ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

অপরাধীদের অভয়ারণ্য খুলনা, ২৫ মাসে ২২৫ খুন

শরীফা খাতুন শিউলী, খুলনা
প্রকাশিত: ২০:২২, ৫ নভেম্বর ২০২৬
অপরাধীদের অভয়ারণ্য খুলনা, ২৫ মাসে ২২৫ খুন
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

খুলনা শহর এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দিন যতো যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। বাড়ছে খুন, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, লুটপাটের মতো ঘটনা। পথে-ঘাটে হানা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হানা দিচ্ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। অপরাধের সব সূচকই ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। 

হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় খোদ পুলিশ প্রশাসনও উদ্বিগ্ন। ছিনতাইয়ের কবল থেকে রক্ষা পায়নি পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরাও। লোকচক্ষুর আড়ালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে উপেক্ষা করে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একের পর এক খুন করে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের গডফাদাররা।

পুলিশ বলছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগই এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছে। দেশের বাইরে থেকেই তারা খুলনায় অপরাধজগতের ‘কাঠি নাড়ছে’। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—খোদ পুলিশ কর্মকর্তা যেখানে নিরাপদ নন, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বারবার জামিন পেয়ে বেপরোয়া হচ্ছেন অপরাধীরা। 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী খুলনা। অপরাধীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহারে প্রায় প্রতি দিনই ঘটছে হত্যাকান্ড। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা জেলা ও মহানগরীতে ২২৫ জনকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

এক সময়ের শান্ত খুলনায় এখন প্রকাশ্যে গুলি কিংবা হত্যাচেষ্টা নিত্য ঘটনা। মহানগর থেকে প্রান্তিক গ্রাম। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে পরিনত হয়েছে আতঙ্কের জনপদে। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি রূপসা উপজেলায়। খুলনার রূপসা উপজেলার আঠারোবেকি নদীর চরে গত সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে স্থানীয় লোকজন প্রথমে একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই স্থানে আরও একটি মরদেহ দেখতে পায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, নিহত দুজনের একজন মেহেদী হাসান (৩৫)। তিনি রূপসার রাজাপুর এলাকার আবদুল্লাহর ছেলে। একসময় জেলখানা ঘাটের মাঝি ছিলেন তিনি। নিহত অন্যজনের নাম রেজাউল করিম (৩০)।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, খুলনার অপরাধজগতে আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর গড়া সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘বি-কোম্পানি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন মেহেদী ও রেজাউল। দুজনের শরীরেই গুলির চিহ্ন রয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবারও (৫ নভেম্বর) নতুন আরেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ডুমুরিয়া উপজেলার আমভিটা-রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় একটি চায়ের দোকানের ভেতরে ঢুকে তরিকুল ইসলাম শেখ (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত তরিকুল ইসলাম শেখ ডুমুরিয়া উপজেলার ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম শেখের ছেলে। স্থানীয়রা বলেন, নিহত ঘের ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। এ সময় দুজন যুবক মোটরসাইকেলে এসে চায়ের দোকানে থাকা তরিকুলকে লক্ষ্য করে মাথায় গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তরিকুল। এ সময় দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলযোগে খুলনা-দৌলতপুর সড়ক হয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। তবে কী কারণে এবং কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। ঘটনার কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার হাফিজুর রহমান বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত বলা যাবে।

এর আগে গত ১৫ আগষ্ট কুপিয়ে হত্যা করা হয় জয় ঢালী নামের এক যুবককে। এর দুই মাস আগে মাথায় দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারান বাবা আক্তার ঢালীও। গত রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় খুলনা মহানগরীর আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকার নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খুন হন খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির। তাকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। আর শনিবার (৩১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে মহানগরীর লবণচরা এলাকার সড়ক থেকে এক যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যার পর সড়কে মরদেহ ফেলে যায়। ২৬ অক্টোবর রাত থেকে ২৭ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত খুলনায় গুলির তিনটি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বটিয়াঘাটা উপজেলার পৃথক দুটি স্থানে গুলিতে আহত হন যুবদলের সাবেক দুই নেতা। আর খুলনা মহানগরীরতে গুলিবিদ্ধ হন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী।

