্র এগারো দিনে ঢাকার শাহবাগে পৌঁছান তিনি।

শাকিলের স্বপ্নের যাত্রাটা শুরু হয় ২০১৫ সালেএরপর বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং এন্ড ট্রেকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) সদস্য হন ইকরামুল। এর ১ বছর পর ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেরিয়ারিং থেকে পর্বতারোহণের উপর মৌলিক প্রশিক্ষণ নেন এ যুবক।

শাকিলের স্বপ্নের যাত্রাটা শুরু হয় ২০১৫ সালে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো নেপালের মাউন্ট কেয়াজো-রি পর্বতে অভিযানের সুযোগ পান তিনি। দুইবারের এভারেস্টজয়ী এম এ মুহিতের নেতৃত্বে সাত পর্বতারোহী এ অভিযানে অংশ নেন। তবে শেষ পর্যন্ত মুহিত, বিপ্লব ও শাকিল পর্বত শৃঙ্গটি জয় করেন।

পর্বতশৃঙ্গে যাওয়ার আগে দেশের পাহাড়গুলোতে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়ার কথা জানিয়ে শাকিল বলেন, ‘আমরা যখনই হিমালয় কিংবা পর্বতের দিকে যেতে চাই, তার আগে নিজেদের দেশের পাহাড়গুলোতে ভ্রমণে যেতে হয়। এ সময় আমাদের ক্ষমতা, সক্ষমতাটা দেখতে হয়।’

‘আমাদের মধ্যে যারা আছেন তাদের সবাইকে দেশের পাহাড়গুলোতে যেতে হয়েছে। আমার শুরুটাও দেশের পাহাড় দিয়েই। যেমন আমি ‘কেউক্রাডং’ ‘তাজিংডং’ ‘সাকা হাফাং’-এ গিয়েছি। এরপর যখন দেখলাম আমি বাংলাদেশের পাহাড়গুলোত হাঁটতে পারি তখন মনে হলো- পর্বতের ওপর মৌলিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। কিন্তু এই প্রশিক্ষণ আমাদের দেশে নেয়ার সুযোগ নেই । যেহেতু আমাদের দেশের পাহাড়গুলোর সেই উচ্চতা, বরফ নেই কিংবা সলিড রকও নেই’- যোগ করেন শাকিল।

তিনি বলেন, ‘আমি ভারতের উত্তর কাশিতে নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং-এ পর্বতারোহণের উপর ২০১৪ সালে মৌলিক প্রশিক্ষণটা নিই। এরপর একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৮ সালের উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করি।’

পর্বতমালায় নিজের অর্জন নিয়ে বলতে গিয়ে শাকিল জানান, ‘আমি তো মাত্র পর্বতারোহণ শুরু করলাম। গত দশ-বারো বছর ধরে পর্বতাভিযান করছি। আমাদের ট্রেকিংয়ে এটা শুরুই বলা চলে।’

মাউন্ট কেয়াজো-রি পর্বতশৃঙ্গ জয়ের পর মুহিত, বিপ্লব ও শাকিলদেশের হয়ে প্রথমবারের মতো পর্বতশৃঙ্গে গিয়েই সাফল্য পান শাকিল। তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে মৌলিক প্রশিক্ষণ নেয়ার পরের বছরই ২০১৫ সালে নেপালের ৬ হাজার মিটারের ‘মাউন্ট কেয়াজো-রি’ পর্বত অভিযানে যাই। এ অভিযানে বাংলাদেশের একসঙ্গে সাতজন ছিলাম। তার মধ্যে দু’জন মেয়ে ছিল বেসক্যাম্প পর্যন্ত; বাকি পাঁচজন ছিলাম মূল টিমের সদস্য। এ অভিযানে মুহিত ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা তিনজন সফলভাবে পর্বতের চূড়ায় পৌঁছাই।’

মাউন্ট কেয়াজো-রি’তে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে ২০১৭ সালে আরেকটি পর্বতাভিযানের সুযোগ পান ইকরামুল হাসান। সেটি ছিল ৬ হাজার মিটারের উঁচু পর্বত ‘লারকে পিকে’। 

তিনি বলেন, ‘লারকে পিকে অভিযানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। কেননা আমরা যে সময়ে অভিযানটা করি তখন আবহাওয়া আমাদের অনুকূলে ছিল না। আর এ কারণে সামিট পুশের আগে বেসক্যাম্পে থাকা অবস্থাতেই তুষার ঝড় শুরু হয়। ফলে সেখানে পনেরো ঘন্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে আমরা ফিরে আসি।’ 

