উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের খিদিরপুর গ্রামে দেখা যায়, মূল সড়ক থেকে অন্তত দুই কিলোমিটার ভেতরে ভেকু দিয়ে কৃষি জমির মাটি কেটে মাহিন্দ্রা গাড়িতে তোলা হচ্ছে। মাটি কাটায় কৃষি জমি গভীর ও বড় আকারের পুকুরে পরিণত হচ্ছে। সেখানেই মাটিবহনের অপেক্ষায় আছে ৮-১০ টি মাহিন্দ্রা গাড়ি। এ গুলো দুই কিলোমিটারের জায়গা জুড়ে থাকা ফসলি জমির উপর দিয়ে আসা-যাওয়া করছে। এতে ধান রোপণকৃত জমি নষ্ট হচ্ছে।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে লতব্দী ইউনিয়নে মাটিকাটা কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাই, মারামারি, রাহাজানি, মামলা হামলার মতো ঘটনাও ঘটছে। এর ফলে কোনোভাবেই মাটি কাটা বন্ধ হচ্ছে না। এছাড়া উঠতি বয়সের যুবকদেরকে চক্রগুলো টাকা পয়সা দিয়ে মাদকাসক্ত বানিয়ে ফেলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চক্রের নেতাদের কথায় হরহামেশাই হুমকি-ধামকি, মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত হচ্ছেন তারা। এই যুবকদেরকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন বলে জানান অভিভাবকরা।
.png)
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় বেশির ভাগ জমিই তিন ফসলি। এখানে ধান, পাট, আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টা, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হয়। ১০ বছর আগে তিন ফসলি কৃষিজমি ছিল ১৪ হাজার ৪৮০ হেক্টর। বর্তমানে রয়েছে ১৩ হাজার ৮৩০ হেক্টর। এতে ৬৫০ হেক্টর জমির মাটি কেটে বিক্রি করা হয়েছে। এতে দিনদিন জমি কমছে ফললি জমির পরিমাণ।
স্থানীয়রা বলেন, উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নে কৃষিজমির মাটি দিনে-রাতে কাটা হচ্ছে। যেভাবে ভূমি দস্যুরা মাটি দিন-রাত কেটে নিয়ে যাচ্ছে, তাতে কৃষকেরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিছু অর্থের বিনিময়ে নতুবা হুমকি দিয়ে মাটি কেটে নিয়ে ইটভাটায় বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ভূমিদস্যুরা মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার ফলে আশপাশের জমিগুলো দেবে যাচ্ছে। যে পথ দিয়ে মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা ধুলায় আচ্ছাদিত হয়ে থাকছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সী সবাই অসুখের মুখে পড়ছে। অথচ এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন।

এ সময় মাটি কাটা ও আনা নেওয়ার কাজে জড়িত থাকা ব্যক্তিরা বলেন, রামকৃষ্ণদী গ্রামের ইটভটার মালিক ইকবাল হোসেন মাটি কেটে নিচ্ছে। আমরা টাকার বিনিময়ে শ্রমিকের কাজ করছি।
খিদিরপুর গ্রামের কৃষক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, খিদিরপুরের প্রত্যেকটি জমি তিন ফসলি। খনন করে গভীর জলাশয় পরিণত করছে। যেসব জমি থেকে মাটি কাটছে তার পাশের জমি এমনিতেই ভেঙে পড়ছে। তাই অনেকে অসহায় হয়ে জমির মাটি দিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এভাবে আর কতদিন? একটু একটু করে সব কৃষিজমি শেষ হয়ে যাচ্ছে। কেউ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
কৃষক আওয়াল হোসেন বলেন, যেখান থেকে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে তার পূর্ব ও পশ্চিম পাশের ১০৫ শতক ধানের আবাদি জমি রয়েছে। পূর্বপাশে ধানের জমির উপর দিয়ে মাহিদ্রা চলাচলের রাস্তা বানানো হয়েছে। শুনেছি বরকত এখান থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য আমাকে টাকাও দিবে। এ সময় তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, পাশের জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে, আমার জমি এমনিতেই ভেঙ্গে পড়বে। সে সময় তাদের জমি না দেওয়া ছাড়া আমার আর উপায় থাকবে না।
