সাপের ভয় জয় করে প্রাণ বাঁচানোর নেশায় মিতু
একসময় সাপ দেখলেই ভয় পেতেন জান্নাতুন নেসা মিতু। এখন সাপের খবর পেলেই ব্যাগে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে যান তিনি। বাড়ির ঘর, মুরগির খোপ কিংবা স্টোররুমের মেঝের নিচে—যেখানেই সাপ আটকে পড়ুক, খবর পেলেই সেখানে পৌঁছে যান মিতু। সাপটির গতিবিধি বুঝে নিরাপদে উদ্ধার করেন, এরপর ফিরিয়ে দেন তার স্বাভাবিক আবাসস্থলে।
নোয়াখালীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় প্রতিদিনই তার কাছে আসে সাপ উদ্ধারের ফোন। কখনো চৌমুহনী, কখনো বেগমগঞ্জ, মাইজদী সদর কিংবা কবিরহাট। ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা অ্যাসাইনমেন্টের ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলেই ছুটে যান তিনি।
.png)
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বন্যপ্রাণিবিদ্যা বিষয়ে মাস্টার্স করছেন মিতু। তার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে, তবে বেড়ে ওঠা ঢাকায়।
সাপ উদ্ধারের কাজ করতে করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের কাছেও বদলে গেছে তার পরিচয়। কেউ ডাকেন ‘সাপুড়ে আপা’, কেউ ‘কালনাগিনী’, আবার কেউ মজা করে বলেন ‘বেঁদে মিতু’। এসব মজার ডাকনামের আড়ালে রয়েছে ভয়কে জয় করে দায়িত্ব নেওয়ার এক গল্প।
অনার্স শেষ করার পর মাস্টার্স শুরু হতে কিছুটা সময় পেয়েছিলেন মিতু। সেই সময়টাকে পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন তিনি। বন্যপ্রাণীর প্রতি আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। ভাবছিলেন, এই ক্ষেত্রে কোথায় কাজ করা যায়।
খোঁজ করতে গিয়ে দেখলেন, সাপ নিয়ে কাজ করা নারী রেসকিউয়ারের সংখ্যা খুবই কম। বিষয়টি তাকে আগ্রহী করে তোলে। সাপ নিয়ে পড়াশোনা ও খোঁজখবর করতে গিয়ে পরিচয় হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ওয়াইল্ডলাইফ স্নেক অ্যান্ড রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশ’ (WSRTBD)-এর সঙ্গে।
সংগঠনটির লার্নার ব্যাচে ভর্তি হন মিতু। সাপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে প্রায় আট মাস ক্লাস করেন। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নেন হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ।
প্রশিক্ষণের পর সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন রেসকিউ অভিযানে যেতে শুরু করেন তিনি। কোন সাপের ক্ষেত্রে কী কৌশল ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে নিরাপদে সাপ হ্যান্ডেল করতে হয়, আশপাশের মানুষের পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হয়—সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখেছেন। রেসকিউয়ের সময় উৎসুক মানুষের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বিষয়টিও শিখেছেন সেখান থেকেই।
মিতু বলেন, ‘আমি শুরুতে সাপকে বেশ ভয় পেতাম। কিন্তু সাপ সম্পর্কে জানার পর এবং তাদের গতিবিধি বোঝার পর সেই ভয়টা ধীরে ধীরে দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।’
প্রথম সাপ ধরার স্মৃতিটিও মিতুর কাছে বিশেষ। সদ্য স্নাতক শেষ করার পর সন্দ্বীপে একটি সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়ে প্রথমবার সাপ উদ্ধার করেন তিনি।
সেই শুরু। এরপর নোয়াখালীর বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক রেসকিউয়ে যেতে থাকেন মিতু। এর মধ্যে কবিরহাটে জোড়া পদ্মগোখরো উদ্ধারের ঘটনাটি তার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
মিতু জানান, একটি বাড়িতে মুরগি ও কবুতর পালন করা হতো। কয়েক দিন ধরে বাড়ির লোকজন লক্ষ্য করছিলেন, মুরগির ডিম উধাও হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ছোট বাচ্চাগুলোও কোনো কিছুর কামড়ে মারা যাচ্ছিল। তিন-চার দিন পর তারা দেখতে পান, দুটি পদ্মগোখরো মুরগির ঘরের মেঝেতে থাকা ডিম খাচ্ছে।
বিষধর সাপ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির লোকজন সাপ দুটিকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। তবে বাড়ির একজন যুবক সাপ উদ্ধার কার্যক্রম সম্পর্কে জানতেন। তিনি সংগঠনটির হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করেন। পরে রেসকিউ কলটি মিতুর কাছে পৌঁছায়।
মিতু বলেন, ‘খবর পাওয়ার পর দ্রুত সেখানে যাই। নিরাপদে দুটি সাপ উদ্ধার করি। একই সঙ্গে বাড়ির মানুষকে শঙ্কামুক্ত করার পাশাপাশি সাপ সম্পর্কে সচেতন করি।’
মাইজদীর রশিদ কলোনির একটি রেসকিউয়ের ঘটনাও মিতুর মনে গেঁথে আছে। বন্যার পর একটি বাড়িতে সাপের আনাগোনা দেখা দিলে খবর পেয়ে সেখানে যান তিনি।
সাপটি লুকিয়ে ছিল স্টোররুমের মেঝের নিচে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ির মানুষের সহযোগিতায় মেঝে খোঁড়া হলেও সাপটির দেখা মিলছিল না। একপর্যায়ে সাপটি আর পাওয়া যাবে না বলেই মনে হচ্ছিল।
ঠিক তখনই সন্ধান মেলে সাপটির। মেঝের নিচে একটি ইঁদুরের গর্তে সাপটি ১৭টি ডিম দিয়েছিল। পরে ডিমসহ সাপটিকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
রেসকিউ করতে গিয়ে শুধু সাপের সঙ্গেই নয়, মানুষের নানা ধারণার সঙ্গেও লড়তে হয় মিতুকে। অনেক সময় ঘটনাস্থলে গিয়ে শুনতে হয়, ‘আপনি তো মেয়ে, সাপ ধরবেন কীভাবে?’
