স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের ব্যানারে মাহবুব ও তার সহযোগী বন্ধুরা গত রমজানের মতো এবারো সাহরি বিতরণের কাজ করে যাচ্ছেন। উচ্চ শিক্ষিত দেওয়ান মাহবুবুল ইসলাম সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দেওয়ান আজিজুল ইসলামের ছেলে।
.png)
দেওয়ান মাহবুব গত বছর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালে একটি মহতী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি শহরের অনেক নৈশ প্রহরি, ছিন্নমূল, দুস্থ মানুষ এবং হাসপাতালে রোগীর অভিভাবকদের সাহরি সরবরাহ করেছিলেন। এ বছরও পবিত্র রমজানে গভীর রাতে সারা শহর যখন ঘুমিয়ে থাকে দেওয়ান মাহবুব তখন তার সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে রান্নায় ব্যস্ত থাকেন। এরপর চলে প্যাকেট তৈরির কাজ।
দেওয়ান মাহবুব জানান, তিনি তার টিমসহ সাহরির শেষ সময়ের বেশ আগেই বের হন। কারণ খাবার প্যাকেট পৌঁছে দিতেও বেশ সময় লাগে। প্রতিদিন তার সহযোগীদের সঙ্গে করে রান্না করেন এবং ৩০০ প্যাকেট তৈরি করেন। তবে চাহিদা আরো বেশি। তবে তাদের সামর্থ অনুযায়ী ৩০০ প্যাকেট তৈরি করতে পারছেন। এরপর ঘুরে ঘুরে সারা শহরে দুস্থ ও রোগীর অভিভাবকদের মধ্যে বিতরণ করেন।
এমন উদ্যোগ নেয়ার কারণ হিসেবে জানান, অনেকেরই পবিত্র রমজানে সাহরি খাবার মতো সামর্থ নেই। এছাড়া এবার রাতে খাবার হোটেল বন্ধ থাকায় পকেটে টাকা থাকলেও রোগীর অভিভাবকরা সাহরি কিনে খেতে পারছেন না। হাসপাতালে নিয়ম অনুযায়ী শুধু রোগীদের খাবার দেওয়া হয়। তাই অনেকেই শুধু সাহরি খাবারের অভাবে রোজা রাখতে পারবেন না কিম্বা না খেয়ে রোজা রাখতে বাধ্য হবেন। এসব চিন্তা থেকেই তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সাহরি সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেয়া বলে তিনি জানান।
দেওয়ান মাহবুব জানান জানান, তাদের হিসেব মতে শহরে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ সাহরির প্যাকেট খাবার দরকার । কিন্তু অর্থাভাবে তারা এত দিতে পারছেন না। অনেক টাকার বাজেট লাগে। কিন্তু তাদের সীমিত সামর্থের অর্ধেক মানুষকে সাহরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তার কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিচ্ছেন তৌহিদরুর রহমান লিমন, রাইসুল ইসলাম লিমন, মাশফিক, জিসান, আরেফিন সুনাম।
তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক দেওয়ান মাহবুব জানান, গত বছর ৫ম রোজা থেকে তারা সাহরি বিতরণ করা শুরু করেছিলেন, আর এবার ১ম রমজান থেকেই শুরু করেছেন এবং তা অব্যাহত আছে।

তিনি জানান, প্রতি রাতে দুটো অটোবাইক ভাড়া করে তার নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবকেরা হাসপাতালসহ শহরের নানাস্থানে অসহায় মানুষদের মাঝে এ খাবার বিতরণ করেন। খাবার গ্রহণকারীদের তালিকায় আছেন অসহায় রোগী ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বজনরা, বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথে থাকা প্রহরী, রিকশাচালক, বিভিন্ন মার্কেটে থাকা নৈশপ্রহরী, রাস্তায় থাকা ভাসমান মানুষজন। সাহরির খাদ্য তালিকায় দেওয়া হচ্ছে সাদা ভাত, মুরগির গোশত, সবজি ও ডাল। আবার কোনোদিন সাদা ভাত, মাছ, সবজি ও ডাল। এছাড়া খিচুড়ি, ডিম ভুনাও দেওয়া হয়।
মধ্যরাতে অপ্রত্যাশিতভাবে খাবার পেয়ে আনন্দিত হচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) মধ্যরাতে দেখা যায় বহু অসহায় ও টাকা থাকতেও হাতের কাছে খাবার না পাওয়া অনেক মানুষকে। তারা সানন্দচিত্তে খাবার নিচ্ছেলেন। অটোবাইকে করে খাবার নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা বেশ কিছু ব্যস্ততম এলাকায় খাবার পরিবেশন করেন। এর মধ্যে রয়েছে পুরাতন বাসষ্ট্যান্ড, ইন্দ্রা মোড়, ট্রাফিক মোড়, হাসপাতাল গেট এবং কেন্দ্রীয় টার্মিনাল এলাকা। অনেকে সংকোচে খাবার চাইতে পারেন না এমন অনেকেও তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের খাবারের গাড়ি থেকে সাহরি নিয়েছেন।
এ বিষয়ে তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক দেওয়ান মাহবুবুল ইসলাম বলেন, অসময়ে এসব অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করতে পেরে তারা আনন্দিত। আরো কিছু মানুষ যদি ফাউন্ডেশনের পাশে এসে দাঁড়াতো তাহলে তারা আরো বেশি মানুষকে তারা খাবার দিতে পারতেন। তারপরও তারা চেষ্টা করছেন পুরো রোজার মাসে এসব অসহায় মানুষদের মুখে একটু ভালো মানের সাহারি খাবার তুলে দিতে।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের কনসাল্ট্যান্ট এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ( বিএমএ) পাবনা জেলা শাখার সেক্রেটারি ডা. আকসাদ আল-মাসুর আনন জানান, হাসপাতাল ঘুরে রোগী বা রোগীর স্বজনদের সাহরি বিতরণ করছেন পাবনারই একদল মহৎপ্রাণ যুবক। করোনা পরিস্থিতিতে বাসায় রান্না করা খাবার বক্সে এনে দেওয়া হচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ।
তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের সাহরি বিতরণ প্রসঙ্গে পাবনার ঐতিহ্যবাহী চাঁপা বিবি ওয়াকফ এস্টেট জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মাওলানা মুফতি সিবগাতুল্লাহ বিন মাকসুদুর রহমান জানান, এটা নিঃসন্দেহে মহতি কাজ। তিনি জানান, এ মহতী কাজের সাথে যারা জড়িত তারা অবশ্যই রোজাদারের মত সওয়াবের অংশীদার হবেন।
পাবনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, পাবনা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, পাবনা শহরের কয়েকজন যুবক এমন মহতী কাজ করছেন জেনে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। দেওয়ান মাহবুব শুধু সাহরির ব্যবস্থাই করেন না, তার জানা মতে করোনায় মারা যাওয়া ব্যাক্তিদের গোসল থেকে শুরু লাশ দাফন পর্যন্ত থাকেন। তিনি মানুষকে কর্মমুখী ও স্বাবলম্বী করে তুলতে সেলাই মেশিন, ছাগল বিতরণ করেন। শহরের নানা স্থানে সুপেয় পানির জন্য বসিয়ে দিয়েছেন টিউবওয়েল। বেশ কিছু মানুষকে টিন প্রদানসহ নানা সহায়তা দিয়েছে।
এছাড়া কোরবানি ঈদে প্রায় ২০০ পরিবারের মাঝে দুই কেজি করে মাংস দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন। তিনি বাবা- মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশন থেকে সপ্তাহের দু’দিন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনসহ ফ্রি ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তার কাজ পাবনা শহরের যুবকদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত।