ঢাকা,  শুক্রবার   ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ রাজনীতি ]

লংমার্চের মধ্য দিয়ে কি ‘বড় আন্দোলনের’ পথ খুঁজছে জামায়াত-এনসিপি?

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০:২৩, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লংমার্চের মধ্য দিয়ে কি ‘বড় আন্দোলনের’ পথ খুঁজছে জামায়াত-এনসিপি?
লংমার্চ উপলক্ষে চট্টগ্রামে এগার দলের সমাবেশ। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ ও পথসভা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১১ দলীয় ঐক্য। আগামী দুই মাসে আরও তিনটি বিভাগে একই ধরনের কর্মসূচি রেখেছে তারা।

কর্মসূচির শেষে নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করারও কথা রয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের যাত্রাপথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করেন জোটের নেতারা এবং তুলে ধরেন ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবি।

কিন্তু প্রথম দিনের কর্মসূচিতেই এমন মন্তব্য আসে যে, লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে বা দাবি পূরণ না হলে সরকার পতনের এক দফা দেওয়া হবে।

Advertisement

কর্মসূচির শুরুতে ঢাকায় যে সমাবেশ হয়, সেখানে জোটের অন্যতম শরিক দল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার যদি লংমার্চে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে 'ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে।

অন্যদিকে কর্মসূচির শেষ হয় যেখানে, সেই লালদীঘির সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সরকারকে সতর্ক করেন, বিরোধী দলের আন্দোলন 'ঈদের পরের আন্দোলন হবে না।

সরকার থেকেও অবশ্য এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যদিও আগেই খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচিকে ইঙ্গিত করে বলেন, 'জনগণকে বিভ্রান্ত করে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে'।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদেও তিনি মন্তব্য করেন, 'আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে, জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।'

এসব বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠছে, এই লংমার্চ কর্মসূচির মাধ্যমে বিরোধী দল কি সরকারকে বড় আন্দোলনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চায়?

সরকার কেন সন্দেহ করছে?
জামায়াত-এনসিপির কর্মসূচির দিনই ঢাকায় বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, দেশে অরাজকতার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, 'আমরা খেয়াল করছি কিছু রাজনৈতিক দল, কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে এবং বিভ্রান্তি তৈরির মাধ্যমে দেশে একটি অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, অবশ্যই দেশের আইনে বলে দেওয়া আছে কীভাবে অরাজকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।'

পরদিন দলটির পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদও বিরোধী দলের কর্মসূচির সমালোচনা করেন।

কিন্তু সরকারের এমন সমালোচনা বা সন্দেহের কারণ কী? কিংবা বিরোধী দলের কর্মসূচি নিয়েই বা কেন উদ্বিগ্ন?

এমন প্রশ্নে দুটি বিষয় উঠে আসছে। একটি হচ্ছে, সরকার মাত্র ছয় মাস পার করেছে। এর মধ্যেই এমন আন্দোলনের যৌক্তিকতা দেখছে না বিএনপি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, কর্মসূচি ঘিরে সম্ভাব্য 'অস্থিরতা সৃষ্টির তথ্য'।

'জামায়াতের এই লংমার্চকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ এক ধরনের সুযোগ নিতে চেয়েছিল যে, এই লংমার্চের মধ্যে ঢুকে তারা এক ধরনের অঘটন ঘটাবে। এখানে সরকারের কাছে তথ্য ছিল। যে কারণে সরকারের পক্ষ থেকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল, যাতে করে সরকার পতন কিংবা সরকারকে দায় চাপানোর রাজনীতি কেউ করতে না পারে,' বলছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন।

তার মতে, গণভোটসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার 'প্রতারণা করে গেছে' এবং এর বাইরে আওয়ামী লীগ সরকারের ষোলো বছরের যে 'অব্যবস্থাপনা', সেটার দায় বিএনপির নয়।কিন্তু জামায়াত এসবের দায় 'বিএনপির ওপর চাপিয়ে চাপিয়ে লংমার্চ কর্মসূচি করছে' বলেও তিনি মনে করেন।