একজন নারী সাপ উদ্ধার করতে পারেন—এটি অনেকের কাছেই এখনও অবিশ্বাস্য। শুরুতে মিতুর পরিবারও তার এই কাজ সহজভাবে নেয়নি। রেসকিউয়ে যেতে নিষেধ করত। তবে ধীরে ধীরে তার কাজ সম্পর্কে বুঝতে পেরে পরিবারও পাশে দাঁড়িয়েছে।
মিতুর মতে, রেসকিউয়ের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেকে স্থির রাখা। আশপাশের মানুষের নানা কথা বা পরামর্শে মনোযোগ না দিয়ে সাপের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হয়। এরপর নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সাপটিকে উদ্ধার করে ব্যাগিং করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘রেসকিউয়ে যাওয়ার আগে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করি। এখন সাপ ধরার সময় আর ভয় কাজ করে না। আলহামদুলিল্লাহ, এখন পর্যন্ত আমার সবগুলো রেসকিউ সফল হয়েছে।’
তবে প্রতিটি রেসকিউয়ের আগে সতর্ক প্রস্তুতি নেন তিনি। কারণ অনেক সময় বাড়ির মানুষ সাপটিকে নির্বিষ বলে বর্ণনা করলেও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সেটি বিষধর সাপ।
এ কারণে সম্ভব হলে আগে সাপটির ছবি বা ভিডিও পাঠাতে বলেন মিতু। এতে পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে পারেন তিনি।
সাপ দেখলেই মেরে ফেলার প্রবণতা নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে মিতুর। তার মতে, আতঙ্ক থেকেই দেশে অনেক বন্যপ্রাণী মারা যায়, যার মধ্যে সাপ অন্যতম।
তিনি বলেন, ‘সাপ দেখার সঙ্গে সঙ্গে লাঠি বা হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে মেরে ফেলার একটা তীব্র প্রবণতা আছে। কিন্তু এটা মোটেও উচিত নয়।’
মানুষকে সাপের গুরুত্ব বোঝাতে চান মিতু। তার মতে, কৃষিজমির ফসল নষ্ট করা ইঁদুর খেয়ে সাপ কৃষকের উপকার করে। জলজ পরিবেশেও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বিষধর সাপের বিষ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হচ্ছে এবং তা থেকে অ্যান্টিভেনমসহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তাই বিষধর হোক কিংবা নির্বিষ—প্রতিটি সাপেরই প্রকৃতিতে আলাদা ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করতে চান মিতু। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে আরও বেশি কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তার। মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমিয়ে আনার কাজটিকেও আরও বিস্তৃত করতে চান তিনি।
মিতু বলেন, ‘সাপ রেসকিউ করার অনুভূতি খুবই অসাধারণ। তখন মনে হয়, আমি একজন মানুষ হিসেবে একটি প্রাণীকে নিরাপদে তার নিজস্ব বাসস্থানে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি। তাই ভয় নয়, আনন্দটাই বেশি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভয়কে জয় করেছি ধীরে ধীরে সাপ সম্পর্কে জেনে। সাপ সম্পর্কে জানার পর ভয় নয়, বরং তাদের প্রতি অনুগ্রহ ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়েছে।’
একসময় যে প্রাণীটিকে দেখলে ভয় পেতেন, এখন সেই সাপের খবর পেলেই ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মিতু। কোথাও মানুষ আতঙ্কিত, কোথাও সাপটি বিপদে—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার কাজ একটাই, প্রাণীটিকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া এবং মানুষকে বোঝানো, ভয় পাওয়ার আগে জানতে হয়।
আর সেই কাজ করতে করতেই নোবিপ্রবির বন্ধুদের কাছে জান্নাতুন নেসা মিতু হয়ে উঠেছেন—‘সাপুড়ে আপা’, ‘কালনাগিনী’, ‘বেঁদে মিতু’।