১৯১৮ সালের ২৩ মে ইংল্যান্ডের মিডলসেক্সের হেন্ডনে হ্যারি ও জেসি কম্পটনের ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন ডেনিস কম্পটন। পরিবারের ছোট ছেলেটির পুরো নাম ডেনিস চার্লস স্কট কম্পটন। একদম ছোট থেকেই খেলাধুলায় নিজের নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে থাকেন তিনি। যার জেরে ইংল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দলের ডাক পেয়ে যান মাত্র ১৯ বছর ৮৩ দিন বয়সেই!
ইংল্যান্ডের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটার কম্পটন। অভিষেক ম্যাচেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অর্ধশতকের দেখা পান তিনি। রান আউট হয়ে না ফিরলে সে ইনিংসটাকে নিঃসন্দেহে আরো বড় হতে পারতো। অবশ্য অভিষেক ইনিংসে রান আউটে সাজঘরে ফিরলেও নিজের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসেই শতক হাঁকান কম্পটন। এবার ডন ব্রাডম্যানের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিনি খেলেন ১৭৩ বলে ১০২ রানের অনবদ্য এক ইনিংস।
.png)
নিজের জাতটা চেনান কম্পটন সেই সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে। আগের ম্যাচে শতক হাঁকানোর চাইতে লর্ডসে বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে ৭৬ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে ডন ব্রাডম্যানকেও মুগ্ধ করেন তিনি। এর পরের গল্পটা শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। তার অনবদ্য যাত্রায় ছেদ ফেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এর আগে মাত্র ৮ ম্যাচে ৫২ গড়ে ৪৬৮ রান করেন এ অলরাউন্ডার, যার ভেতর সেঞ্চুরি ছিল দুটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতে দায়িত্ব পালন করেছেন ডেনিস কম্পটন। তিনি ভারতের মধ্য প্রদেশের ইন্দোরের একটি জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। কথায় আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। সেই কথার সত্যতা প্রমাণেই যেন যুদ্ধের মাঝেও ভারতের রঞ্জি ট্রফিতে খেলেন কম্পটন।
হলকারের হয়ে খেলার সময় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন আরেক অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি কেইথ মিলারকে। যিনি সে যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া এয়ার ফোর্সের পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ ম্যাচের একটি ঘটনা নিয়ে কথা না বললেই নয়। কলকাতায় অস্ট্রেলিয়ান সার্ভিসেস টিম ও ইস্ট জোনের মধ্যকার সে ম্যাচে ৯৪ রানে ব্যাট করছিলেন ডেনিস কম্পটন। সে সময় দাঙ্গা চলছিল।
ম্যাচের মাঝেই একজন দাঙ্গাবাজ মাঠে প্রবেশ করে এবং কম্পটনকে বলে- ‘"Mr Compton, you very good player, but the match must stop now." পরবর্তীতে যখনই কম্পটনের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাকে সে ঘটনা মনে করিয়ে দিতেন মিলার।
বিশ্বযুদ্ধ শেষে যথারীতি ক্রিকেট মাঠে ফেরেন কম্পটন। যতদিন খেলেছেন, নিজের ড্যাশিং ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি কার্যকরী বোলিং দিয়ে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন সবাইকে। সবমিলিয়ে ৭৮টি আন্তর্জাতিক টেস্ট খেলা কম্পটন পঞ্চাশের অধিক গড়ে ৫৮০৭ রান করেছেন। ২৮টি ফিফটির পাশাপাশি তিন অংকের ম্যাজিক ফিগার ১৭বার স্পর্শ করেছেন তিনি। যেখানে সর্বোচ্চ ছিল ২৭৮ রান! এছাড়া বল হাতে ৫৬ গড়ে শিকার করেছেন ২৫টি উইকেট। ইনিংসে একবার ৫ উইকেটও শিকার করেছিলেন এ অলরাউন্ডার।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কম্পটনের রেকর্ড ঈর্ষণীয়। এখানে ৫১৫টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি, যেখানে প্রায় ৫২ গড়ে করেছেন ৩৮ হাজার ৯৪২ রান। ১২৩টি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসে কম্পটন ছাড়া আর মাত্র ২৪ জন ক্রিকেটার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে শতাধিক সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন, যা তার মাহাত্ম্য ফুটিয়ে তোলে। এর পাশাপাশি বল হাতে ৩২ গড়ে ৬২২ বার উইকেট শিকারের আনন্দে মেতেছেন এ চায়নাম্যান। যেখানে সেরা বোলিং ফিগার ছিল ৩৬ রানে ৭ উইকেট।
বাইশ গজে দৌড়ে রান নেয়ার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত ছিলেন কম্পটন। তাকে নিয়ে জন ওয়ার বলেছেন- ‘He was the only person who would call you for a run and wish you luck at the same time.’
ক্রিকেটের দিক থেকে কম্পটন সর্বকালের সেরাদের একজন। তবে ফুটবলেও তিনি কম যান না। আর্সেনালের হয়ে উইঙ্গার হিসেবে দীর্ঘদিন খেলে গেছেন। ১১ নাম্বার জার্সি গায়ে ৫৪ ম্যাচে করেছেন ১৫টি গোল। আর্সেনালের হয়ে এ অলরাউন্ডার জিতেছেন ফার্স্ট ডিভিশন লিগ ও এফএ কাপ শিরোপা। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে ১২ বার মাঠে নেমেছেন কম্পটন। যদিও কোনো ম্যাচই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি।
ডেনিস কম্পটন শুধু ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের একজনই নন। তিনি ছিলেন সেই সময়ে দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেটার। শুধুমাত্র ক্রিকেট ও ফুটবলেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি এ অলরাউন্ডার। ঘোড়ার পিঠে দারুণ এক অশ্বরোহী ছিলেন তিনি। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, খেলাধুলার পাশাপাশি মডেলিংয়ের মাধ্যমে কম্পটন হয়ে উঠেছিলেন দেশটির জাতীয় আইকন। সুদর্শন হওয়ায় তার নারীভক্তের সংখ্যা ছিল প্রচুর।
বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ শেষে ১৯৩৪ সালে লর্ডসের এমসিসিতে গ্রাউন্ড স্টাফ হিসেবে যোগ দেওয়া কম্পটন পাঁচ বছর পর উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটার মনোনীত হন। ২০০৯ সালে রিচি বেনো, গ্রাহাম গুচ, ফ্রাঙ্ক ওলি, হ্যারল্ড লারউডের সঙ্গে তাকেও আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেমে মরণোত্তর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১৯৯৩ সালে হার্টফোর্ডশায়ারের শেনলি ক্রিকেট সেন্টারে অবস্থিত প্রধান ক্রিকেট মাঠটি উদ্বোধন করেন তিনি। তার সম্মানার্থে মাঠটির নাম পরিবর্তন করে ‘ডেনিস কম্পটন’ ওভাল নামে নামকরণ করা হয়। এছাড়া তার নামে লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের একটি স্ট্যান্ডও রয়েছে।
১৯৯৭ সালের ২৩ এপ্রিল ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের উইন্ডসরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ডেনিস কম্পটন। ৭৮টি আন্তর্জাতিক টেস্ট খেলা এ অলরাউন্ডারের জীবন প্রদীপ থামে ৭৮ বছর বয়সে। তিনি না থাকলেও তার কীর্তিগুলো রয়ে যাবে চিরকাল। একইসঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার মতো কীর্তিমানকে কি আসলেই ভোলা যাবে কখনো? উত্তরটা ‘না’ হওয়াই স্বাভাবিক।