“ভালোবাসতে না পারাই মূলতঃ নরক।”
“মানুষ একটা রহস্য। এর জট খোলা জরুরি। তুমি যদি তোমার পুরোটা জীবন এই জট খোলার পেছনে খরচ করে ফেলো, তবে এ কথা বলো না যে তুমি সময় নষ্ট করেছো। আমি সে রহস্য পাঠ করছি, কারণ আমি একজন মানুষ হতে চাই।”
“মানুষ ভালোও নয়, খারাপও নয়, অর্ধাঅর্ধি। দোষ, গুণ উভয়ই উপস্থিতি ও সংগ্রাম তার ভেতরে। মানুষ শুধু সুখের জন্য বাঁচে না, দুঃখের জন্যও বাঁচে। সবকিছুর চেয়ে সে তার স্বাধীনতাকে মূল্যায়ন করে।”
.png)
কথাগুলো ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাযোভ’, ‘দ্য ইডিয়ট’, ‘দ্য গ্যাম্বলার’, ‘দ্য অ্যাডোলসেন্ট’‘হিউমিলিয়েটেড অ্যান্ড ইনসাল্টেড’এর মতো সুবিখ্যাত, সুচিন্তিত ও কালজয়ী সব রচনার লেখক এই দস্তয়েভস্কি।
পৃথিবীর সর্বকালের স্মরণীয় ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম একজন, ফিওদর দস্তয়েভস্কির।
১৮২১ একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাহিত্যের জন্য। এই বছর কীটস মারা যান (একবছর পর শেলী)। সকল প্রগলভতা রোমান্টিক ভাবালুতার বিরূদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে জন্ম নিলেন- প্যারিসে শার্ল বোদলেয়ার এবং মস্কোতে ফিওদর দস্তয়েভস্কি।
প্রথম প্রধান অস্তিত্ববাদী লেখক দস্তইয়েভস্কিকে লেখকদের লেখক বলা হয়। Dostoevsky and Parricide সহ আরো কিছু বই এ ফ্রয়েড উঁনার লেখার ওপর বেশ গবেষণামূলক কাজ করেছেন। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক উম্মোচনে লেখক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
প্রথম উপন্যাস পুত্তুর ফোক বা অভাজন প্রকাশিত হওয়ার পর কয়েকটি ছোটগল্প রচনা করলেন দস্তয়ভস্কি। তারপর লিখলেন তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দি ডবল’। প্রথম উপন্যাসে তিনি লেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, দ্বিতীয় উপন্যাসে পেলেন খ্যাতি। তার লেখার মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছিল মানুষের বেদনাময় জীবনের ছবি। মানুষ, সমাজের শিল্পী, সাহিত্যিক, সমালোচক মহলে তার কদর বাড়ে।
“এই সময় দস্তয়ভস্কির জীবনে নেমে এল বিপর্যয়। রাশিয়ার সম্রাট জার ছিলেন এক অত্যাচারী শাসক। তার শাসনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট সংগঠন। এক বন্ধুর মারফত দস্তয়ভস্কি পরিচিত হলেন এর একটি সংগঠনের সঙ্গে। এদের আসর বসত প্রটাসভস্কি নামে এক তরুণ সরকারি অফিসারের বাড়িতে।
কিন্তু অত্যাচারী জার প্রথম নিকোলাসের গুপ্তচরের নজর এড়াল না। তাদের মনে হলো এরা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। রিপোর্ট গেল সরকারি দফতরে। যথারীতি একদিন প্রটাসভস্কির আসর থেকে বাড়িতে ফিরে এসে খাওয়া-দাওয়া করে রাতে ঘুমিয়ে পড়লেন দস্তয়েভস্কি। হঠাৎ শেষ রাতে পুলিশের পদ শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখলেন তার ঘরে জারের পুলিশ বাহিনী। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তাকে গ্রেফতার করা হলো (এপ্রিল ১৩, ১৮৪৯)।
অন্য অনেকের সাথে তাকে বন্দি করে রাখা হলো আলোবাতাসহীন ছোট একটি কুঠুরিতে। দিনে মাত্র তিন চার বার ঘরের বাইরে আসার সুযোগ মিলত। এক দুঃসহ মানসিকতার মধ্যেই তিনি রচনা করলেন একটি ছোট গল্প ‘ছোট নায়ক’ (A little Hero).
নানা প্রশ্ন অনুসন্ধান তারপর শুরু হলো বিচার। বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দণ্ডাদেশ পত্র পাঠিয়ে দেওয়া হলো সম্রাট নিকোলাসের কাছে। সম্রাট তাদের মৃত্যুদণ্ড রোধ করে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিলেন। দস্তয়ভস্কির চার বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসন আর তারপর চার বছর সৈনিকের জীবন যাপন করার আদেশ দেওয়া হলো।
ক্রিসমাস ডেতে পায়ে চার সের ওজনের লোহার শেকল পরিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো সাইবেরিয়ার বন্দিনিবাসে (জানুয়ারি ১৮৫০)। চারদিকে নরকের পরিবেশ। খুনি বদমাইশ শয়তানের মাঝখানে দস্তয়ভস্কি একা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। ছোট অন্ধকার কুঠুরিতে শীতকালে অসহ্য ঠান্ডা। ছাদের ফুটো দিয়ে বরফ ঝরে পড়ে মেঝেতে পুরু হয়ে যায়। কনকনে তুষারঝড়ে হাত-পা ফেটে রক্ত ঝরে। গ্রীষ্মের দিনে আগুনের দাবদাহ।
তারই মাঝে হাড়ভাঙা খাটুনি। ক্লান্তিতে, পরিশ্রমে শরীর নুয়ে পড়েছে। সে তার জীবনের এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তীকালে জ্বলন্ত অক্ষরে লিখে গিয়েছেন তার The house of the Dead (মৃত্যুপুরী) উপন্যাসে।" (মানবেন্দ্র বন্ধোপাধ্যায়)
বন্দি জীবনের পর আরেক দুঃখ নেমে এলো তার জীবনে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তার স্ত্রী মারিয়া। তার সেবা যত্ন সত্ত্বেও সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৮৬৪ সালের এপ্রিল মাসে মারা গেল মারিয়া। স্ত্রীর মৃত্যুর মাত্র তিন মাস বাদে মারা গেলেন বড় ভাই মাইকেল। মাইকেলের মৃত্যু তার কাছে অনেক বেশি আঘাত নিয়ে এলো। তার জীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিল ভাইয়ের অস্তিত্ব!
এই দুঃখের মধ্যেই রচনা করলেন তার ‘অপরাধ এবং শাস্তি’ (Crime and Punishment)। এক অনন্যসাধারণ উপন্যাস। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে যে কটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস আছে, এটি তার মধ্যে একটি।
কাহিনীর নায়ক রাসকলনিকভ। দরিদ্র, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আদর্শবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু দারিদ্র্যের চাপে তার আদর্শবাদের বন্ধনটুকু শিথিল হয়ে পড়তে থাকে। বাড়ি থেকে খবর আসে সংসারের অভাব দূর করার জন্য ছোটবোন দুনিয়া ধনী লুজানকে বিয়ে করতে চলেছে। এক প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতার মধ্যে সে কিছু অর্থ ধার করতে গেল শহরের এক বুড়ির কাছে। বুড়ির বন্ধকি ব্যবসা। একাই থাকে বুড়ি। তার ঘরে জমিয়ে রাখা সোনা-দানা দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না রাসকলনিকভ।
বুড়িকে হত্যা করল। এই সময় বুড়ির বোন এসে পড়ায় নিজেকে বাঁচানোর জন্য তাকেও হত্যা করল রাসকলনিকভ। সামান্য যা পেল তাই নিয়েই পালিয়ে এল কিন্তু এবার তার মধ্যে শুরু হলো মানসিক যন্ত্রণা। মনে হতে লাগল পুলিশ বুঝি সব সময় তার পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ক্রমশই এক অপরাধবোধ তার মনের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে।
এই সময় রাসকলনিকভের সঙ্গে দেখা হলো সোনিয়ার। সে পতিতা। নিজের বিপন্ন পরিবারকে ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সে এই পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু রাসকলনিকভ উপলব্ধি করতে পারল পাপের মধ্যে থেকেও সোনিয়ার অন্তর জুড়ে রয়েছে শুধু পবিত্রতা। তাই নিজেকে সোনিয়ার কাছে উৎসর্গ করলেন রাসকলনিকভ। ক্রমশই তার মনে শুরু হলো পাপ-পুণ্যের দ্বন্দ্ব। শেষ পর্যন্ত নিজের অপরাধ স্বীকার করে সোনিয়ার কাছে।
পুলিশও বুড়ির হত্যা রহস্য উদ্ধারের জন্য চারদিকে অনুসন্ধান করতে থাকে। তারা অনুমান করে রাসকলনিকভ খুনি। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তাকে ধরতে পারছিল না। রাসকলনিকভের মনে হলো সে যে অপরাধ করছে তার জন্য তাকে ধরতে পারছিল না। সোনিয়ার প্রেমের আলোয় সে তখন এক অন্য মানুষ। তাই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করল। সোনিয়াও তার সাথে যাত্রা করল। সে বাসা বাঁধল জেলের কাছে এক গ্রামে। ভালোবাসা, ত্যাগ আর পবিত্রতার মধ্যে দুজনে প্রতীক্ষা করে নতুন জীবনের।
আর্থিক সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি না পেলেও তার সমস্ত মন জুড়ে তখন চলছিল সেই মহতী সৃষ্টির প্রেরণা। দীর্ঘ চার বছর লেখার পর ১৮৮০ সালে প্রকাশিত হলো ‘দি ব্রাদার্স কারামাজোভ’। এক মহাকাব্যিক উপন্যাস। ব্যাপ্তিতে, গভীরতায়, চরিত্র সৃষ্টিতে ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের পাশাপাশি এই উপন্যাসও তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।”
লেখক- মাহবুব ইসলাম (তার ফেসবুক পোস্ট হতে)