ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস আজ

উন্নয়নের উচ্চতা কতটা টেকসই? শহর কতটা বাসযোগ্য?
ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩৪, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস আজ
উনিশ শতকের শেষভাগে আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপারের বিকাশ শুরু হয়। ইস্পাতের কাঠামো, নিরাপদ লিফট, উন্নত কংক্রিট এবং আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তির আবিষ্কার মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

আকাশ পানে ছুঁয়ে থাকা স্থাপনাগুলো কেবল কংক্রিট, ইস্পাত ও কাচের সামুষ্টিক অবয়ব নয়; এগুলো মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক। বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস মূলত মানব মেধা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্থাপত্য এবং প্রকৌশলের সম্মিলিত সাফল্যকে উদযাপনের দিন। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সীমাবদ্ধ নয়; সৃজনশীল চিন্তা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একসময় অসম্ভব মনে হওয়া স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দিতে পারে। 

‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ শব্দটির অর্থ আক্ষরিকভাবে ‘আকাশ ছোঁয়া’। সাধারণত অত্যন্ত উঁচু বহুতল ভবনকে স্কাইস্ক্র্যাপার বলা হয়। বলা হয়, লুইস এইচ. সুল্লিভান নামে এক বিশেষ ব্যক্তি, যিনি সারা বিশ্বে গগনচুম্বী ভবনের জনক হিসেবে পরিচিত তাঁর জন্মদিনে তাঁকে সম্মান জানাতে এই দিনটি গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৮৮০ সালের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এই গগনচুম্বী শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই বহুতল বিশিষ্ট বাড়ি গুলি আজও মানুষের কাছে এক বিস্ময় সৃষ্টি করে। গিনেস বিশ্ব রেকর্ড অনুযায়ী ১৮৮৫ সালে শিকাগোতে এইরকম আকাশচুম্বী ভবন প্রথম তৈরি করা হয়, যার স্থপতিকার ছিলেন মেজর উইলিয়াম লেবারন জেনি।

আজ ৩রা সেপ্টেম্বর, বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার বা গগনচুম্বী অট্টালিকা  দিবস। প্রতি বছর ৩রা সেপ্টেম্বর এই দিবসটি পালিত হয়। আকাশছোঁয়া ভবন শুধু স্থাপত্যের কৃতিত্ব নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার দিবস আমাদের তাই শুধু উঁচু ভবনের দিকে তাকাতে শেখায় না, বরং প্রশ্ন করতে শেখায় উন্নয়নের উচ্চতা কতটা টেকসই? একটি শহর কতটা বাসযোগ্য? প্রযুক্তির অগ্রগতি কি প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগোচ্ছে? কারণ মানুষের তৈরি ভবন যতই আকাশ ছুঁয়ে ফেলুক, তার ভিত্তি থাকতে হবে মাটিতেই। সেই ভিত্তি হলো নিরাপত্তা, পরিবেশ সচেতনতা, মানবিকতা এবং সুশৃঙ্খল নগরপরিকল্পনা।

Advertisement

Photo of স্কাইস্ক্র্যাপার ডে-তে তারা আর আকাশের মাঝে হয়ে যাক রোমাঞ্চকর আলাপচারিতা... 4/8 by Deya Das

স্কাইস্ক্র্যাপারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার উচ্চতা হলেও এর গুরুত্ব কেবল উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি আধুনিক সুউচ্চ ভবনের নকশায় স্থাপত্য, প্রকৌশল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নগরপরিকল্পনার সমন্বয় ঘটে। প্রবল বাতাস, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, মানুষের নিরাপত্তা এবং ভবনের ওজন সবকিছুকে হিসাবের মধ্যে রেখে নকশা করতে হয়, ফলে প্রতিটি স্কাইস্ক্র্যাপার মানুষের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার এক অনন্য প্রদর্শনী।