'বড় আন্দোলনের' পথ তৈরি করছে জামায়াত?
লংমার্চে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে দাবি তুলে ধরা হয়েছে মূলত ছয়টি। যেখানে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাসের সংকট, দুর্নীতি-দলীয়করণ বন্ধ করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের ছয় মাস পার হতে না হতেই এসব দাবি সামনে রেখে বড় ধরনের কর্মসূচিকে সন্দেহ করছে বিএনপি। আবার জামায়াতের কর্মসূচি থেকেও এটা স্পষ্ট যে, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সরকারকে রাজপথেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার পথ তৈরি করতে চায়।

জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, পরবর্তী লংমার্চ হবে ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে ১৯ সেপ্টেম্বর। এরপর খুলনায় ১০ অক্টোবর। আর ২৪ অক্টোবর লংমার্চ হবে সিলেটে। বিভাগীয় শহরে চারটি লংমার্চ শেষে নভেম্বরে ঢাকায় হবে মহাসমাবেশ। যেখান থেকে আসবে পরবর্তী কর্মসূচি বা ঘোষণা। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র ছয় মাস হতেই কেন এ রকম ধারাবাহিক কর্মসূচিতে যাচ্ছে ১১ দলীয় জোট?

'সরকার একেবারে প্রথম দিনেই গণভোটের রায়কে অস্বীকার করেছে। যেকোনো একটা সরকারের কিছু সময় যাওয়ার পরে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়গুলো আসে। কিন্তু এই সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন না। তারা একেবারে শুরুর দিনেই যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল যে, গণভোটের গণরায়কে তারা বাস্তবায়ন করবে—এটাকে তারা অস্বীকার করেছে,' বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তার মতে, পরিস্থিতিই তাদের আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

অন্যদিকে, একই রকম মত দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। 'প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে দুটো ম্যান্ডেটরি টাইম ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশন যেদিন শুরু হবে, তার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে হবে। আপনি ডাকেন নাই। ছয় মাসের মধ্যে জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন করে সংবিধানে তফসিল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই সেপ্টেম্বরে সেই ছয় মাসও শেষ হয়ে যাচ্ছে,' বলেন তিনি।

গোলা পরওয়ার মনে করেন, সরকার গণভোটের রায় কিংবা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন তো করছেই না, বরং 'ইচ্ছেমতো চলার' প্রবণতা তৈরি হয়েছে; যেকোনো আইন পাস থেকে শুরু করে সবখানেই এটা দেখা যাচ্ছে।

'সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আপনি যা ইচ্ছা, তা-ই করে যাবেন, এজন্য তো লোকেরা উনাদের ভোট দেয় নাই। আর আপনি যদি ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে মেজরিটি হন, তাহলে গণভোটে তো প্রায় ৭০ শতাংশ হ্যাঁ ভোটের পক্ষে পড়েছে। সেটা মানবেন না?'

আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি বলেন, 'এখন এই যে, বলা হচ্ছে মাত্র ছয় মাস হলো, এখন এমন কী হয়েছে! ...কিন্তু এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে যে গণ-আকাঙ্ক্ষা, আপনি তাকে অস্বীকার করে যাচ্ছেন! এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে?' প্রশ্ন করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।

বিরোধী দলের পক্ষে 'বড়' আন্দোলন সম্ভব?
এটা স্পষ্ট যে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট একটি বড় আন্দোলনের পথ তৈরি করতে চায়। কিন্তু সেটা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে রাজনীতি বিশ্লেষকদের কারও কারও। এখানে ঘুরেফিরে কয়েকটি কারণ সামনে আসছে।

একটি হচ্ছে, সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের 'দুর্বল ভূমিকা'। মূলত নবীন ও অনভিজ্ঞ এমপিদের নিয়ে সংসদে সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রেখে আলোচিত হয়েছেন, এমন উদাহরণ সেভাবে নেই।

আরেকটি হচ্ছে, ১১ দলের আন্দোলনের ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এর সুবিধা নেবে কি না, সেই প্রশ্ন।

