এরমধ্যে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের জন্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম চেয়ে অনলাইনে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে হাসপাতালটির কেনাকাটা ও সরবরাহে দুর্নীতি এবং অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক যুগ ধরে চমেক হাসপাতালে যন্ত্রপাতি, মনিহারি দ্রব্য কেনাকাটা, রোগীর খাবার সরবরাহ এবং চুক্তিভিত্তিক লোক নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করছে কিছু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ড নেই। নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে কে কোন পণ্য বেশি দামে সরবরাহ করবে, তা ভাগাভাগি করে নেয় বলে অভিযোগ।
.png)
গত বছরের ৩০ জুন এই অনুসন্ধান প্রতিবেদন চট্টগ্রামে দুদক পরিচালক বরাবর জমা দেন দুদকের সদ্য চাকরিচ্যুত উপসহকারী পরিচালক মো. শরিফ উদ্দীন। দরপত্রের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো এখন পুনরায় অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেয়েছেন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যক্রম চট্টগ্রাম-২-এর সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম।
এই অবস্থায় চমেক হাসপাতালে সদ্য যোগদানকারী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান প্রথাগত দরপত্র বাদ দিয়ে ই-দরপত্রে ঝুঁকেছেন। গত ২৪ মার্চ এক দরপত্র বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২১টি ভিন্ন ভিন্ন যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম, পণ্য এবং যন্ত্রাংশ মেরামতের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে এলইডি বাতি, আলট্রাসাউন্ড কালার ডপলার সিস্টেম, কম্পিউটার মনিটর, সিসি ক্যামেরাসহ নানা সরঞ্জাম।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ই-দরপত্রে শর্তও শিথিল করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের বাইরের কেউ যেন অংশ নিতে না পারে, সে জন্য আগে দরপত্রে কঠিন শর্ত দেওয়া থাকত। যার জন্য একই প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে ফিরে প্রতি বছর বিভিন্ন পণ্য সরবরাহের দরপত্র নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিত বলে দুদকের অনুসন্ধানেও উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তাদের এই কর্মকাণ্ডের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে মোহাম্মদ ফয়সল ইকবাল চৌধুরীর নাম উল্লেখ করে দুদক। ২০০৮ সাল থেকে তার নেতৃত্বে সিন্ডিকেটটি গড়ে ওঠে বলে দুদক জানায়। তবে ফয়সাল ইকবাল বরাবরই চমেক হাসপাতালে দরপত্র ও পণ্য সরবরাহে তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।
এই চক্রের সঙ্গে হাসপাতালের দরপত্র বিভাগের প্রধান মো. মঈনুদ্দিন ও হিসাবরক্ষক মো. শাহজাহানের আঁতাত ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়। চক্রটি ভাঙতে পরিচালক ই-দরপত্র ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়। এ জন্য হাসপাতালের কয়েকজন কর্মীকে ই-দরপত্র বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিতে ঢাকায় পাঠানো হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান জানান, দরপত্র নিয়ে নানা অনিয়ম ও অভিযোগ থেকে উত্তরণের জন্য ই-দরপত্রের মাধ্যমে হাসপাতালের সব দরপত্র করার চেষ্টা করছেন তিনি। প্রথম একটি দিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়েছে। এতে করে সবার অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন তিনি।
ই-দরপত্রে ৭ এপ্রিল থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিতে পারবে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১০ এপ্রিল। ওই দিনই দরপত্র খোলা হবে। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ই-দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এক ঠিকাদার বলেন, এতদিন দরপত্রে নানা শর্ত জুড়ে দিত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল এক হাজার শয্যার হাসপাতালে পণ্য সরবরাহের অভিজ্ঞতা। এবার তা শিথিল করা হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ।
প্রসঙ্গত, দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান যেখানে ই-দরপত্রের মাধ্যমে কেনাকাটা করছে, সেখানে চমেক হাসপাতাল এখনো কেনাকাটায় সনাতনী পদ্ধতিতে রয়ে গেছে। এতে নামসর্বস্ব ঠিকানাবিহীন ভুয়া প্রতিষ্ঠান কাজ বাগিয়ে নিয়েছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু এমএসআর খাতে ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট সাড়ে ৬৩ কোটি টাকার দরপত্র সিন্ডিকেটভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো করেছে। এছাড়া রোগীদের খাবার সরবরাহে গত তিন বছরে ৩২ কোটি টাকার দরপত্র এবং মনিহারি খাতে ৮ কোটি টাকার দরপত্র পেয়েছে এই চক্র।