ম্যারাডোনা-মেসি ‘কে সেরা’ বিতর্কে আলোর মিছিলে পিছিয়ে পড়েছেন অনেক তারকাই। এ নিয়ে অবশ্য ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে খুব বেশি আক্ষেপ চোখে পড়ে না। তবে গত শতাব্দীর নব্বই দশক থেকে একুশ শতকের শুরুর ফুটবল নিয়ে যারা বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন তাদের অনেকেই গলা ফাটিয়ে একজন আর্জেন্টাইনের নাম নিশ্চয় বলবেন। তিনি হলেন- গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। যাকে ভক্ত-সমর্থকেরা ‘বাতিগোল’ হিসেবে সম্বোধন করে থাকেন।
১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ঘরে তুলেছিল আর্জেন্টিনা। আর ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জেতেন লিওনেল মেসি-ডি মারিয়ারা। এর মধ্যে কেটে যাওয়া দীর্ঘ ৩৬ বসন্তে বিশ্ব ফুটবলের মসনদে বসতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। ক্যারিয়ারে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-মঞ্চে সোনালি জাদুর ট্রফি উঁচিয়ে ধরেননি ঠিকই; কিন্তু পরপর দুই বিশ্বকাপের আসরে হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়েন তিনি। সেইসঙ্গে ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা বঞ্চিত হওয়ার লজ্জা থেকেও মুক্তি দিয়েছিলেন বাতিস্তুতা।
বিশ্বকাপ প্রসঙ্গ বাদ দিলে মাত্র তিন বছরের (১৯৯১-৯৩) মধ্যে আর্জেন্টিনার জার্সিতে চারটি শিরোপা উঁচিয়ে ধরেন বাতিস্তুতা। ১৯৯১ ও ’৯৩ সালে কোপা আমেরিকা, ১৯৯২ সালে কনফেডারেশন কাপ এবং ১৯৯৩ সালে আর্তেমিও ফ্রেঞ্ছি ট্রফি। এই চার শিরোপা জয়ে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাতিস্তুতা।
.png)
শুরুর গল্প
১৯৬৯ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার স্যান্টা ফে’র আভেল্লানেডা শহরে এক কসাইখানার কর্মীর ঘরে জন্ম নেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। তবে তার বেড়ে ওঠা রেকোনকুয়িস্তাতে। ধর্মীয় পরিচয়ে তিনি ছিলেন রোমান ক্যাথলিক।
শৈশব থেকেই ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন বাতিস্তুতা। পছন্দের তালিকায় ফুটবল থাকলেও শুরুটা হয় বাস্কেটবল দিয়ে। মূলত, শারীরিক গঠন ও পাহাড়সম উচ্চতার কারণেই বাস্কেটবল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবে ফুটবলের মাঠে ফিরতে খুব বেশি সময় নেননি তিনি।
বাতিস্তুতার জন্মের এক দশকের মাঝেই নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে আর্জেন্টিনা। সেই আসরের গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল জয়ী মারিও কেম্পেসের ফুটবল নৈপুণ্য তার মনে ধরে। স্বদেশী কেম্পেসে এতটাই প্রভাবিত হলেন যে নিজেকে ফুটবলে মনোনিবেশ করতে বাধ্য হলেন তিনি। সেই থেকেই শুরু।
ক্লাব ক্যারিয়ার
বাতিস্তুতার ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল রোজারিওর ছোট্ট ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে। কিন্তু শারীরিকভাবে মোটা হওয়ার কারনে নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। এজন্য তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় নামডাকহীন দেপোর্তিভো ইটালিয়ানোতে। এ সময় তার ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন অনেকেই। সেই অখ্যাত ক্লাব থেকে ১৯৮৯ সালে যোগ দেন বিখ্যাত ক্লাব রিভারপ্লেটে। কিন্তু সেখানেও থিতু হতে পারেননি।
