সুরপ্রেমিক রেজাউল, সংগ্রহ করেছেন বিলুপ্তপ্রায় ৬০০ বাদ্যযন্ত্র
রেজাউল করিম। তার শখ ভিন্ন ঘরানার। তিনি একজন বাদ্যযন্ত্র সংগ্রাহক। জানলে অবাক হবেন, তার সংগ্রহে রয়েছে দুর্লভ সব বাদ্যযন্ত্র। অন্তত ৬০০ বাদ্যযন্ত্র তার সংগ্রহশালায় রয়েছে।
বংশ পরম্পরায় বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায় জড়িত রেজাউল করিমের পরিবার। স্কুল জীবন শেষে বাবাকে সহযোগিতা করতে গিয়ে বাদ্যযন্ত্রের নেশা পেয়ে বসে তার। তার বাদ্যযন্ত্র বিক্রির প্রতিষ্ঠান ‘নবাব এন্ড কোং’ প্রায় ৭৬ বছর ধরে টিকে আছে।
সেই সুবাদে এ প্রতিষ্ঠানের ভাণ্ডারে যোগ হয়েছে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনেক বাদ্যযন্ত্র। চলমান বাদ্যযন্ত্র তো আছেই। কোনোটি প্রায় শতবর্ষের পুরনো। কোনোটি বরেণ্য সংগীতজ্ঞের স্মৃতি ধরে রেখেছে। নিজস্ব সংস্কৃতির ধারকবাহক তো আছেই।
ময়মনসিংহ শহরের বড় বাজারে এই দোকানের অবস্থান। রেজাউল করিম এর স্বত্বাধিকারী। একই জায়গায় আরও বেশ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র বিক্রির দোকান আছে। তবে রেজাউল করিমের দোকানটি এখন আর শুধু দোকান নয়, এটি পরিপূর্ণ একটি ভান্ডারে পরিণত হয়েছে।
তার দোকানের সঙ্গে লাগোয়া একটি ঘরে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র স্তূপ করে রাখা। এগুলো সংগ্রহের জন্য রেজাউল করিম নিজস্ব জায়গায় একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর তৈরির স্বপ্ন দেখছেন। বলা যায়, স্বপ্ন পূরণে একধাপ অগ্রসর হয়েছেন।
একতারা, দোতারা, সারিন্দা, সারেঙ্গী, আনন্দ লহরি সহ মুকুর সবই রয়েছে তার সংগ্রহশালায়। তার চারপাশে অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র। শখের বশেই রেজাউল করিম বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করা শুরু করেন।
রেজাউল করিম জানান, আমার স্কুল জীবন শেষে বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য দোকানে আসতাম। দেখতাম যে দোকানে অনেক বাদ্যযন্ত্র যেগুলো মেরামত করতে দিয়ে গেছে আর নিয়ে যায়নি। এর মধ্যে অনেক বড় বড় ওস্তাদ উনাদের যন্ত্র ঠিক করতে দিয়ে গেছেন, তবে দেশ ভাগের পরে তারা চলে যাওয়াতে যন্ত্রগুলো দোকানে অবহেলায় পড়ে ছিল।
আমি একটি পরিত্যক্ত বেহালা পাই এবং এর ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে দেখি সেটি জার্মানিতে তৈরি হয়। ভায়োলিনটির গঠন-প্রকৃতি আর কাঠামো দেখে জানা যায় এটির বয়স সাড়ে ৪০০ বছর।
অর্থাৎ ১৬০০ শতাব্দির। আমি বাবাকে বলালাম, বাবা এটা ঠিক করে দাও। ঠিক করার পর আমি একদিন বাজিয়ে দেখলাম এটা থেকে চমৎকার সুর বের হচ্ছে। এরপর থেকেই সুর আর বদ্যযন্ত্রের প্রতি আমার একটা আসক্তি হয়।
বিলুপ্তপ্রায় বা প্রচলন কমে গেছে এমন ৬০০ বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করেছেন রেজাউল করিম। তিনি বলেন, আমার বাদ্যযন্ত্রের দুই ধরনের সংগ্রহ, একটা ঐতিহ্যবাহী আরেকটা ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠির।
ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠির বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করতে আমাকে প্রায়ই তাদের কাছে যেতে হয়েছে। আর তখন থেকেই আমি তাদের যন্ত্রগুলো সম্পর্কে ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনেছি।
যারা লোকজ বাদ্যযন্ত্র বাজাত বা লোকজ গানের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের কাছে গিয়ে যন্ত্রটা নিয়ে এসেছি। আর বেশ কিছু রয়েছে, যখন আমি সংগ্রহ শুরু করি, আমার প্রদর্শনী শুরু হয়। তখন অনেকে নিজের আগ্রহে বাদ্যযন্ত্র আমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছে।
বিলুপ্তপ্রায়ের পাশাপাশি বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাদ্যযন্ত্রও সংগ্রহ করেছেন রেজাউল করিম। এ বিষেয়ে তিনি বলেন, আমার যে বাদ্যযন্ত্রগুলো আছে, তার অধিকাংশই তার যন্ত্র।