আজকের পৃথিবীতে গগনচুম্বী অট্টালিকা শুধু স্থাপত্যের সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নগর উন্নয়নের পরিচায়ক। বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফা, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে অবস্থিত, ৮২৮ মিটার উচ্চতা নিয়ে আধুনিক প্রকৌশলের এক অনন্য নিদর্শন। এর পরেই রয়েছে মালয়েশিয়ার মেরদেকা ১১৮, চীনের সাংহাই টাওয়ার, সৌদি আরবের মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ার, এবং চীনের পিং অ্যান ফাইন্যান্স সেন্টার। এসব ভবন শুধু উচ্চতার রেকর্ডই গড়েনি, বরং শক্তি সাশ্রয়, বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, ভূমিকম্প প্রতিরোধ এবং টেকসই নির্মাণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন মানদ- স্থাপন করেছে।

বিশ্বের বড়, বড় শহরের পরিবর্তনের সঙ্গে স্কাইস্ক্র্যাপারের ইতিহাস গভীরভাবে যুক্ত। জমির পরিমাণ সীমিত অথচ জনসংখ্যা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্রমশ বাড়তে থাকায় শহরগুলোকে ওপরের দিকে বিস্তৃত হতে হয়েছে। ফলে একই জমিতে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বসবাস, কাজ ও ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার জন্য সুউচ্চ ভবন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিউইয়র্ক, শিকাগো, দুবাই, সাংহাই, হংকং, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর বহু শহরের নগর-পরিচয়ের সঙ্গে আজ স্কাইস্ক্র্যাপার ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

Photo of স্কাইস্ক্র্যাপার ডে-তে তারা আর আকাশের মাঝে হয়ে যাক রোমাঞ্চকর আলাপচারিতা... 2/8 by Deya Das

উনিশ শতকের শেষভাগে আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপারের বিকাশ শুরু হয়। ইস্পাতের কাঠামো, নিরাপদ লিফট, উন্নত কংক্রিট এবং আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তির আবিষ্কার মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। আগে একটি ভবনের উচ্চতা মূলত তার দেওয়াল ও ভিত্তির শক্তির ওপর নির্ভর করত। কিন্তু ইস্পাতের কাঠামো ব্যবহারের ফলে, ভবনকে অনেক বেশি উঁচু করে নির্মাণ করা সম্ভব হয়।

ঢাকার শীর্ষস্থানীয় বহুতল ভবনগুলোর মধ্যে শান্তা পিনাকলের মূল স্থপতি এহসান খান (ইকে আর্কিটেক্টস) এবং প্রকৌশল সহায়তা দিয়েছে মাইনহার্ট সিঙ্গাপুর। মতিঝিলের সিটি সেন্টারের নকশায় যৌথভাবে স্থপতি টিআইএম নুরুন্নবী চৌধুরী ও বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার (সাইট ফোর্স ও আরবান কন্টেক্সট)। তেজগাঁওয়ের ইনস্টার ট্রেড ইন্টারকন্টিনেন্টাল ভবনের প্রধান স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ (ভলিউমজিরো)। আর গুলশানের হিলটন ঢাকা ভবনের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য নকশায় এইচবি ডিজাইন ও প্রকৌশল সেবা দিয়েছে ইইসি লিনকন স্কট। 

আধুনিক গগনচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণের নেপথ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী ড. ফজলুর রহমান খানের আবিষ্কৃত ‘টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেম’ এক বৈপ্লবিক ভিত্তি তৈরি করে, যা ছাড়া উইলিস টাওয়ার বা বুর্জ খলিফার মতো বহুতল ভবন তৈরি অসম্ভব ছিল। পরবর্তীতে আমেরিকান কাঠামো প্রকৌশলী উইলিয়াম এফ. বেকার এই টিউবুলার পদ্ধতিকে আরও উন্নত করে ‘বাট্রেসড কোর’ সিস্টেম উদ্ভাবন করেন, যার মাধ্যমে বুর্জ খলিফার মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ কাঠামোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

একসময় মানুষ পাহাড়ের চূড়ায় ওঠাকে অসম্ভব মনে করত, অথচ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে আজ মানুষ নিজের তৈরি ভবনকেই আকাশের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। বহুতল ও সুউচ্চ অট্টালিকার এই বিস্ময়কর স্থাপত্য-যাত্রাকে স্মরণ ও উদ্‌যাপনের একটি উপলক্ষ হলো, বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার বা গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!