এক মৌসুম পরেই বাতিস্তুতা পাড়ি জমান রিভারপ্লেটের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে। এখানেই নিজেকে অনন্য হিসেবে চেনাতে শুরু করেন তিনি। এবার নজর কাড়েন ইতালিয়ান ক্লাব ফিওরেন্তিনার। ১৯৯১ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা জিতে পাড়ি জমান সিরি আ’র ক্লাবটিতে। সময়ের ব্যবধানে নিজেকে ক্লাবের সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে গড়ে তোলেন এ আলবিসেলেস্তে স্ট্রাইকার।
চোটের কারণে বাতিস্তুতার ফিওরেন্তিনা রেলিগেটড হয় নেমে আসে সিরি ‘বি’ তে। অবমনম হওয়ার সময়ও ক্লাবের ডেরা ছাড়েননি। সুযোগ ছিল ইউরোপের নামীদামি সব ক্লাবে যোগ দেওয়ার। কিন্তু ছাড়বেন কেন? তিনি তো সেখানে যোগ দিয়েছেন শিরোপা জিততে।
অবনমন হওয়ার এক মৌসুম পরেই বাতিস্তুতা দলকে তুলে আনেন সিরি ‘আ’ তে। সেই বছরেই দলকে জেতান কোপা ইতালিয়া ও সুপার কাপের শিরোপা। তার স্বপ্ন ছিল সিরি ‘আ’র শিরোপা জেতা। কিন্তু মিলানের দাপটে ফিওরেন্তিনার হয়ে জেতা হয়নি সিরি ‘আ’ শিরোপা।
টানা ৯ মৌসুমে ১৫২ গোল করে বাতিস্তুতা বনে যান সিরি এ-তে ফিওরেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলাদাতা। ২০০০ সালে ২৩.৫ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফি-তে তিনি যোগ দেন আরেক ইতালিয়ান জায়ান্ট রোমাতে। সেখানে গিয়েই স্বপ্নের সিরি ‘আ’ শিরোপা । রোমাতে দুই মৌসুম খেলে ইন্টার মিলান হয় কাতারের আল-আরাবি ক্লাবে ক্যারিয়ার শেষ করেন বাতিস্তুতা।
ক্লাব ক্যারিয়ারের খুব বেশি বড় শিরোপা জেতার সৌভাগ্য হয়নি বাতিস্তুতার। কিন্তু পেয়েছেন সমর্থকদের অগাধ ভালোবাসা। ফিওরেন্তিনাকে দুইটি শিরোপা এনে দিয়ে পেয়েছেন ফ্লোরেন্স শহরের ভালোবাসা। যেখানে বসেছে বাতিস্তুতার আবক্ষ ব্রোঞ্জের মূর্তি।
আর্জেন্টিনায় বাতিস্তুতা
সালটা ১৯৯১। আর্জেন্টাইন লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম তুলেছেন বাতিস্তুতা। এরপরেই তাকে নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। স্বাভাবিকভাবেই তার এলো আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে।
চিলিতে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকা খেলার সুযোগ পেলেন বাতিস্তুতা। সেই টুর্নামেন্টে একাই করলেন ৬ গোল। তাতে হলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। বলা যায়- তার কাঁধে ভর করে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা।
১৯৯২ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপে আর্জেন্টিনা গেল কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। সেখানেও দেখা গেল বাতিস্তুতা ম্যাজিক। আর্জেন্টিনা জিতে নিল আরেকটি শিরোপা। সেখানেও বাতিস্তুতা হলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনা বাতিস্তুতাকে নিয়ে আরেকটি শিরোপা জেতে। শিরোপাটির নাম আর্তেমিও ফ্রেঞ্ছি ট্রফি। এই টুর্নামেন্ট এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এটি খেলা হত সাউথ আমেরিকা এবং ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন দুটি দলের মধ্যে।