২৫ অক্টোবর সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২৪ অক্টোবর দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু নামের এক কলেজশিক্ষককে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন সকালে তেরখাদা উপজেলায় দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে রামীম বিশ্বাস নামের যুবদল এক নেতা আহত হন। ২২ অক্টোবর খুলনায় ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই দিন সকালে পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন সন্ধ্যার পর নগরের জিন্নাহপাড়ায় বাসার কাছেই দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন গৃহবধূ খুশি আক্তার। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দুটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদকসংক্রান্ত বিরোধ কাজ করেছে। একই সঙ্গে দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

গত ১০ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে খুলনা নগরীর কাশিমনগর তিন নম্বর সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আশিকুজ্জামান জনি (৩৪) নামে এক ব্যক্তি আহত হন। আহত জনিকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহত জনি ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হামিদের ছেলে। তিনি বটিয়াঘাটায় জিএমআই গ্যাস কোম্পানিতে অপারেটর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

তার তিনদিন আগে ৭ অক্টোবর দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে খুলনা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে অফিস থেকে বের হওয়ার পর প্রকাশ্যে রিকশায় করে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠে। প্রায় আধাঘণ্টা পর তিনি নিজেই অফিসে ফিরে আসেন। তবে কে বা কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আগষ্টের শুরুতে বিএল কলেজের গেটে গুলিবিদ্ধ হন মহিদুল ইসলাম নামের এক যুবক। ঠিক কিছুদিন আগে নগরের এই এলাকার মসজিদে গুলিবিদ্ধ হন আরো দুজন। আর সবশেষ ফিল্মি স্টাইলে জনি নামের যুবককে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা।

পুলিশের হিসাবেই গত ১০ মাসে খুলনায় ঘটেছে ৭৩টি হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে মহানগরীতে ৩৭টি এবং জেলার বিভিন্ন জায়গায় ৩৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। আর বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে অর্ধ শতাধিক অস্ত্র। ধারাবাহিক এমন হত্যা আর গোলাগুলির ঘটনায় আতঙ্কে খুলনাবাসী।

খুলনায় তিন অজ্ঞাতনামা ছিনতাইকারীর হামলায় শাহ আলম (৪৩) নামে এক পুলিশ পরিদর্শক গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে খুলনা মহানগরীর সদর থানাধীন কলেজিয়েট স্কুলের সামনে প্রধান সড়কে এ ঘটনা ঘটে। আহত শাহ আলম খুলনা জেলার এ-সার্কেল অফিসে কর্মরত। ছিনতাইকারীর হামলায় পুলিশ আহতের ঘটনার পর রাতে একা চলাচল না করতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছে জেলা পুলিশ। যা নিয়ে সারা দেশে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন পুলিশ যদি নিরাপত্তহীনতায় ভোগে তাহলে সানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

বিদেশি নাম্বার থেকে চাঁদা দাবি:
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, খুলনায় তা অপরাধীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরোনো সন্ত্রাসীরা। তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারে প্রায় প্রতি দিনই ঘটছে হত্যাকান্ড ও হত্যাচেষ্টা। আর এই ভয়ের রাজত্বে একটি চক্র চাঁদাবাজিতে মেতে উঠেছে। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজির জন্য বিদেশি নম্বর থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে প্রতিষ্ঠানে গুলি, মালিকের ওপর হামলা এবং কোথাও কোথাও প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। অনেকে ভয়ে নিরবে চাঁদা দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ভয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখছেন।

