আগুনের চিতা থেকে মনের চিতা
একটা সময় ছিল যখন নারীর দহন ছিল দৃশ্যমান। আজ সেই আগুন অদৃশ্য। কিন্তু আগুন কি সত্যিই নিভেছে? সতীদাহ- দৃশ্যমান আগুনের ইতিহাস সম্ভবত বাংলার শেষ আইনসম্মত সতীদাহের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ দিয়েছিলেন স্যার ফ্রেডরিক জেমস হ্যালিডে।
১৮২৯ সালে আইন করে সতীদাহ নিষিদ্ধ হওয়ার ঠিক আগে হুগলিতে ঘটে সেই ঘটনা।
একজন বিধবা নারী। সামনে জ্বলন্ত চিতা। চারপাশে জনতার ভিড়। ধর্ম, সমাজ, প্রথা সব চাপ একসাথে।
তাকে বোঝানো হয়েছিল। থামানো হয়েছিল। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু তিনি নিজের আঙুল আগুনে ধরে প্রমাণ করেছিলেন,
শরীরের যন্ত্রণা তার কাছে বড় নয়, সামাজিক প্রত্যাশা বড়।
তারপর তিনি নিজেই চিতায় উঠেছিলেন।
নড়েননি। চিৎকার করেননি।
আগুনের মধ্যে শুয়ে পড়েছিলেন যেন ঘুমোতে যাচ্ছেন।
এটাই ছিল বাংলার শেষ নথিভুক্ত সতীদাহ।
তার নাম ইতিহাস রাখেনি।
এই নির্মম বাস্তবতার বিরুদ্ধেই পরবর্তীতে বিধবা পুনর্বিবাহ আন্দোলনে কাজ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
তখনকার নারী-আগুন ছিল বাহ্যিক সে সময় নারীর উপর অত্যাচার ছিল প্রকাশ্য।
সমাজ বলত স্বামীর সঙ্গে মরাই ধর্ম,পরিবার বলত এটাই সম্মান, ধর্ম বলত এটাই পুণ্য, জনতা দেখত, কিন্তু থামাত না।
নারীর জীবন ছিল অন্যের মর্যাদা রক্ষার উপকরণ। তার মৃত্যু ছিল পবিত্রতার অনুষ্ঠান। আগুন ছিল বাস্তব। চিতাও ছিল বাস্তব। মৃত্যুও ছিল বাস্তব।
- এখনকার নারী- আগুন হয়েছে অদৃশ্য এখন কেউ নারীদের চিতায় তোলে না। কিন্তু প্রশ্নটা হলো- আগুন কি নিভেছে?
আজকের নারী যে চিতায় পুড়ে, তা দেখা যায় না।
আজকের আগুন হলো চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন, আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে জেরা, পোশাক নিয়ে বিচার ,বিবাহ বা ডিভোর্স নিয়ে সামাজিক ট্রায়াল ,সম্মান নামে নিয়ন্ত্রণ, মানসিক অবমূল্যায়ন নীরব মানসিক নির্যাতন আগে নারীকে আগুনে ঝাঁপ দিতে বলা হতো।
এখন তাকে প্রতিদিন আগুনের ভেতর বাঁচতে বলা হয়। তুলনা চিতা বদলেছে, চাপ বদলায়নি তখন, শরীর পুড়ত এখন মন পুড়ে। মৃত্যু একদিনে দহন সারাজীবন চাপ ছিল প্রকাশ্য,চাপ সামাজিক ও মানসিক জনতা সামনে দাঁড়িয়ে থাকত সমাজ সোশ্যাল মিডিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকে মৃত্যুতে সম্মান বেঁচে থাকলেও বিচার তখন নারী একবার মরত।
এখন নারীকে প্রতিদিন একটু একটু করে মরতে হয়। আসল প্রশ্ন আমরা বলি আমরা সভ্য হয়েছি। কিন্তু সভ্যতা কি শুধু আগুন বন্ধ করলেই আসে? যখন নারীকে এখনও নিজের স্বাধীনতা প্রমাণ করতে হয়, নিজের জীবনযাপন ব্যাখ্যা করতে হয়, নিজের সুখের হিসাব দিতে হয় তখন বোঝা যায়, চিতা নেই, কিন্তু দহন আছে। আগে আগুন চোখে দেখা যেত।
এখন আগুন চোখে দেখা যায় না। কিন্তু দহন? সেটা এখনও চলছে। নদীর ধারে সন্ধ্যা নামে, লাল হয় আকাশ, ধূপের গন্ধে ভারী বাতাস, কাঁপে মানুষের শ্বাস। চিতার কাঠে আগুন ধরায়, জ্বলে দাউ দাউ,
মনের মাঝে নীরব কান্না কেউ বলে না থামাও ।
ঢাকের তালে ঢেকে যায় যে বুকভাঙা সেই শব্দ,
পুড়ে শুধু দেহ নয়, পুড়ে স্বপ্ন কষ্ট।
ঘি ঢেলে দেয় আগুন মুখে, শিখার ওঠে চূড়া, পুণ্যের নামে লুকিয়ে থাকে কত শত সুরা।
কেউ বলে ধর্ম, কেউ বলে মান,
কেউ বলে এটাই নারীর সম্মান।
আকাশ দেখে, নদী দেখে, বাতাস থাকে থেমে, মানুষ শুধু চেয়ে থাকে আগুনের ওই ফ্লেমে।
শেষে যখন ছাই উড়ে যায় ধূসর হয়ে দূরে, নামহীন এক জীবনগল্প ভাসে ঘুরে ঘুরে। সোস্যাল মিডিয়ায় দেখলাম একজন নারীর চোখ উপড়ে ফেলেছে স্বামী । এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে আমারা দেখেছি । এই ঘটনাটা একটা খবর না, একটা প্রতীক।
কারণ একজন নারী চোখ হারায় না শুধু একজন মানুষের হাতে হারায় পুরো সমাজের মানসিকতার কাছে।
একজন পুরুষ পরকীয়ার সন্দেহে বা অভিযোগে একজন নারীর চোখ উপড়ে ফেলতে পারে এটা হঠাৎ ঘটে না। এটা সেই সমাজে ঘটে যেখানে এখনো নারীকে মানুষ নয়, সম্পত্তি ভাবার শিক্ষা বেঁচে আছে।
এই ঘটনাটা আসলে কী বলে?
- এটা বলে নারীর শরীর এখনো নিয়ন্ত্রণের বস্তু, নারীর প্রেম এখনো অপরাধ ,নারীর ভুল করলে শাস্তি, পুরুষের ভুল করলে মানবিক দুর্বলতা। একটা কথা খেয়াল করুনপরকীয়া দুইজন মানুষ মিলে করে। কিন্তু শাস্তি? প্রায় সব সময় নারী একাই পায়।
পুরুষ মারবে, অ্যাসিড ছুঁড়বে, চোখ নষ্ট করবে, সমাজে বিলা করবে , অপমান করবে , এই সেই ইত্যাদি প্রমানাদি দেখিয়ে হুমকি ধামকি দেবে , আর সমাজ বলবে নিশ্চয়ই মেয়েটার দোষ ছিল।
এই বাক্যটাই আসল চিতা। মানসিক চিতা। এমন চিতায় কতো নারী যে দহনে দহিছে তার ইয়াত্তা নাই ।
আমরা আসলে কোন সমাজে বাস করি? আমরা এমন সমাজে বাস করি যেখানে নারী স্বাধীনতা চাইলে তাকে চরিত্র দিয়ে মাপা হয়। নারী সম্পর্ক ভাঙলে তাকে দোষী করা হয়। নারী নিজের জীবন বেছে নিলে তাকে বিচার করা হয়। কিন্তু পুরুষ?
সে রাগে মারলে -মুহূর্তের ভুল
সে সন্দেহ করলে ভালোবাসা
সে নিয়ন্ত্রণ করলে দায়িত্ব
এটাই বাস্তব। সমান অধিকার কেন এখনো দাবি? কারণ কাগজে অধিকার আছে। বাস্তবে অনুমতি লাগে।
নারী এখনও নিজের জীবন, সম্পর্ক, চলাফেরা, আয়
সবকিছুর ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য।
আর পুরুষ? তাকে শুধু স্বাভাবিক ধরা হয়। একজন নারী যখন সমান অধিকার চায়, সে বিশেষ কিছু চায় না। সে শুধু বলতে চায় আমাকে মানুষ হিসেবে দেখো। সম্পত্তি হিসেবে না। সম্মানের পাত্র হিসেবে না। শাস্তির লক্ষ্য হিসেবে না।
মানুষ হিসেবে। যেদিন পরকীয়ার অভিযোগে কোনো নারীকে পঙ্গু করা হবে না, অন্ধ করা হবে না , গলা কাটা হবে না ,যেদিন সম্পর্ক ভাঙা হত্যার কারণ হবে না, যেদিন নারীর জীবন তার নিজের হবে সেদিন সমান অধিকার শব্দটা আর দরকার হবে না।
“নারীরা পৃথিবীর সব জায়গায় আছে তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাতেও তাদের থাকা উচিত।”
অন্তত নিজের জীবনের ।
লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কবি, গীতিকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।