'জামায়াতের একটা ইমেজ তৈরি হয়ে গেছে যে, তারা দুর্বল বিরোধী দল। এখন তাদের পক্ষে সবল আন্দোলন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন তো আছেই। এছাড়া জামায়াতের জন্য একটা উভয় সংকট আছে, বিপদও আছে। সেটা হচ্ছে, তারা বিএনপির সঙ্গে এমন কোনো সংঘাতে জড়াতে চাইবে না, যাতে করে নির্বাচনের পর তাদের যে অর্জন হয়েছে, সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরেকটা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের পলিটিক্সের সুবিধা হবে এমন কোনো কাজ তারা করবে না,' বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ।

তার মতে, সংসদে বা এর বাইরে জামায়াতের 'শক্তিশালী বিরোধী দলের কোনো ইমেজ তৈরি হয়নি'। ফলে দলটির লক্ষ্য থাকবে আন্দোলনের মাধ্যমে শক্তিশালী বিরোধী দলের ইমেজ তৈরি করা বা সরকারকে সেই বার্তা দেওয়া।

'তবে খুব বড় ধরনের কোনো আন্দোলন হবে বা সরকার পতনের দিকে যাবে, সেরকমটা আমার মনে হয় না,' যোগ করেন অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।

এদিকে দুর্বল বিরোধী দলের ইমেজ নিয়ে আবার ভিন্নমত আছে জামায়াতের। জানতে চাইলে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছেন, এটা কোনো দুর্বলতা নয়।

'আমি এটার তীব্র আপত্তি করি যে বিরোধী দল দুর্বল। তো এখন সবলতা দেখাতে গেলে প্রতিদিন পাঁচটা করে গাড়িতে আগুন দিলে সবাই বলবে যে, বিরোধী দল খুব মজবুত। আমরা তো এই ন্যারেটিভ দেশে তৈরি করতে চাই না। এটা একটা ব্যাড কালচার, ব্যাড প্র্যাকটিস।'

জামায়াত কি সরকারের পতন চায়?
জামায়াত তাদের ভাষায় 'নিয়মতান্ত্রিক' ও 'জোরালো' আন্দোলনের কথা বলছে। আবার এটাও স্পষ্ট যে, রাজপথে জোরালো আন্দোলন করতে গিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সুযোগ পাবে কি না, সেটা নিয়েও এক ধরনের সতর্কতা, এমনকি দ্বিধাও আছে দলটির ভেতরে। ফলে বিরোধী দলের আন্দোলন সরকার পতনের দিকে যাচ্ছে, এমন কথা সরকারি দলের নেতারা তুললেও জামায়াতসহ ১১ দল বলছে, সরকার পতন তাদের উদ্দেশ্য নয়।

'আমরা সরকারের কাছে বারবার বলেছি যে, আমরা যে লংমার্চে গিয়েছি, আন্দোলনগুলো করছি। এগুলো কিন্তু এখনো সরকার পতনের আন্দোলন না। আমরা এখানে সরকার যেন জনগণের কথাগুলো বাস্তবায়ন করে, ভুল পথে না যায়, সেজন্য তাদের রিমাইন্ডার দিচ্ছি,' বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। অন্যদিকে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও একই মত দিয়েছেন।

তিনি বলেন, 'আমরা সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামায় ফেলবো—অনেকে ভুল ব্যাখ্যা থেকে এমনটা মনে করতে পারেন। একের পর এক কর্মসূচি দিচ্ছে মানে কি, শেষে গিয়ে কি সব নামায় দেবে? না, আমরা যে দাবি করছি সেটা মানতে হবে—আমরা এটাই বলছি।'

কিন্তু যদি সরকার দাবি মেনে না নেয়, তাহলে কী হবে? এমন প্রশ্নে পরওয়ার বলেন, 'আমরা জনগণের দাবি পূরণের পথ তৈরি করছি। এখন এই পথ, এই দাবি, এই আওয়াজ যদি কারও কানে না যায়, তাহলে এরপরে কী হবে, সেটা পরেই বলা যাবে।' সূত্র: বিবিসি বাংলা

ডেইলি-বাংলাদেশ/একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!