২ বছরে ১ ডজন বিএনপি নেতা-কর্মী খুন:
খুলনায় ধারাবাহিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় বাদ যাচ্ছে না বিএনপির নেতা-কর্মীরাও। সরকার গঠনের পর থেকেই খুলনার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। ২ বছরে খুলনায় ১ ডজন বিএনপি নেতা-কর্মী বিভিন্নভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ডুমুরিয়া উপজেলার আমভিটা-রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় একটি চায়ের দোকানের ভেতরে ঢুকে তরিকুল ইসলাম শেখ (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত তরিকুল ইসলাম শেখ ডুমুরিয়া উপজেলার ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম শেখের ছেলে। এর আগে গত রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরের আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবিরকে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত হুমায়ুন নগরের আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকার সৈয়দ আনোয়ার আলীর ছেলে। 

চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে হাসপাতাল রোডে পিটুনিতে মারা যান বিএনপি কর্মী বাবুল মোল্লা। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি দিঘলিয়ার সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মুরাদ খানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ মার্চ মাসুম বিল্লাহ এবং ১৬ মার্চ রাশু নামে দুইজন খুন হন। ১২ জুন খুলনার লবণচরা থানার অন্তর্গত মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে দুর্বৃত্তের গুলিতে রফিকুল ইসলাম নামে এক বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়। নিহত রফিকুল ইসলাম ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৫ আগস্ট রূপসার দুর্জনীমহলে ছেলে জয় ঢালীকে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় ৫ অক্টোবর বাবা আক্তার ঢালীকে খুন করে দুর্বৃত্তরা। তারা উভয়ে বিএনপির কর্মী ছিলেন।

থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও শেষ রক্ষা হয়নি রূপসার বাস শ্রমিক আক্তার ঢালীর। ছেলেকে হত্যার ঘটনায় মামলা করার পর হুমকি পেয়ে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন তিনি। জিডি করার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় নিজ বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। এর আগে ২৬ অক্টোবর দিনগত রাতে খুলনার বটিয়াঘাটায় যুবদল নেতা সোহেল শেখ (৩৬) গুলিবিদ্ধ হন। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় যুবদলের র‌্যালি শেষে বটিয়াঘাটার নিজ বাড়ি ফেরার পথে চক্রাখালী মোড়ে সাবেক যুবদল নেতা ও ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য ওহিদুল ইসলাম বাদলকে (৩৮) তিন রাউন্ড গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ২৪ অক্টোবর দিনের বেলায় তেরখাদায় গুলিবিদ্ধ হন মধুপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি রামিম বিশ্বাস (৩২)।

২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ২১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মানিক হাওলাদারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ১১ জুলাই নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় দৌলতপুর থানা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে। ওই বছরের ২ নভেম্বর খুলনা মহানগরীর আড়ংঘাটা থানার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে গুলি ও বোমা হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে এমদাদুল হক (৫৫) নামে একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন এক বিএনপি নেতাসহ দুজন। এ ঘটনায় আহত যোগীপোল ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য মামুন শেখ (৪৫) এবং স্থানীয় বাসিন্দা বেল্লাল হোসেনকে (৩০) গুলিবিদ্ধ অবস্থায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর রাতে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আমিন মোল্লা বোয়িংকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। ৪ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন, এমন হত্যাকান্ড দেখতে চাই না। এ ধরনের ঘটনা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। তিনি খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুলের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, খুলনায় একের পর এক হত্যাকান্ডের ঘটনায় বিএনপি নেতাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তারা পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে দাবি জানিয়েছেন। কিশোর গ্যাং, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করা না গেলে খুলনার জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হবে। তার দলের কেউ মাদক কারবার বা অন্য কোনো অপকর্মে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

