ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

[ পেশা ও জীবন ]

ক্ষুধার্ত মানুষের থালা এবং একটি অভিযোগপত্র

প্রসেনজিত হালদার
প্রকাশিত: ১৯:৫৮, ৫ নভেম্বর ২০২৬
ক্ষুধার্ত মানুষের থালা এবং একটি অভিযোগপত্র
আমার মনে হয়, ভবিষ্যতের ইতিহাস যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তাহলে সে আমাদেরও একদিন প্রশ্ন করবে, যখন খাদ্যের অপচয় পাহাড়ের মতো জমছিল, তখন কেন মানুষ ক্ষুধায় ঘুমাত

আমি ছোটবেলায় একটা গল্প শুনতাম, মহাভারতের গল্প। দ্রৌপদীর অক্ষয় পাত্রের গল্প। যত মানুষই আসুক, যত ক্ষুধার্তই হোক, সেই পাত্র থেকে অন্ন ফুরিয়ে যেত না। 

তখন মনে হতো, কী আশ্চর্য এক কাহিনি! পরে বড় হয়ে বুঝলাম, আসল আশ্চর্য পাত্রে ছিল না। আশ্চর্য ছিল সেই সমাজে, যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ানোকে অলৌকিকতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। 

কারণ মানুষ খুব আগেই বুঝেছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর যন্ত্রণা মৃত্যু নয়, ক্ষুধা। কিন্তু আজকের সমাজে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা সেই প্রাচীন শিক্ষাটুকু হারিয়ে ফেলেছি।

আমরা ক্ষুধাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শিখেছি। রাস্তার পাশে একটি শিশু না খেয়ে বসে আছে, এটি আর আমাদের বিস্মিত করে না। একজন বৃদ্ধ মানুষ ডাস্টবিনে খাবার খুঁজছে, এটি আর আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না। 

দিনমজুরের সন্তান স্কুলে না গিয়ে হোটেলে থালা ধুচ্ছে, এটিও আমাদের কাছে এখন সাধারণ দৃশ্য। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা এসবকে সমস্যা হিসেবেও দেখি না। আমরা মনে করি এটাই বাস্তবতা। এটাই নিয়তি। আমার প্রশ্ন হলো, নিয়তি কার?

যে শিশুটি জন্মের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, তার? যে বৃদ্ধ মানুষটি সারা জীবন শ্রম দিয়েছে, তার? নাকি সেই সমাজের, যে সমাজ সম্পদের পাহাড় গড়তে গড়তে মানুষের মৌলিক অধিকারকে বিসর্জন দিয়েছে?

আমরা প্রায়ই ব্যক্তির ব্যর্থতার গল্প শুনি। বলা হয়, মানুষ পরিশ্রম করলে সফল হবেই। কিন্তু আমরা খুব কমই শুনি কাঠামোগত বৈষম্যের গল্প। আমরা শুনি না সেই শিশুটির কথা, যে জন্মের প্রথম দিন থেকেই অন্য একটি শিশুর চেয়ে কয়েক হাজার ধাপ পিছিয়ে জন্মায়। 

একটি শিশুর জন্য জন্মদিনে বই, কম্পিউটার, ব্যক্তিগত শিক্ষক অপেক্ষা করে। আরেকজনের জন্য অপেক্ষা করে অপুষ্টি, অশিক্ষা আর অনিশ্চয়তা। 

তারপর একদিন আমরা দুজনকে একই দৌড়ের মাঠে দাঁড় করিয়ে বলি, যার যোগ্যতা বেশি সে জিতবে। এই ভণ্ডামিকে আমরা মেধার প্রতিযোগিতা বলি।

ধর্মগ্রন্থে বারবার দানের কথা বলা হয়েছে। অন্নদানকে শ্রেষ্ঠ দান বলা হয়েছে। উপনিষদে ‘অন্নং ব্রহ্ম’ অর্থাৎ অন্নই ব্রহ্ম বলা হয়েছে। বহু শাস্ত্রে ক্ষুধার্তকে অন্ন না দেয়াকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়েছে। 

কারণ প্রাচীন মানুষ জানত, ক্ষুধার সামনে ধর্ম, দর্শন, নীতি, আদর্শ সবকিছুই দুর্বল হয়ে পড়ে। 

কিন্তু আমরা ধর্মের মূল শিক্ষা থেকে যত দূরে সরে গেছি, ধর্মের প্রদর্শনী থেকে ঠিক ততটা দূরে যাইনি। মন্দিরে সোনার ঘণ্টা ঝুলছে, কিন্তু মন্দিরের বাইরের মানুষটি না খেয়ে আছে। 

পুজোর সময় আমরা বিশাল আয়োজন করি, কিন্তু আশপাশের ক্ষুধাকে দেখতে পাই না। আমরা পুণ্যের হিসাব রাখি, কিন্তু মানুষের হিসাব রাখি না।

সমাজের সবচেয়ে বড় পাপ হয়তো চুরি নয়, ডাকাতি নয়, এমনকি দুর্নীতিও নয়। সমাজের সবচেয়ে বড় পাপ হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ প্রতিদিন নিজের মর্যাদা আর ক্ষুধার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়। 

যেখানে একজন মা নিজের সন্তানকে না খাইয়ে ঘুম পাড়ায়। যেখানে একজন বাবা সারা দিন শ্রম দিয়েও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারে না। 

তখন ক্ষুধার্ত মানুষটি শুধু খাবার হারায় না। সে ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্ন হারায়, আত্মসম্মান হারায়, ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস হারায়। আর যে সমাজ মানুষের কাছ থেকে এই জিনিসগুলো কেড়ে নেয়, সে সমাজ যত উন্নয়নের গল্পই বলুক, তার সভ্যতার দাবি সব সময়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। 

ইতিহাসে অনেক পাপের বিচার হয়েছে। অনেক অত্যাচারীর নাম লেখা আছে কালো অক্ষরে। 

কিন্তু আমার মনে হয়, ভবিষ্যতের ইতিহাস যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তাহলে সে আমাদেরও একদিন প্রশ্ন করবে, যখন খাদ্যের অপচয় পাহাড়ের মতো জমছিল, তখন কেন মানুষ ক্ষুধায় ঘুমাত? 

আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হয়তো আমরা বুঝব, ক্ষুধার্ত মানুষের খালি থালা তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রতীক ছিল না। সেটি ছিল পুরো সমাজের বিবেকের বিরুদ্ধে দাখিল করা একটি নীরব অভিযোগপত্র।

লেখক : প্রসেনজিত হালদার
শিক্ষার্থী (আইন বিভাগ), নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, খুলনা

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!