ঢাকা,  মঙ্গলবার   ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ক্যাম্পাস ]

ধ্বংসস্তূপে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’, নীরব প্রতিবাদে বাঁধা কালো কাপড়

মো. আরিফ জাওয়াদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মো. আরিফ জাওয়াদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ২০:৪৯, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ধ্বংসস্তূপে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’, নীরব প্রতিবাদে বাঁধা কালো কাপড়
ডেইলি বাংলাদেশ

ফুলার রোডের পাশ দিয়ে হাঁটলে চোখে পড়ে ইতিহাসের এক নিস্তব্ধ ক্ষত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলসংলগ্ন ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য কমপ্লেক্স- যেখানে একসময় বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের ইতিহাস দৃশ্যমান হয়ে উঠত; এখন পড়ে আছে ভাঙাচোরা অবস্থায়। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাস্কর্যের খণ্ডিত অংশ যেন বহন করছে অবহেলার দীর্ঘ সাক্ষ্য।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শামীম সিকদারের নির্মিত এই ভাস্কর্য কমপ্লেক্স। এরপর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি।

মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাস্কর্যগুলোর বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে আছে। কোথাও মূর্তির অবয়ব ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে ভাঙা অংশ।

Advertisement

এই নীরবতার মধ্যেই মঙ্গলবার ভাস্কর্যগুলোর চোখ ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এই প্রতীকী প্রতিবাদের আয়োজন করে। তাদের ভাষায়, এটি শুধু ভাঙচুরের প্রতিবাদ নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্মারক একটি স্থাপনার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার বিরুদ্ধেও নীরব অবস্থান। 

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়া বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় একটি গোষ্ঠী দেশের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনাচারের ওপর আঘাত করেছে। সেই সময় ফুলার রোডের স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বরেও ভাঙচুর চালানো হয়। ঘটনার প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এর তদন্ত কিংবা সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অর্ক বড়ুয়ার ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন থেকে হাঁটা দূরত্বে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা এমন অবস্থায় পড়ে থাকা দুঃখজনক। এ অবস্থার প্রতিবাদ জানাতেই ভাস্কর্যগুলোর চোখ ও মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত ভাস্কর্যগুলোর সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি জানান।

পাথরে লেখা সংগ্রামের ইতিহাস-

‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ কেবল একটি ভাস্কর্য নয়, এটি বাঙালির স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিক ইতিহাসকে ধারণ করা একটি শিল্পকর্ম। খ্যাতিমান ভাস্কর প্রয়াত শামীম সিকদার এই কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। এতে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফাভিত্তিক স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

ভাস্কর্য কমপ্লেক্সে রয়েছে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার সংগ্রামের আহ্বান, ২৫ মার্চের কালরাত্রি, ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের চিত্রায়ণ। বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে নিহত ১৮ জন শহীদের মুখাবয়বও এই ভাস্কর্যের অংশ।

১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাস্কর্য কমপ্লেক্সটির উদ্বোধন করেন। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাস্কর্যগুলো এখন নিজেরাই যেন ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়ের অংশ। একসময় যে মুখগুলো বাঙালির সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কথা বলত, সেসব মুখ আজ ভাঙা, ক্ষতবিক্ষত। তার ওপর বাঁধা কালো কাপড় প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে—সংস্কারের অপেক্ষায় থাকা একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার নীরব আর্তি হিসেবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ//এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!