ঘামের শরীর ভিজে - আমরা ঘাম মোছার সময় পাইনা!
আন্দোলনরত এক গার্মেন্টস শ্রমিকের কথা-
"সকাল ৮ টায় অফিসে ঢুকি রাত ৮ টায় বের হই কোন স্বাধীনতা নেই। বাসায় আত্মীয়-স্বজন কেউ মারা গেলেও ছুটি দেয় না। ছুটির জন্য পায়ে ধরতে হয় যে আমার বাচ্চা অসুস্থ, আমারে যাইতে দেন। পিএম জিএমের পায়ে ধরতে হয় আধা ঘন্টার গেট পাশের লাইগা।"
"বাসা ভাড়া ছিল ৬ হাজার এখন সেই বাসা ভাড়া হয়েছে সাড়ে ৮ হাজার টাকা। গ্যাস ছিলো ১৪০০ - ১৫০০ টাকা সেই গ্যাস হয়েছে ২৫০০ টাকা। মাসে আমি বেতন পাই ১৫ হাজার টাকা। বাসা ভাড়াই যদি এত টাকা যায় তাহলে আমরা থাক খাব কি?
৫ বছরের একটা বাচ্চাকে ১ ঘন্টা পড়ায় মাস্টারকে দেওয়া লাগে ১ হাজার টাকা। মাদ্রাসায় দেওয়া লাগে মাসে ২০০০ টাকা বেতন। ৩০০০ টাকা বাচ্চাদের পিছনেই যায়।"
বাসা ভাড়াই যদি এত টাকা যায়, বাচ্চাদের পিছনে খরচ, অন্যান্য খরচ, সংসার চালানো এইসব কিছুতো ১৫ হাজার টাকায় পোষায় না। গার্মেন্টসে এক মিনিট লেট হইলে ৭৫০ টাকা কাটা যায়, রাস্তাঘাটে আসতে গেলে তো অনেক সুবিধা - অসুবিধা হয় কিন্তু এক মিনিট লেট হইলে টাকা কাটা যাবে।
তারপর আবার নিয়ে যাবে স্যারদের চেম্বারে সেখানে তারা গালিগালাজ দেবে। আমরা গার্মেন্টস শ্রমিক দেখে আমাদের মা-বোনেদের ইজ্জত নাই।
এক পিস বডি প্রোডাকশন কম পড়লে আমাদের পিএমের রুমে নিয়ে যায়, জিএমের রুমে নিয়ে যায়, পিএম, জিএম গায়ে হাত দিয়ে কাপড় খুঁজে দেখতে বলে। গায়ে হাত দিয়ে তারা বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা করে, বিভিন্ন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। আমরাও তো মানুষ আমরা মানুষ না?

মজুরি বৃদ্ধির জন্য কেন আমাদের রাস্তায় নামতে হয়? আমরা যখন গার্মেন্টস এ কাজ করি তখন আমাদের ঘামের শরীর ভিজে যায়, কিন্তু আমরা পাইনা ঘাম মোছার সময়।
বেতন বাড়ার কোন খবর নাই কিন্তু জানুয়ারি মাস আসার আগেই ঘর ভাড়া বেড়ে গেছে। শরীর অসুস্থ হলেও গার্মেন্টসে মাফ নাই। আমিও তো মানুষ র" ক্তে মাং" সে গড়া মানুষ, আমাদের কি শরীর অসুস্থ হতে পারে না।
এই গার্মেন্টস শ্রমিক বোনটা তার কষ্টের কথা গুলো এভাবে বলছিলো ক্যামেরা সামনে। আসলে গার্মেন্টসের ভিতরে শ্রমিকদের কাজের সময় আসলে তাঁদের মানুষ মনে করা হয় না। তারা কিন্তু অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই বোনটার কথা একটাও মিথ্যা না।
আমি এর আগেও অনেক গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে সামনাসামনি অনেকবার কথা বলেছি তাদের কষ্টের কথা শুনেছি, আর আমরা সবাই জানিও যে তারা কি পরিমাণ পরিশ্রম করে।
এখন যে পরিমাণ জিনিসের দাম! আগে দুইটা গ্যাস কিনতে যে টাকা লাগতো এখন একটা গ্যাস কিনতে সেই টাকা লাগে, প্রতিটা জিনিসের দাম প্রায় ডাবল ডাবল। জিনিসের দাম যদি ডাবল হয় বেতন ও ডাবল হতে হবে স্বাভাবিক ব্যাপার।
তারাও তো মানুষ তাদেরও তো বাচ্চা আছে, সংসার আছে, তাদেরও একটু ভালো থাকতে, ভালো খাইতে মন চায় এখানে অযৌক্তিক কিছু নেই বলে আমার মনে হয়। আপনি বলেন তো এখন কি ১২৫০০ টাকায় একটা সংসার চালানো আদৌ সম্ভব?

সাংবাদিকদের দেয়া আন্দোলনরত এক পোশাকশ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশে বলেন-
"বিজিএমইএর লোকেরা কইতাছে মালিকের অবস্থা ভালো না, বেতন বাড়ানো যাবে না। "
"বেতন আমাগো লাগবে না। আমাদের রুম ভাড়া কমাইতে কন। গ্যাস বিল কমাইতে কন, কারেন্ট বিল কমাইতে কন। যেই আটা ৪০ টাকা কেজি ছিল, সেই আটা এখন ৬৫ টাকা কেজি। চাইলের দাম বাইড়া গেছে গা, সবকিছুর দাম বাইড়া গেছে গা। কেন আামাদের এই আন্দোলন করা লাগবে? কেন করা লাগবে? "
"আরেকটা জিনিস, আমরা যে গার্মেন্টসের শ্রমিক। এত বড় একটা ব্যবসা আমাদের দেশে। আপনেগো অই নায়ক নাইকার জন্য লাইভ হয়। প্রেম কইরা ছেঁকা খাইছে অইগুলার লাইভ হয়। আমাদের কি কোনো চ্যানেল আছে যে আমরা ওখানে যাইয়া দুঃখ সুখের আলাপ করমু? বছর শেষে ২/৪ টা সমস্যা আমাদের নিয়ে সমাধান করবে? কেনো নাই এগুলো আমাদের জন্য?
পুনশ্চ : শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরির দাবি যৌক্তিকভাবে তুলে ধরার অধিকার অবশ্যই আছে। তাদের ন্যায্য দা'বি আদায়ে আন্দোলন হোক, প্রতিবাদ হোক। সব ঠিকাছে। কিন্তু ভাঙচুর কেন?! ভাঙচুর করে নিজেদের কর্মস্থল ও সম্পদের ক্ষতি করলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শ্রমিকরাই।