দিনে অন্য কাজ রাতে ছিনতাই
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাতের ছিনতাইকারীরা দিনের আলোয় সবজি, ফল, পান-সিগারেট, ডাব, বাদাম, পেয়ারা, আমড়া বিক্রি করে। অনেকে রিকশা-ভান চালায়। কেউ গাড়িতে পানি-জুসও বিক্রি করে। তবে রাত নামলেই তারা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সারারাত ধরে চলে তাদের ছিনতাই কার্যক্রম। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
যেসব এলাকায় ছিনতাই বেশি হয়
ছিনতাইকারী চক্রগুলো রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় বেশি উৎপাত করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, বাসাবো, মালিবাগ রেলগেট, গুলবাগ, দৈনিক বাংলা মোড়, পীরজঙ্গি মাজার ক্রসিং, কমলাপুর বটতলা, মানিকনগর স্টেডিয়ামের সামনে, মতিঝিল কালভার্ট রোড, গুলিস্তান, কাকরাইল, শাহবাগ, মৌচাক, মগবাজার, হাতিরঝিল, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মহাখালী, গাবতলী, মিরপুর ১০ নম্বর, এয়ারপোর্ট, উত্তরা-আবদুল্লাহপুর, কামারপাড়া। আবার মার্কেট, শপিংমল, টার্মিনাল ও স্টেডিয়াম এলাকায়ও ছিনতাইকারীরা তৎপর থাকে।
.png)
ঘটনা বিশ্লেষণ-১
বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান। সম্প্রতি ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে সেই অভিজ্ঞতা তার ফেসবুকে শেয়ার করেন। তিনি লেখেন- ছিনতাইকারী কি আমার স্বজন? অফিস কার্যক্রম শেষে বাসায় যাওয়ার জন্য নেভি হেডকোয়ার্টার-এর ঠিক উল্টো পাশে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে দুইজন লোক আমাকে তুলে নিয়ে রেললাইনের দিকে যেতে থাকে। আমি দুইবার চিৎকার দিতেই রেললাইনের দিক থেকে আরো দুজন ছিনতাইকারী আসে। একজনের হাতে থাকা রামদা দিয়ে আমাকে সজরে আঘাত করে। ভাবলাম হাত কেটে গেছে, হাড়ও ভেঙে গেছে। অন্যজন পিস্তল ঠেকিয়ে বলল, যা আছে সব দিয়ে দে। বাধ্য হয়ে দুটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ সঙ্গে বেশ কিছু টাকা দিয়ে দিলাম। আবার অফিসে এসে গুলশানের দায়িত্বে থাকা পুলিশের উপ-কমিশনার আহাদ ভাইকে জানালাম...।
ঘটনা বিশ্লেষণ-২
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোর ৩টার দিকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা তার ফেসবুক পেজে মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের কথা জানান। তিনি লেখেন, মোবাইলটা উত্তরা থেকে গাড়ির জানালা দিয়ে টান দিয়ে নিয়ে গেছে। নাজমুলের এ পোস্টের নিচে অনেকেই জানান, তারাও একইভাবে ফোন হারিয়েছেন।
ঘটনা বিশ্লেষণ-৩
গত ১০ মার্চ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর উত্তরা ১৬ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সেতু এলাকায় এটিএম বুথে টাকা রিফিল করতে যাওয়ার পথে ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের (ডিবিবিএল) একটি মাইক্রোবাস থেকে ১১ কোটি টাকা প্রকাশ্যে ছিনতাই হয়েছে। বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানির কর্মকর্তারা মিরপুরের ব্যাংকের অফিস থেকে টাকা নিয়ে সাভারের দিকে যাওয়ার পথে ডাকাতের কবলে পড়েন। পথে ডাকাত দল কোম্পানিটির বিশেষভাবে ‘মডিফাইড’ মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘ফিল্মি স্টাইলে’ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত গাড়িটি জব্দ এবং সাত ডাকাতকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রাজধানীতে এসব ছিনতাই নিয়ে আলোচনার মধ্যে গত ১৩ মার্চ রাতে র্যাবের এক অভিযানে ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার ৩৫৫টি মোবাইল ফোন করা হয়েছে। র্যাব বলছে, এসব ফোন ছিনতাই বা চুরি করা হয়েছিল।
রাজধানীর শাহবাগ, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঐ ফোনগুলো উদ্ধার করা হয়। গত ১৪ মার্চ এক বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব জানায়, ফোনের পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে ৫১টি চার্জার। ছিনতাই চক্রের কিছু সদস্য রাজধানীর ফুটপাতে ঘোরাফেরা করে। ঐ চক্রের অন্য সদস্যরা বিভিন্ন অলি-গলিতে ওঁৎ পেতে থাকে। সুযোগ বুঝে তারা পথচারী, রিকশা আরোহী, যানজটে থাকা সিএনজি-অটোরিকশার যাত্রীদের ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেয়।
সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত তুলনামূলক জনশূন্য রাস্তা, লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন এলাকায় ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ছিনতাই কাজে বাধা দিলে তারা পথচারীদের প্রাণ নিতেও দ্বিধাবোধ করে না।
ছিনতাইকারীদের দমনে সম্প্রতি সাঁড়াশি অভিযান চালায় র্যাব। অভিযানে চক্রের মূল হোতাসহ ৩২ জনকে আটক করা হয়। এছাড়া ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত সুইচ গিয়ার, চাকু, ক্ষুর, এন্টিকাটার, কাঁচি, ব্লেড, মোবাইল ফোন এবং নগদ টাকাসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিরা বলছেন, রাজধানীর অনেক এলাকা ছিনতাইপ্রবণ। নানা সময় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছিনতাইকারীরা আমাদের সব কেড়ে নেয়। হয়রানি করে। জীবন নিয়ে ভয়ে থাকি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বেশি বেশি অভিযান চালাতে হবে। ছিনতাইকারীদের আটক করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অনেকে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করতেও থানায় যেতে চান না। অথচ স্মার্টফোন হাতছাড়া হলে সেটি ব্যবহারকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ছবি ছাড়াও ইদানীং ব্যাংকিং পাসওয়ার্ডসহ সংবেদনশীল অনেক তথ্য মানুষ ফোনে রাখে, সেগুলো বেহাত হলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়।
পুলিশ বলছে, ছিনতাইয়ের অভিযোগ করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া জাতীয় জরুরি সেবা ট্রিপল নাইনে (৯৯৯) কল করেও এ সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, দেশে কিছু কিছু সময় ছিনতাই বেড়ে যায়। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। সঠিকভাবে এ সক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মোরশেদ আলম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ছিনতাইকারীদের ধরতে প্রায় সময়ই অভিযান চালানো হয়। অনেককে ধরে চালান করা হয়। অনেকে জামিন পেয়ে বের হয়ে আবারো ছিনতাই শুরু করে।
তিনি আরো বলেন, এরা অধিকাংশই মাদকাসক্ত। আটকের পর এদের থানায় রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে। এদের কাছে ব্লেড থাকে, যেগুলো দিয়ে তারা নিজেদের শরীর কেটে ফেলে। বাথরুম করে ময়লা নিজেদের শরীরে মাখিয়ে ফেলে। হঠাৎ করে পড়ে গিয়ে মুখে ফ্যানা বের করে, মনে হয় যেন মারা যাচ্ছে। এসব অভিনয়ের জন্য তাদের রাখা কষ্ট হয়ে যায়।
পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ছিন্নমূল মাদকাসক্তদের নিয়ে উন্নয়নমূলক কর্মশালা বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে এ সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে।