ঢাকা,  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

[ নারী নক্ষত্র ]
ইলা মিত্রের প্রয়াণ দিবস

বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছিলেন যে নারী

হারুন-অর-রশীদ খান
প্রকাশিত: ১১:৩০, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছিলেন যে নারী
১৯৫০ সালে গ্রেপ্তারের পর ইলা মিত্রের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ নির্যাতন। তার শরীরকে ভেঙে দিয়ে তার বিশ্বাসকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল

বিপ্লবের কথা বললে আমরা প্রায়ই পতাকা, মিছিল, স্লোগান কিংবা ক্ষমতা বদলের ছবি দেখি। কিন্তু বিপ্লবের আরও কঠিন একটি অর্থ আছে। তা হলো, মানুষের জীবন যেভাবে সাজানো হয়েছে, সেই বিন্যাসকে প্রশ্ন করা। কেন একজন মানুষ জমির মালিক আর আরেকজন ভূমিহীন? কেন একজনের শ্রমে সম্পদ তৈরি হয়, অথচ সেই সম্পদের ওপর অধিকার থাকে অন্যের?

কেন কারও কণ্ঠস্বরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়, আর কারও প্রতিবাদকে অপরাধ বলে দমন করা হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না বদলালে শুধু শাসকের মুখ বদলায়, সমাজের ভিত বদলায় না। পুরোনো বৈষম্য নতুন ভাষা শেখে, পুরোনো শোষণ নতুন পোশাক পরে ফিরে আসে।

বৈষম্যবিরোধি সেসব প্রশ্নকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন যিনি তিনি- চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোলের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্র এক কিংবদন্তির নাম। তিনি কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সাহসিকতার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি থাকবেন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে।

তিনি জানতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে শাস্তি আসতে পারে। তবু তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ তার কাছে রাজনীতি ছিল না ক্ষমতার দরজায় পৌঁছানোর সিঁড়ি।

নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস জানান দিবে 'ইলামিত্র সংগ্রহশালা'

নাচোলের সাঁওতাল কৃষকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এই রাজনীতিকে আরও গভীর করেছিল। তিনি তাদের জীবনকে দূর থেকে দেখেননি। তাদের ক্ষুধা, জমি, শ্রম, অপমান ও প্রতিরোধের সঙ্গে নিজের জীবনকে যুক্ত করেছিলেন। সাঁওতাল কৃষকেরা তার কাছে করুণা পাওয়ার মানুষ ছিলেন না। তারা ছিলেন সেই সমাজের নির্মাতা, যে সমাজ তাদেরই প্রান্তে ঠেলে রেখেছিল।

আজ ১৩ অক্টোবর, তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী, কৃষক-শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তিসংগ্রামের অগ্রসেনানী ইলা মিত্রের ২৪তম প্রয়াণ দিবস।

ব্রিটিশ শাসনের আগ পর্যন্ত জমির মালিক ছিল চাষীরা। মোগল আমল পর্যন্ত জমির এক তৃতীয়াংশ বা কখনো কখনো তার কিছু কম ফসল খাজনা হিসেবে জমিদার বা স্থানীয় শাসনকর্তার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দিতে হতো। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালুর মাধ্যমে বাংলার কৃষক সমাজকে নিষ্পেষিত করে ফেলা হয়। জমির পরিমাণ অনুযায়ী খাজনা দিতে হতো। জমিদারের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আসে জোতদার। 

যারা জমিদারের কাছে জমি ইজারা নিতো। ফলে কৃষকেরা জমিতে যা উৎপাদন করতো তার প্রায় সবটাই জমিদার এবং জোতদারের ভাগে চলে যেত। সাধারণ কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনি ছাড়া তাদের ভাগ্যে দুবেলা দুমুঠো ভাতও জুটতো না ঠিকমতো।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ'র নাচোলে 'ইলা মিত্র সাংস্কৃতিক মেলা' শুরু হচ্ছে কাল - বাংলার  ২৪ ঘণ্টা

  • কৃষকদের এত কষ্টের জীবনে তাদের অধিকার আদায়ের পথে সক্রিয় হয়ে ওঠেন ইলা মিত্র। যিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছেন এদেশের কৃষক শ্রেণিকে জমিদার-জোতদারের হাত থেকে রক্ষার্থে।

তেভাগা আন্দোলনের দাবি ছিল সরল, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক বিস্ফোরণ— বর্গাচাষি যে ফসল ফলাবেন, তার দুই-তৃতীয়াংশ তার প্রাপ্য। কথাটা ফসলের ভাগ নিয়ে হলেও, আসলে তা ছিল ক্ষমতার ভাগ নিয়ে। কে উৎপাদন করবে, কে ভোগ করবে, আর কে ঠিক করবে অন্যের শ্রমের মূল্য—এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল তেভাগা। 

বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকের অধিকার আদায়ে সংগ্রামী কৃষক নেত্রী কমরেড ইলা  মিত্রের মৃত্যুৃদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি - kobid's bangla blog

নাচোলের কৃষক আন্দোলন দমনের সময় এই ভাষার নির্মম চেহারা প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালে গ্রেপ্তারের পর ইলা মিত্রের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ নির্যাতন। তার শরীরকে ভেঙে দিয়ে তার বিশ্বাসকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল। 

  • তার নারীশরীরের ওপর নির্যাতন ছিল নিছক নিষ্ঠুরতা নয়; এর মধ্যে ছিল ভয় দেখানোর রাজনীতি। যেন তার যন্ত্রণা দেখে অন্য নারীরা বুঝতে পারেন, সীমা কোথায় টানা হয়েছে; কৃষকেরা বুঝতে পারেন, অধিকার চাইলে কী মূল্য দিতে হয়। 

কিন্তু একটি শরীরকে নির্যাতন করা যায়, তার ক্ষতকে অস্বীকার করা যায়, এমনকি সেই ক্ষতের ইতিহাসও চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা যায়। তাতে নির্যাতন ন্যায় হয়ে যায় না। বরং প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে— যে রাষ্ট্র নিজের ন্যায়বিচারের দাবি করে, সে কেন একজন বন্দী নারীকে নির্যাতন করে? যে শাসনব্যবস্থা নিজের বৈধতার কথা বলে, সে কেন কৃষকের ন্যায্য দাবি শুনতে ভয় পায়?

১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী ইলা মিত্র ১৯৪৬–১৯৫০ সালে নাচোলের সাঁওতাল ও কৃষকদের নিয়ে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। তবুও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি এই মহীয়সী নারী।

তিনি পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও শরণার্থীদের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্মভূমি ও পৈতৃক ভিটা আজও তাঁর সংগ্রামী জীবনের স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। অথচ সেই ঐতিহাসিক স্থাপনা আজ অবহেলিত ও জরাজীর্ণ।

ইলা মিত্রের পৈতৃক ভিটা সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করে আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর সংগ্রামী ইতিহাস তুলে ধরা হোক। তেভাগা আন্দোলনের এই মহীয়সী নেত্রীর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। 

লেখক : হারুন-অর-রশীদ খান, প্রাবন্ধিক।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!