পারিবারিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে প্রতিদিনই মায়ের চোখ থেকে অজস্র পানি ঝরে যেত। আর মায়ের কষ্ট লাঘব করতেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘একদিন মায়ের সব দুঃখ কষ্ট শেষ হবে।’ এরপর পায়ের ছন্দে নিখুঁত ফুটবল খেলে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। বলছি বেলজিয়ামের তারকা স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকুর কথা।
ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য বেলজিয়ামের তারকা ফুটবলার রোমেলু লুকাকুর সংগ্রামী জীবনের গল্প তুলে ধরা হলো।
.png)
বেলজিয়ামের অ্যানটর্প শহরে ১৯৯৩ সালের ১৩ মে এক কঙ্গোলিস (কঙ্গোর অধিবাসী) দম্পতির পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রোমেলু মেনামা লুকাকু বলিনগোলি। যিনি ফুটবল বিশ্বে রোমেলু লুকাকু হিসেবেই বেশ পরিচিত।

১৯৯৯ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বেলজিয়ামের স্থানীয় ক্লাব রুপেল বুমের জার্সিতে অভিষেক হয় লুকাকুর। সেখানে চার মৌসুম ফুটবল খেলেন তিনি। এরপর বেলজিয়ামের প্রো লিগের ক্লাব লিয়ার্সে পাড়ি জমান এ ফুটবলার।
এরপর লিয়ার্সের হয়ে ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ফুটবল খেলেন লুকাকু। যেখানে মাত্র ৬৮ ম্যাচেই প্রতিপক্ষের জালে ১২১ বার বল পাঠান তিনি। ক্লাবটির হয়ে দুর্দান্ত খেললেও লিগে অবনমন হওয়ার কারণে লিয়ার্স ছেড়ে অ্যান্ডারলেখটে যোগ দেন এ স্ট্রাইকার।
অ্যান্ডারলেখটে যোগ দিয়েই খোলস থেকে বেরিয়ে আসেন রোমেলু। একের এক ম্যাচে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ক্লাবটির জার্সিতে ৯৮ ম্যাচে ৪১টি গোল করেন কঙ্গোলিস দম্পতির এ ফুটবলার।
বয়স যখন ১৬ বছর তখন পেশাদার ফুটবলে মনোনিবেশ করেন লুকাকু। ২০০৯–১০ মৌসুমে অ্যান্ডারলেখটকে শিরোপা জিতিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা নির্বাচিত হন তিনি। এরপরের গল্প শুধুই রোমেলু লুকাকুর।
“মানুষ বলে ভালো ফুটবল খেলার জন্য প্রয়োজন ভালো মানসিক সামর্থ্য। তাহলে আমি বলব, আমার রয়েছে এক শক্তিশালী মানসিক সামর্থ্য। কারণ আমি এবং আমার মা অন্ধকারে থেকেও সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতাম আর বিশ্বাস করতাম খারাপ সময় কেটে যাবেই, সেই সময় কেটে গেছে, এখনো যাচ্ছে।”
-রোমেলু লুকাকু
২০১১ সালে বেলজিয়ামের ‘ইবোনি শু’ পুরস্কার জেতেন রোমেলু। ওই বছরই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট ক্লাব চেলসিতে পাড়ি দেন তিনি। তবে চেলসির দুঃস্মৃতি হয়তো ভুলে যেতে চাইবেন। কেননা ইংলিশ ক্লাবে যাওয়ার পর নিজের পারফরম্যান্স মেলে ধরতে ব্যর্থ হন তিনি।
চেলসি অধ্যায় শেষে ওয়েস্ট ব্রুমউইচ অ্যালবিয়ন এবং এভারটনে ধারে খেলে কাটিয়ে দেন রোমেলু লুকাকু। তবে ২০১৪ সালে ২৮ মিলিয়ন পাউন্ডে এভারটনে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি।

এরপরই বাছাই পর্বে লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ব্রাজিল বিশ্বকাপে জায়গা করে নেন লুকাকু। বেলজিয়ামের জার্সিতে ওই বিশ্বকাপে ১টি গোল করেন তিনি। তবে টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হেরে যায় বেলজিয়ানরা। বিশ্বকাপ যাত্রা শেষে আবারো এভারটনের ডেরায় যোগ দেন তিনি। সেখানে একটানা ২০১৭ সাল পর্যন্ত খেলেন। এ সময়ের মধ্যে ১৬৬ ম্যাচ ৮৭ গোল করেন এ ফুটবলার।
এভারটনে জার্সিতে ক্যারিয়ারের দুর্দান্ত সময় কাটিয়ে মৌসুম শেষে ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে পাড়ি দেন লুকাকু। এরপর সেখানে দুই মৌসুম কাটিয়ে দেন। রেড ডেভিলসদের হয়ে ৯৬ ম্যাচে ৪২ গোল করেন তিনি।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ দুর্দান্ত কেটেছে বেলজিয়ামের। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে একের পর এক ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় তারা। তবে ফ্রান্সের বিপক্ষে ১-০ গোলের ব্যবধানে হেরে ফাইনালের স্বপ্নভঙ্গ হয় দলটির।

রাশিয়া বিশ্বকাপটি লুকাকুর জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কেননা জাতীয় দলের জার্সিতে একাই চারটি গোল করেন তিনি। অবশ্য সেমিফাইনালে দল হেরে যাওয়ায় সোনালি ট্রফি জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় এ বেলজিয়ান স্ট্রাইকারের।
বিশ্বকাপ শেষে রেড ডেভিলসদের ডেরায় যোগ দেন লুকাকু। এরপর মৌসুম শেষে ২০১৯ সালে ৪০ মিলিয়ন ইউরোতে ইতালির ক্লাব ইন্টার মিলানে নাম লেখান এ সেন্টার ফরোয়ার্ড। বর্তমানে ইতালিয়ানদের হয়েই মাঠ মাতিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
লুকাকু এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার মনে পড়ে ২০০২ সালের কথা, তখন আমি টাকার অভাবে খেলা দেখতে পারতাম না। আমার ফুটবল খেলার বুটে থাকত বড় বড় ফুটো। আর মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে বিশ্বকাপে খেলেছিলাম এবং আজ আমি বেলজিয়ামের হয়ে ২টি বিশ্বকাপ খেলে চলেছি। তখন আমি তাদের খেলা দেখতে না পারলেও এখন আমার খেলা দেখে সারা বিশ্ব।’