ঢাকা,  বুধবার   ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

[ রাজধানী ]

রাজউকের ১,৬৫০ কোটি টাকার জমি দখলে ‘চক্র’

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩৯, ৭ অক্টোবর ২০২৬
রাজউকের ১,৬৫০ কোটি টাকার জমি দখলে ‘চক্র’
সংগৃহীত ছবি

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মূল সড়কের পাশে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রায় ১১ একর জমি দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দখলে থাকার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী জমিটির মূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। রাজউকের নিজস্ব এই জমি দখল করে সেখানে মাছ, মুরগি ও বাঁশের আড়তসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলে চলছে বাণিজ্য।

জানা গেছে, জমিটি দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। এ জমিকে কেন্দ্র করে পাঁচটি রিট মামলা হয়েছে। তবে ২১ বছরেও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় জমিটি কার্যত দখলেই রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জমি উদ্ধারের কার্যক্রমও থমকে আছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা গেছে, ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাড্ডা মৌজায় সিএস দাগের ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২-এর আদেশ অনুযায়ী একই বছরের ২৫ এপ্রিল জমিটির দখল ডিআইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তৎকালীন টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর ৯৩-এ ধারার আওতায় অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর ডিআইটির অনুকূলে জমিটির ‘দখল হস্তান্তর সনদ’ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক করা হয়।

জানা গেছে, জমিটি দখলে রাখার উদ্দেশ্যে ২০০৫ সালে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেন। একই বছর রাজউকের তৎকালীন আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা ওই জমিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্টরা হাইকোর্টে আরেকটি রিট করেন।

এরপর ২০০৭ সালে মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও রিট মামলা করে। পর্যায়ক্রমে জমিটি নিয়ে রাজউকের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি রিট মামলা করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ১১ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে থাকলেও তা উদ্ধারে রাজউকের কার্যকর তৎপরতা নেই। জমিতে থাকা বিভিন্ন আড়ত থেকে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ আদায় করা হয় এবং এর একটি অংশ রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী পান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়কের পাশেই রয়েছে বাঁশের বড় আড়ত। এর পরেই মেরুল কাঁচাবাজার। সেখানে একটি টিনের ঘরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’-এর কার্যালয় রয়েছে। এর পাশে গড়ে উঠেছে বড় একটি বস্তি। ১১ একর জমির আশপাশে রয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, রাজউক জমিটির মালিকানা দাবি করলেও সেখানে ব্যক্তিমালিকানার দাবি করে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে। এতে জমির আমমোক্তার হিসেবে মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সাইনবোর্ডে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯ এবং সিটি-১৫০০৯ দাগ নম্বর উল্লেখ করে জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ দেখানো হয়েছে।

রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম জমিটি উদ্ধারে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, রাজউকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের অনেক কর্মকর্তা কাজ করতে চান না এবং কাজ না করলেই তাদের লাভ—এমন মন্তব্যও করেন তিনি।

এদিকে, এই জমিকে ঘিরে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির বিরুদ্ধেও বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ছয় হাজার মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, সমিতির নামে ১ একর ৮৯ শতাংশ জমি বরাদ্দের দাবিতে সেখানে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই সমিতির সদস্য সংখ্যা ধাপে ধাপে প্রায় ছয় হাজারে পৌঁছায়।

একজন মুদি দোকানি জানান, জমিটির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ গঠন করে। সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সেখানে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট নির্মাণ এবং সদস্যদের স্বল্পমূল্যে দোকান দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ সদস্য দোকান পাননি।

২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির এবং অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদের স্বাক্ষরিত একটি নোটিশে সদস্যদের কাছ থেকে মামলা পরিচালনা ও অন্যান্য খরচ বাবদ এককালীন এক হাজার টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। মৃত বা অন্যত্র চলে যাওয়া সদস্যদের সদস্যপদ উত্তরাধিকারী কিংবা অন্য ব্যক্তির নামে হস্তান্তরের জন্য দুই হাজার টাকা করে দেওয়ার কথাও বলা হয়।

সদস্যদের অভিযোগ, স্থায়ী দোকান পাওয়ার আশায় তারা দীর্ঘদিন ধরে সমিতিতে টাকা জমা দিয়েছেন। রসিদসহ বিভিন্ন উপায়ে দফায় দফায় তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।

২০০৫ সালের দিকে রাজউক ওই জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালালে সমিতির কার্যক্রম কিছুটা থেমে যায়। পরে সদস্যরা টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। এরপর সমিতির কার্যালয় মেরুল বাড্ডা থেকে মতিঝিলে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাজউকের সঙ্গে আইনি জটিলতা দ্রুত মিটে যাবে—এমন আশ্বাস দিয়ে পরবর্তী সময়েও সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা ও কিস্তির টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটি দোকান হবে—এমন আশায় তিনি সমিতির সদস্য হন এবং নিয়মিত টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু ১৬ বছরেও দোকান পাননি। তার দাবি, সমিতির প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।

আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, দীর্ঘ ২০ বছরে তিনি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা সমিতিতে জমা দিয়েছেন। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকায় কিস্তি দেওয়া বন্ধ করেছেন। তবে তার জমা দেওয়া টাকার কোনো হিসাব তিনি পাচ্ছেন না।

সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ১৯৮৮ সালে সমিতির যাত্রা শুরু হয় এবং সদস্যরা প্রায় ৩০ বছর নিয়মিত চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত ১০ বছর ধরে সমিতির কার্যক্রমও কার্যত বন্ধ। তার ভাষ্য, সমিতিতে সংঘটিত অনিয়ম ও বিপুল অর্থের লুটপাটের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমিটি রাজউকের। তবে অর্থ নেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামে একটি পক্ষ জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করে রাখায় বিষয়টি ঝুলে আছে। রাজউকও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সমিতিকে জমি বুঝিয়ে দিতে রাজি নয় বলে জানান তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!