১০টি সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে জিম্মি খুলনা:
প্রায় ২ যুগ আগে খুলনা মহানগরীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী ছিলেন খুনী এরশাদ শিকদার। খুলনায় তখন তার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলে। কিন্তু বর্তমানে খুলনায় অসংখ্য নয়া এরশাদ শিকদারের আবির্ভাব হয়েছে। যারা আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দিনে-দুপুরে একের পর এক হত্যাকান্ড চালাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর খুলনায় এসব সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র ও মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে মহড়া দিচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রগুলো বলছে, আর্থিক সংকটে থাকা বেকার তরুণদের একটি অংশকে বিদেশে থাকা সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে। যাদের নিয়মিত আয়ের উৎস নেই, জীবন নিয়ে হতাশা আছে, তাদের টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখন খুলনার সন্ত্রাসী জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে ১০টি সন্ত্রাসী গ্রুপ। এরা হলো- গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, রোহান ও পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীর হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নবাব গ্রুপ ও নাসির গ্রুপ।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, এক সময়ের শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত খুলনা এখন দুর্বৃত্ত ও খুনিদের দখলে। বলতে গেলে খুলনা এখন খুনির নগরী। অপরাধীদের বেপরোয়া হওয়ার প্রধান কারণ হলো ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা এবং সাক্ষীর অভাবে বিচার না হওয়া অপরাধীদের জন্য একধরনের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করে। একই সাথে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে খুলনায় দিন দিন অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, পুলিশ বাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী পুলিশ সদস্যদের গাফিলতির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। পুলিশ কেন সক্রিয় হতে পারছে না, তা পুলিশকেই পরিষ্কার করে বলতে হবে। তাদের কোনো যৌক্তিক সমস্যা থাকলে তা সমাধান করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, খুলনায় নানা কারণে অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ -এর গণআন্দোলনের সময় জেলখানাসহ বেশ কিছু থানা আক্রান্ত হয়েছিলো। অস্ত্র ও গুলি লুট হয়েছিলো। তার কোন পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। অন্তবর্তীকালীন সরকার এর সংখ্যা প্রকাশ করেছে বলে মনে পড়ছে না। সেই অস্ত্র ও গুলিগুলো কি বিগত সরকার অথবা বর্তমান সরকারের আমলে উদ্ধার হয়েছে? বর্তমানে অপরাধকারীদের হাতে অস্ত্র এবং গুলির যে আধিক্য, এটা তার একটি অন্যতম কারন হতে পারে। পুলিশ প্রশাসন ২০২৪ সালের পর থেকে এক ধরণের ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খুলনা একটি বর্ডার এরিয়া। বিগত সরকারের অনেক নেত্রীবৃন্দ পার্শবর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ এখানে একটি অস্থির পরিবেশ তৈরী করতে অপরাধকে প্রলুদ্ধ করতে পারেন। বিচার এবং জামিনের ক্ষেত্রে আদালতের নিজস্ব অনুমান এবং দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিষয় আছে। যাকে ইকুইটি বা ন্যায়পরতা বলে। আদালত সামগ্রিক বাস্তবতা এবং অপরাধের ধরনের কথা বিবেচনা করে জামিনের বিষয়টি আরো সতর্ক বিবেচনায় নিতে পারেন।

তিনি আরো বলেন, গণআন্দোলনের ফলে একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের যে আকাঙ্খা মানুষের মাঝে তৈরী হয়েছিলো, সেটি বাস্তবায়নের ধীরগতি আমাদের মধ্যে একধরণের হতাশা সৃষ্টি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারসহ সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত্য এই হতাশা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হতে পারে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, আমাদের তৎপরতা থেমে নেই এবং যখন যা ঘটছে প্রত্যেকটা ঘটনা উদঘাটিত করে আসামী গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করছি।

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, খুলনা জেলার ৯টি থানার মধ্যে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা এই চার থানাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর থেকে জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও এসআরবির যৌথ বিশেষ অভিযান এবং ‘ব্লক রেইড’ জোরদার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসী অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারি, ওয়ারেন্টের আসামী গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে সেই বিষয়টি ফোকাস রেখে আমরা চেকপোষ্টের মাধ্যমে সন্দেহভাজন মোটরসাইকেলে তল্লাশি পরিচালনা করছি। অনেক মোটরসাইকেল আটক করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে মামলা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!