২০১৮ সালে পর্বতের উপরে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে ভারতের নেহরু ইউন্সিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিংয়ে যান শাকিল। এবার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একটি পর্বতাভিযানে অংশ নেন তিনি। ‘দ্রোপদি-কা-ডান্ডা ২’ নামের পর্বতশৃঙ্গটি সফলভাবে সামিট করেন এ তরুণ পর্বতারোহী।

২০১৯ সালে ৭ হাজার মিটারের (২৩,৩৮০ ফিট) আরেকটি পর্বতশৃঙ্গ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন ইকরামুল। যেটির নাম ছিল ‘হিমলুং’।

শাকিল বলেন, ‘এই অভিযানে ৮ জনের একটি আন্তর্জাতিক টিম ছিল। যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে মুহিত ভাই ও আমি ছিলাম। এছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা, ক্রোয়েশিয়া ও সুইডেন থেকে একজন করে এবং স্পেন থেকে ছিলেন তিনজন।’

‘হিমলুং-এ আমরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে অভিযান করি। তার মধ্যে আমাদের দলের এক স্প্যানিশ মারা যান। আর আমি একাই, একজন শেরপা গাইড নিয়ে পর্বতটির চূড়ায় পৌঁছে সামিট করি’-বলেন শাকিল।

‘দ্রোপদি-কা-ডান্ডা ২’ নামের পর্বতশৃঙ্গ সামিটের পর সহযাত্রীদের সঙ্গে শাকিলসবশেষ ২০২২ সালে বাংলাদেশ-নেপালের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে একটি অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন শাকিল। এ অভিযানে বাংলাদেশ থেকে চারজন ও নেপাল থেকে ৪ জন পর্বতারোহী অংশ নেয়। এ অভিযানে বাংলাদেশের হয়ে নেতৃত্ব দেন এম এ মুহিত। 

তিনি বলেন, ‘দোগারি হিমাল’-এ আগে কখনো কেউই অভিযানে যায়নি। অভিযান তো দূরের কথা কেউ ওই এলাকাতে কখনো যাননি। এ পর্বতের এলাকা নতুন, রাস্তা নতুন এক কথায় বলতে রিমোট এরিয়া। তবে এ অভিযানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা সেটি পারেনি। কেননা পর্বত এমন একটি জায়গা যেখানে আবহাওয়া যদি আপনাকে পারমিট না করে তাহলে সেখানে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তবে আমরা যদি সেখানে যেতাম তাহলে ‘সুইসাইড’ হতো। কিন্তু আমরা সুইসাইড করতে যাইনি। পর্বত পর্বতের জায়গায় থাকবে। বেঁচে থাকলে আমরা আবার সেখানে যেতে পারব, জয় করতে পারব।’

দোগারি হিমাল থেকে ফিরে আসলেও ডোলমা খাং জয় করেন শাকিলসহ বাকি সদস্যরা। তিনি বলেন, এ অভিযানে আমরা ৪ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত রাস্তা ওপেন করতে পেরেছিলাম। তবে পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় আমরা কাঠমান্ডুতে ফিরে আসি। এরপর আমরা আরেকটি পর্বতাভিযানে যাই। সেটি হলো ৬ হাজার মিটারের (২০ হাজার ৭৭৪ ফিট) ‘ডোলমা খাং’। এবারও যৌথভাবে বাংলাদেশ-নেপালের অভিযাত্রীরাই অভিযান করি। সেটাতে আমরা সফলভাবে আরোহণ করতে পারি।’

বর্তমানে ১৭'শ কিলোমিটার দীর্ঘ, সবচেয়ে উঁচু ও দুর্গম ট্রেইল ‘গ্রেট হিমালয়ান ট্রেইল’-এ অভিযান করছেন শাকিল। এরই মধ্যে ট্রেইলের ৭৫ শতাংশ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। এ অভিযান সম্পন্ন করতে পারলে বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রথম এবং বিশ্বের ৩৩তম অভিযাত্রী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবেন এ পর্বতারোহী।

শাকিল জানান, ‘আমি যে ট্রেইলে যাত্রা করছি এটা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতে এবং সবচেয়ে লম্বা ট্রেইল। মূলত এটা হিমালয়ের উপর দিয়ে একটা ট্রেইল। পৃথিবীর মধ্যে এটি সবচেয়ে দুর্গম ট্রেইলও বটে!’ 