একই বছর বাতিস্তুতা তার দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা খেললেন আর্জেন্টিনার হয়ে। ইকুয়েডরে গড়ানো আসরের ফাইনালে মেক্সিকোকে হারিয়ে উঁচিয়ে চ্যাম্পিয়ন শিরোপা উঁচিয়ে ধরে বাতিস্তুতর দল। মজার ব্যাপার হলো-আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং কোপা আমেরিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন বাতিস্তুতা। ২০২১ সালের আগ পর্যন্ত যা ছিল আর্জেন্টিনার ইতিহাসে শেষ কোপা আমেরিকা জয়।
এরপর আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে যুক্ত হন বাতিস্তুতা। দুর্দান্ত শুরুর পরও রাউন্ড অব সিক্সটিনে রোমানিয়ার কাছে বাদ পড়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা। এই বিশ্বকাপেই মূলত ম্যারাডোনা ডোপিং কেলেঙ্কারির জন্য নিষিদ্ধ হন। আর তার পরপরই দলের মনোবল একদম ভেঙ্গে পরে। এই বিশ্বকাপে বাতিস্তুতা একটি হ্যাটট্রিকসহ মোট ৪ গোল করেন।
১৯৯৫ সালের কোপা আমেরিকাতে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ান হতে না পারলেও বাতিস্তুতা সেই আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। ১৯৯৭ এবং ১৯৯৮ এ ফিফা একাদশে জায়গা পান তিনি। এরপর ১৯৯৮ এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে বাদ পড়ে যায়। বাতিস্তুতা আবারো একটি হ্যাটট্রিক করেন। এবারের আসরে তিনি মোট ৫ গোল করেন। সেবার সিলভার বুট জিতে নেন আলবিসেলেস্তেদের এই বাতিগোল।
২০০২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা টিম খুব শক্তিশালী ছিল। বাছাইপর্বে দাপট দেখিয়ে তারা বিশ্বকাপে উঠেছিল। মার্সেলো বিয়েসলার অধীনে তখন আর্জেন্টিনা টিম। সবাই আর্জেন্টিনাকে টপ ফেভারিটের তকমা লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো নাইজেরিয়া, ইংল্যান্ড আর সুইডেনকে নিয়ে গড়া গ্রুপ অভ ডেথে গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়ে যায় আর্জেন্টিনা। গোটা টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা করে মাত্র ২টি গোল, যার একটি আসে বাতিগোলের পা থেকে।
চোট ও অবসর
ক্যারিয়ারজুড়েই ইনজুরি সমস্যা ভুগেছেন বাতিস্তুতা। মূলত, শক্তি ও নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি চেষ্টার কারণে চোটে পড়তেন তিনি। একটা সময় তার প্লেয়িং টাইম কমে যেতে থাকে। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে এই সমস্যাগুলো তাকে বেশি ভুগিয়েছে। যার ফলাফলস্বরুপ তিনি তার খেলোয়াড়ি জীবন থেকে বেশ আগেই অবসর নিতে বাধ্য হন।
২০০৫ সালের মার্চ মাসে ফুটবল খেলা থেকে পরিপূর্ণভাবে অবসর নেন বাতিস্তুতা। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনার টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বাতিস্তুতা বলেছিলেন, ‘২০০৫ সালে অবসরের পর তার গোড়ালিতে এত প্রচন্ড ব্যথা ছিল যে, কয়েক ধাপ দূরে টয়লেট থাকলেও এই স্ট্রাইকার বাধ্য হয়ে বিছানাতেই প্রস্রাব করতেন। তিনি একদমই নড়াচড়া করতে পারতেন না।’
শুধুমাত্র একজন ফুটবলার হিসেবে দেখলে বাতিস্তুতাকে হয়তো কিংবদন্তির কাতারে দাঁড় করানো যাবে না ঠিকই। কিন্তু আর্জেন্টিনার বাতি জ্বালিয়ে রাখা ‘৯’ নম্বর জার্সির আবেগ ও প্রচেষ্টাকে অনুভব করলেই বুঝতে পারবেন, তিনি কেনো একটি প্রজন্মের ধারক।