ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

‘চোখের সামনেই ছটফট করে মারা যান স্ত্রী, ঘুমাচ্ছিলেন ডাক্তার’

খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২২:৪৬, ১২ এপ্রিল ২০২২
‘চোখের সামনেই ছটফট করে মারা যান স্ত্রী, ঘুমাচ্ছিলেন ডাক্তার’
ফাইল ফটো

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রস্রাব জটিলতা নিয়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বেডে কাতরাচ্ছিলেন স্ত্রী পিয়ারুন্নেছা। তখন হাসপাতালে ডাক্তার ঘুমচ্ছিলেন। আমার ছেলে ডাক্তাকে ডাকতে যান। বারবার রোগীকে দেখতে যেতে বললেও তিনি যাননি। এরপর ঐ রাতেই চোখের সামনে ছটফট করতে করতে আমার স্ত্রী মারা যান।

মঙ্গলবার স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনার এমন বর্ণনা সাংবাদিকদের কাছে বলছিলেন স্বামী মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক।

তিনি বলেন, আমার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরেই নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন। শুক্রবার রাতে বুকে ব্যথা ও পায়খানা-প্রস্রাব জটিলতা নিয়ে খুমেক হাসপাতালে ভর্তি হন। শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার অবস্থা খারাপের দিকে গেলে হাসপাতালে অবস্থানরত আমার ছেলে ডাক্তাকে ডাকতে যান। তবে তিনি আসেননি। সে সময় ঐ ডাক্তার ঘুমাচ্ছিলেন। উল্টো তিনি রোগীকে নিয়ে যেতে বলেন। তখন ছেলে বলে রোগীকে কী করে আনবো। চিকিৎসক তখন কাগজপত্র নিয়ে যেতে বলেন। এরপর কাগজপত্র নিয়ে গেলে ইন্টার্ন ডাক্তার তা দেখে বলেন, সব তো ঠিক আছে। এ সময় বারবার রোগীকে দেখতে যেতে বললেও তিনি যাননি। রাতেই চোখের সামনে ছটফট করতে করতে আমার স্ত্রী মারা যায়।

Advertisement

তিনি আরো বলেন, মায়ের এমন মৃত্যুতে আমার ছেলে মো. মোস্তাকিম গিয়ে চিকিৎসকের কাছে জানতে চায় তারা কেন দেখতে আসলেন না। এ নিয়ে আমার ছেলের সঙ্গে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি হয় ডাক্তারদের। আমি বিষয়টি জানতে পেরে ডাক্তারের হাত-পা ধরে মাফ চেয়েছি। এ সময় একজন ইন্টার্ন ডাক্তার আমার গায়েও আঘাত করেন এবং অপর দুই ছেলে মো. তরিকুল ইসলাম কাবির ও সাদ্দাম হোসেনকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। তাদের সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ থানায় আটকে রাখে। আর আমার স্ত্রীর মরদেহও হাসপাতালে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর শামছুদ্দিন আহমাদ প্রিন্স এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আসলে তাদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করেন ইন্টার্ন ডাক্তাররা।

তবে চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে মৃতের স্বজনরা দৌলতপুর এলাকায় রাস্তা আটকে বিক্ষোভ করেন।

আব্দুর রাজ্জাকের ভাইপো মামুন বলেন, আমার চাচির মরদেহ বেলা ১২টা পর্যন্ত আটকে রাখে হাসপাতালে। ডাক্তাররা আমার চাচাতো ভাই মোস্তাকিমকে মেরে জখম করে ও জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইন্টার্ন ডাক্তার কামরুল হাসান বলেন, মনিশ কান্তি দাস ও প্রীতম কর্মকারের সঙ্গে রোগীর স্বজনের হাতাহাতি হয়েছে। আমি ইন্টার্নি চিকিৎসক পরিষদের পক্ষ থেকে এসে কথা বলেছি। আমরা অনেক আগেই মরদেহ ডিসচার্জ করে দিয়েছি।

এ বিষয়ে খুমেক হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার বলেন, মানুষ মারা গেলে মরদেহ হস্তান্তরের একটি প্রক্রিয়া আছে। সে অনুযায়ী মরদেহ ছাড়তে হয়। মরদেহ আটকে রাখার কিছু নেই। রোগীর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ইন্টার্ন ডাক্তারদের ভুল বোঝাবুঝি হয়। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য পুলিশ তাদের নিয়ে গেছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো জিডি বা মামলা করিনি।

এদিকে মৃতের দুই ছেলে আটক হওয়া মো. তরিকুল ইসলাম কাবির ও সাদ্দাম হোসেনকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয় পুলিশ। 

সোনাডাঙ্গা থানার ওসি মমতাজুল হক বলেন, হাসপাতালে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে দুইজনকে থানায় আনা হয়। তাদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১০ এপ্রিল রাত ১টার দিকে খুমেক হাসপাতালে ভর্তি  হয় দৌলতপুর এলাকার বাসিন্দা পিয়ারুন্নেছা। আগে থেকেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। মধ্য রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তখন রোগীর সঙ্গে থাকা দুই ছেলে বারবার কর্তব্যরত ডাক্তারদের ডাকতে থাকেন। তখন ওই ডাক্তার ঘুমাচ্ছিলেন। ২ ঘণ্টা পার হলেও কর্তব্যরত ডাক্তার রোগীর কাছে আসেননি।

এদিকে, রোগী যন্ত্রণায় ছটফট করে অবশেষে ডাক্তারদের অবহেলায় রাত ২টা ৪৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন। এ নিয়ে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে হাতাহাতি হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইন্টার্ন ডাক্তাররা ঐ রোগীর মরদেহ আটকে রাখে এবং তার দুই সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকেএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!