হিমলুংয়ে জাতীয় পতাকা হাতে শাকিলবিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ট্রেইলটা আমি শুরু করেছিলাম জুলাইয়ের ২৮ তারিখে। মূল অভিযান শুরু করেছিলাম ১ তারিখ থেকে। আর যেখান থেকে শুরু করেছি সেখানে পৌঁছাতে আমার ৪ দিন সময় লেগেছিল। এ ট্রেইলের ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন করতে পেরেছি। এর মাঝে আামি দুইটা অভিযানে অংশ নিই। সেসব শেষ করে আবারো আমার ট্রেকিং পয়েন্টে ফিরে আসি।’

গ্রেট হিমালয়ান ট্রেইল অভিযানটি অসম্পূর্ণ রেখেই দেশে ফিরেছেন ইকরামুল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমি দেশে ফিরে এসেছি মূলত আমার ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের (আর্থিক সংকটের) জন্য। যেহেতু পর্বতের ওপরে আমাকে ক্যাশ টাকা বহন করতে হয়। তা দিয়ে কখনো খাবার কিনতে হচ্ছে, কখনো গাইড নিতে হচ্ছে, আবার কখনো বা পারমিট কিনতে হচ্ছে। এসবের জন্য বেশ টাকা খরচ হয়। তবে আশা করছি শিগগিরিই অভিযানে ফিরতে পারব।’ 

যারা পর্বতাভিযান করেন তাদের সবারই স্বপ্ন ‘মাউন্ট এভারেস্টে’র চূড়ায় পা রাখা। শাকিলও তার ব্যতিক্রম নন। 

মাউন্ট এভারেস্টের প্রসঙ্গ আসতেই তিনি জানান, ‘এভারেস্ট তো আমার স্বপ্ন। আমি বিশ্বাস করি, এভারেস্টের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছি। আমি যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এভারেস্ট দেখছি। এখন শুধু তাকে আলিঙ্গন করার পালা। এটা খুব শিগগিরই হবে আশা করি। যেহেতু এখানে বিশাল একটি খরচের ব্যাপার আছে, সেহেতু স্পন্সর ম্যানেজ করতে হবে।’

শাকিল জানালেন, ‘অভিযানের ক্ষেত্রে কমদামি কোনো জিনিস ব্যবহারের সুযোগ নেই। আবার প্রতিটি পর্বতের উচ্চতা অনুযায়ী ব্যয়টা বাড়ে। ৫ হাজার মিটারের পর্বত অভিযানে ন্যুনতম ১ থেকে ২ লাখ টাকায় সম্পন্ন করতে পারবেন। আবার ৬ হাজার মিটারে গেলে ২-৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে থাকে। ৭ হাজার মিটারে গেলে সেখানে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ হয়। আর ৮ হাজার মিটারের প্রসঙ্গ আসলে ২০ লাখ টাকায় পৌঁছে যাবে। 

শাকিলের স্বপ্ন এভারেস্ট জয় করা‘পৃথিবীতে ৮ হাজার মিটারের পর্বত রয়েছে ১৪টি। এর সবকটিই আছে আমাদের হিমালয়ে। এর মধ্যে নেপালে রয়েছে ৮টি, পাকিস্তানে রয়েছে ৫টি এবং চীনে ১টি। আর মজার ব্যাপার হলো দুটি পর্বত রয়েছে ভারত-নেপাল বর্ডারের মাঝামাঝি (কাঞ্চনজঙ্ঘা), অন্যটি এভারেস্ট (নেপাল-চীন)।’

শাকিল বলেন, এভারেস্ট অভিযানে যেতে প্রায় ৪৫ হাজার ডলার প্রয়োজন হয়। যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ লাখ। যে কারণে আমাদের ঐভাবেই প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এজন্য পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অসামান্য। তারা এগিয়ে না আসলে আমাদের স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে যাবে।’

বিশেষ দ্রষ্টব্য: তৃতীয় পর্বে থাকছে ইকরামুল হাসান শাকিলের দুঃসাহসিক পর্বতাভিযানের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ও তরুণদের জন্য বিশেষ বার্তা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!