ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

সাত খুনের ছয় বছর আজ

মামুন মিয়া, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত: ১৪:৪৮, ২৭ এপ্রিল ২০২০
সাত খুনের ছয় বছর আজ
ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের নৃশংসতা শুধু দেশবাসীকেই নয়, পুরো বিশ্ববাসীকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমেও আলোচিত ছিল এ হত্যাকাণ্ড।

খুনের এই ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে তো বটেই দেশের ইতিহাসেও ন্যাক্কারজনক ঘটনার একটিতে পরিণত হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডে নিম্ন আদালতের পর হাইকোর্টেও দ্রুত রায় ঘোষণা করা হয়।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে হাজিরা শেষে প্রাইভেটকারে ফিরছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম।

Advertisement

একইসময়ে আদালতের কার্যক্রম শেষে অপর একটি প্রাইভেটকারে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম। পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোডের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে সাদা পোশাক পরিহিত র‌্যাব সদস্যরা তাদের সাতজনকেই অপহরণ করে।

সাতজনকে অপহরণের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জ। দফায় দফায় চলতে থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড অবরোধ। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীর চর ধলেশ্বরী এলাকা থেকে ছয়জনের ও ১ মে একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

সাতজনকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একই কায়দা অবলম্বন করা হয়। নিহতদের মধ্যে সবাইকে একই স্টাইলে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। যাতে করে মরদেহ ভেসে উঠতে না পারে। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর হাত-পা বাঁধা ছিল, পেট ছিল ফাঁড়া।

১২টি করে ইটভর্তি সিমেন্টের বস্তার দুটি বস্তা বেঁধে দেয়া হয় প্রতিটি মরদেহের সঙ্গে। মরদেহগুলোর মুখ ছিলো ডাবল পলিথিন দিয়ে মোড়ানো।

মামলা চলার সময় প্রধান আসামিকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামিদের চোখ রাঙানি, নরঘাতকদের পক্ষে আদালতপাড়ায় শোডাউনসহ নানা ঘটনায় গেল পৌনে তিন বছর ধরেই আলোচিত ছিল সাত খুনের মামলাটি।

তদন্ত শেষে প্রায় এক বছর পর ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ।

ওই বছরের ১৩ নভেম্বর নূর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। দু’টি মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। আর চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে এখনো ১২ জন পলাতক রয়েছেন।

২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দু’টি মামলায় নূর হোসেনসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। দু’টি মামলাতেই অভিন্ন সাক্ষী হলো ১২৭ জন করে। যার মধ্যে দু’টি মামলার বাদী, দু’জন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীসহ ১০৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়।

এরপর ২৪ অক্টোবর থেকে শুরু হয় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে শোনানো ও তাদের বক্তব্য গ্রহণের কার্যক্রম। ২১ নভেম্বর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। গত ৩০ নভেম্বর শেষ হয় আলোচিত সাত খুন মামলার আইনি কার্যক্রম।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি সকাল ১০টা ৪ মিনিট থেকে ১০টা ৯ মিনিট পর্যন্ত তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন আলোচিত সাত খুন মামলার রায় ঘোষণা করেন।

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নাসিকের বরখাস্তকৃত কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেন ও এম এম রানাসহ ২৬ জনের ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। বাকি ৯ জনের মধ্যে অপহরণ ও মরদেহ গুমের সঙ্গে জড়িত থাকায় এক আসামিকে ১৭ বছর, অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকায় ৬ জনকে ১০ বছর এবং মরদেহ গুমে জড়িত থাকায় ২ জনকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট সাত খুন মামলায় সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‍্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট। বাকি ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জের নিম্ন আদালত যে ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রধান চার আসামিসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাকি ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- প্রধান আসামি নূর হোসেন, র‍্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেন, এমএম রানা, এমদাদুল হক, বেলাল হোসেন, আবু তৈয়্যব, মো. শিহাব উদ্দিন, পুর্নেন্দ বালা, আবদুল আলীম, হীরা মিয়া, আরিফ হোসেন, মহিউদ্দিন মুন্সি (পলাতক), আলামিন শরিফ (পলাতক) ও তাজুল ইসলাম (পলাতক)।

যাবজ্জীবনপ্রাপ্তরা হলেন- আসাদুজ্জামান নূর, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল, নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, জামালউদ্দিন, এনামুল কবীর, সানাউল্লাহ সানা (পলাতক), শাহজাহান (পলাতক)।

বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- রুহুল আমিন (১০ বছর), বজলুর রহমান (৭ বছর), নাসির উদ্দিন (৭ বছর), আবুল কালাম আজাদ (১০ বছর), নুরুজ্জামান (১০ বছর) ও বাবুল হাসান (১০ বছর)।

পলাতক আসামিদের মধ্যে হাবিবুর রহমানের ১৭ বছর, কামাল হোসেনের ১০ বছর ও মোখলেসুর রহমানের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে। হাইকোর্ট তাদের নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখেছেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!