এর মধ্যে ভাওয়াল জমিদার বাড়ির একটা সরাজ আছে। সেতার আঝে গৌরীপুর জমিদার বাড়ির। যে সেতারগুলো আছে সেগুলোতে এনায়েত হোসেন খাঁর ছোঁয়া রয়েছে। যামিনী পালের ছোঁয়া আছে এমন সেতারগুলো আমার কাছে আছে।
নবাব আলী ছিলেন রেজাউলের দাদা। ১৯৪৪ সালে দাদা ব্যবসা শুরু করেন। সেই সময় শহরে এটি ছিল দ্বিতীয় দোকান। প্রথম দোকান ‘সুরেন অ্যান্ড কোম্পানি’। পরে কোম্পানির মালিক ভারতে চলে যান। যাওয়ার সময় সেতার, এসরাজসহ বিভিন্ন যন্ত্রই দিয়ে যান ‘নবাব এন্ড কোং’কে।
রেজাউলের দাদার পর বাবা জালাল উদ্দিন ব্যবসার হাল ধরেন। ২০০৬ সালে দায়িত্ব নেন রেজাউল। এর আগে থেকেই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ছিল তার। রেজাউলের নিজ সংগ্রহের পাশাপাশি বংশপরম্পরায় দোকানে যোগ হতে থাকে একের পর এক বাদ্যযন্ত্র।
সেতার আছে পাঁচ রকমের। গিটারই আছে ৫০ রকমের। গিটারের পাশে নতুন করে ১০টি দোতারা বানিয়ে রাখা হয়েছে। রেজাউল করিম বাদ্যযন্ত্রের ভান্ডারে ধুলার আস্তরণ থেকে বের করলেন ২৫ বছর আগে সংগ্রহ করা একটি সরোদ। জানালেন, যন্ত্রটির বয়স কম করে হলেও ৬০ বছর হবে।
২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দামের চামড়া ছিঁড়ে যাওয়া একটি এসরাজ দেখিয়ে জানালেন, একজন ওস্তাদ মারা যাওয়ার আগে তাঁকে দিয়ে গেছেন। এসরাজে হাতির দাঁতের সোয়ারি লাগানো। অনেক সময় বাদ্যযন্ত্রের কদর বুঝতে না পেরেও অনেকে তা বিক্রি করে দিয়েছেন, তারও বেশ কয়েকটি নমুনা আছে।
গ্রামের কোনো কারিগরের তৈরী বীণা সরাজ, ৮০ থেকে ৯০ বছরের পুরোনো মিষ্টিকুমড়া দিয়ে বানানো তানপুরাসহ বিভিন্ন জিনিস দেখিয়ে বললেন, সব বাদ্যযন্ত্র সাজিয়ে রাখলে তা দেখতে কম করে হলেও ৪০ মিনিট সময় লাগবে। রেজাউল করিমের দোকানে ১৭ জন কারিগর কাজ করছেন।
রেজাউল করিম জানালেন, ঢেম্পারেঙ, বরতাল, চঙ, দভন্ডি, দোতারা, চিকারা, গিনটোঙ, ঘেরা, যোগী সারঙ্গী, হালগি, মুগরবন, পোহল, থিমিলা, শিঙ্গা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বর্তমানে অনেকটা দুর্লভ বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ততযন্ত্র, আনদ্ধ যন্ত্র, শুষির যন্ত্র এবং ঘন যন্ত্রের চার প্রকারের প্রায় ১০০টি লুপ্ত, বিলুপ্তপ্রায় ও চলমান বাদ্যযন্ত্রের সংগ্রহ নিয়েই তিনি জাদুঘর তৈরির স্বপ্ন দেখছেন।
রেজাউল করিম বাদ্যযন্ত্র নিয়ে কিছুটা গবেষণাও করছেন। হারিয়ে যাচ্ছে যে যন্ত্রগুলো, আধুনিক কারিগরদের দিয়ে ওই যন্ত্রের আদলে নতুন করে আবার বাদ্যযন্ত্র তৈরি করছেন। বেশিরভাগ পুরোনোটার মতোই কাজ দিচ্ছে বলে তার দাবি।
বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি গানের বইসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিসও তার দোকানে রাখা। যার যেটা প্রয়োজন, তা দেখেশুনে নিতে পারছেন। রেজাউল করিম বলেন, বিলুপ্ত ঠিক না বরং এ যন্ত্রগুলো নতুন প্রজন্মের চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তাদের চোখের সামনে তুলে ধরতে পারলে কাজ হয়।
তরুণ প্রজন্ম স্প্যানিশ গিটার কিনতে পারলে একতারা কেন কিনতে পারবে না? এ দোকানের বাইরে রেজাউল করিমের পরিচালনায় শিশুকিশোরদের জন্য নোভিস আর্টিস্টিক এডুকেশন সেন্টারে চারুকলা, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
রেজাউল করিম তার বাদ্যযন্ত্রের সংগ্রহ নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী করেছেন। এখন তার বাদ্যযন্ত্রগুলো দিয়ে একটি জাদুঘর গড়ে তোলার কাজ করছেন রেজাউল করিম।
তার মতে, আমরা যদি এই জিনিসগুলো প্রজন্মের সামনে নিয়ে আসতে পারি আমাদের দুইটি উপকার হয়্ একটি হলো, তারা বাদ্যযন্ত্র, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। আর দ্বিতীয় হলো, তাদের মধ্যেও আগ্রহ জন্মাবে। এইভাবে বাদ্যযন্ত্রগুলো আবার প্রচলন করা যাবে।