বরকত উল্লার কয়রা খোলা এলাকায় ইটভাটা রয়েছে। ভাটার জন্যই জমির মাটি কাটেন তিনি। তার ভাটাটিও অবৈধ। এজন্য কিছুদিন আগে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ৬ লাখটাকা জরিমানা গুনেন তিনি। ধানি জমির উপর দিয়ে রাস্তা নেওয়া এবং মাটি কাটার বিষয়ে ন্যাশনাল ব্রিকসের মালিক বরকউল্লা বলেন, যেখান দিয়ে রাস্তা বানানো হয়েছে সেখানকার কিছু জমি আমি ক্রয় করে নিয়েছি। পাশাপাশি সরকারি জমি রয়েছে। যেখান থেকে মাটি কাটা হচ্ছে সেটিও সাফ কবলা করে নেয়া হচ্ছে। তবে মাটি কাটার বিষয়টিকে আমি সমর্থন করি না। তিনি আরো বলেন, এভাবে মাটিকাটা ঠিক নয়, তবে দেশের উন্নতির জন্য ইট দরকার, ইট বানাতে মাটি দরকার এজন্য মাটি কাটা হচ্ছে।
মাটি কাটার বিষয়ে ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা যেখান থেকে মাটি নিচ্ছি সেগুলো অনাবাদি জমি। কারো কাছ থেকে জোর করে নয় টাকার বিনিময়ে মাটি নেই। যাদের টাকা দরকার তারা আমাদের কাছে মাটি বিক্রি করে। যে সব জমির উপর দিয়ে মাহিন্দ্রা চলে, তাদের ও ভাড়া দেওয়া হয়।
একইভাবে উপজেলার চণ্ডীবদ্দী এলাকায় জমির মাটি কেটে নিচ্ছে জহিরুল ইসলাম নামে আরো এক ইটভাটার মালিক। জহিরুল ইসলামের কাছে মাটি কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনারা আমার ভাই, আমাদের দিকে আপনারা না তাকালে আমরা কোথায় যাব।
কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, আমাদের ছেলেগুলোকে কোনোভাবে বাসা বাড়িতে রাখা যায় না। তারা (চক্র) টাকা-পয়সার লোভ দেখিয়ে নিয়ে যায়। এতে তাদের (চক্র) কথাই বলে, আমাদের কথা শুনে না। নিষেধ করলে ছেলেরা আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এখন প্রশাসন যদি এই মাটি কাটা বন্ধ না করে, তবে আমাদের ছেলেগুলো মাদকসেবী হয়ে যাবে। এই এলাকায় দিনে দুপুরেই ইয়াবা ট্যাবলেট হাতের নাগালে পাওয়া যায়, পুলিশ প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আমাদের ছেলেগুলোকে আর ভালো রাখা যাবে না।
লতব্দী ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান বলেন, জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছ দুষ্কৃতকারীরা। আমি এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন বরাবর মাটি কাটা বন্ধের দাবিতে একটি লিখিত আবেদন করেছি। এরপর প্রশাসন এসে বালু তোলা বন্ধ করে গেলেও আবার শুরু করেছেন তারা। আমরা প্রশাসনের কাছে মাটি কাটা বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।
লতব্দী ইউপির চেয়ারম্যান হাফেজ ফজলুল হক বলেন, পাঁচ বছর আগেও ইউনিয়নটির সর্বত্র ফসলি জমি ছিল। চোখজুড়ানো ফসল হতো প্রতিটি জমিতে। সবগুলো জমিই তিন ফসলি ছিল। ফসলি জমিগুলো বড় আকারের নদীতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে উপজেলার সব কৃষি জমি বিলীন হয়ে যাবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রোজিনা আক্তার বলেন, ব্যাপকভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষি জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে কৃষিজমির মাটি কেটে পুকুর করায় আবাদি জমি কমতে শুরু করেছে। মাটি কাটা বন্ধ না হলে,খুব শিগগিরই উপজেলার সব কৃষি জমি বিলীন হয়ে যাবে। কৃষি জমি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাসনিম আক্তার বলেন, মাটি কাটার বিষয়ে কোনো কৃষকের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাইনি। এর পরেও কৃষিজমি থেকে মাটি কাটা বন্ধ করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এর আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়েছে। মাটি কাটা বন্ধে তাদের কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শরীফুল আলম তানভীর বলেন, অল্প কয়েকদিন হলো আমি উপজেলায় যোগদান করেছি। এরই মধ্যে সমন্বয় সভা এবং আইনশৃঙ্খলা সভায় মাটি কাটার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। মাটিকাটা বন্ধ করতে ইউনিয়ন পর্যায়ের ইউপি চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে এবং ইউপি সচিবকে কমিটির সদস্য সচিব ও পরিষদের সব ইউপি সদস্যদের সদস্য করে একটি করে প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কোনো এলাকা থেকে মাটি কাটা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে আমাদেরকে অবহিত করবেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব।