ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

বাবার দায়িত্বে অসহায় পিংকির বিয়ে দিলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি

আব্দুর রশিদ শাহ্, নীলফামারী
প্রকাশিত: ১৫:৫৭, ৭ মে ২০২২
বাবার দায়িত্বে অসহায় পিংকির বিয়ে দিলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি
বাবার দায়িত্বে অসহায় পিংকির বিয়ে দিলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি-ছবি ডেইলি বাংলাদেশ

আর দশটি জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের মতোই ছিল আয়োজন। বিয়ের অনুষ্ঠানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এসেছিলেন। গত মঙ্গলবার রাতে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত কামারপাড়া গ্রামে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য সস্ত্রীক উপস্থিত থেকে সনাতন ধর্ম রীতিনীতি মেনে বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করে বিয়ে সম্পন্ন করেন শ্রাবণী রানী রায় পিংকির। ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্যের এই মানবতা ও উদারতা দেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পিংকি রায়ের পরিবার ও এলাকাবাসী।

জানা গেছে, শ্রাবণী রানী রায় পিংকির বাবা অতুল চন্দ্র রায়ের জেলার ডিমলার চাপানিহাটে বড় মিষ্টির দোকান ছিল, সে সময় তাদের সংসারে সচ্ছলতা ছিল। হঠাৎ ২০০৩ সালে  পিংকির বাবার মৃত্যুতে সংসারের সচ্ছলতা চলে যায়। পিংকির মা রঞ্জু রানী রায় ছোট্ট তিন মেয়েকে নিয়ে ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। মামাদের (পিংকির মায়ের ভাইদের) বাড়ির এক অংশে ঘর তুলে কোনোমতে সংসার চলতো পিংকিদের।

একসময় আত্মীয় স্বজনের সহায়তায় পিংকির বড় বোন শিল্পী রানী রায়ের বিয়ে হয়। ছোট বোন প্রীতি রানী রায় স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। আর পিংকি রংপুরের কারমাইকেল কলেজে ইংরেজিতে অনার্সে ভর্তি হয়ে টিউশনি করে পড়াশোনা চালাতো। মহামারি করোনায় তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে পিংকিকে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্যের কাছে পাঠায় শিক্ষানবিশ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী দিলীপ কুমার রায়।

Advertisement

সেই পিংকি ডিআইজির কাছে স্নেহের প্রশ্রয় পেয়ে বাবা ডাকার সম্মতি পায়। গত মঙ্গলবার রাতে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য সস্ত্রীক উপস্থিত থেকে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করে কিশোরগঞ্জ উপজেলার বড়ভিটা মেলাবড় টোটুয়ারডাঙ্গা এলাকার বিনোদ চন্দ্র রায়ের ছেলে প্রদীপ কুমার রায়ের সঙ্গে পিংকির বিয়ে সম্পন্ন করেন। 

ছবি ডেইলি বাংলাদেশ

রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করে পিংকির বিয়েতে বাবার দ্বায়িত্ব পালন করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। সেই পোস্টে তিনি লিখেন সেই পিংকি আমার কাছে স্নেহের প্রশ্রয় পেয়ে বলে, অনেক আগে আমার বাবাকে হারিয়েছি। আপনাকে 'বাবা' বলে ডাকি?' আমার সম্মতিতে আমাকে সে 'বাবা' বলে ডাকে। গতকাল (মঙ্গলবার) অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে মেয়েটির বিয়ে হলো। ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছে। বিয়েতে সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলাম। দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষের ম্লানমুখ আমাকে ব্যথিত করে। পিংকি এবং তার বরের জন্য অনন্ত শুভকামনা।

কনে শ্রাবণী রানী রায় পিংকিং ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমার যখন ৬ বছর বয়স তখন বাবা মারা যায়। মামাদের সাহায্য সহযোগিতায় কষ্ট করে মা আমাদের বড় করেছেন লেখাপড়া করিয়েছেন। করোনাকালীন সময়ে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর দিলীপ আঙ্কেল ডিআইজি স্যারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমার বাবা না থাকায় আমি ডিআইজি স্যারকে বাবা ডাকার আবদার করলে তিনি সম্মতি প্রদান করেন। এর মাঝে আমার বিয়ে ঠিক হয়। আমার বিয়েতেও উনি অনেক খরচ বহন করেছেন। আমি কল্পনাও করিনি উনি আমার বিয়েতে এসে আমার বাবার দায়িত্ব পালন করবেন। জীবনের সব থেকে বড় পাওয়া এটাই। হয়তো বা এ রকম বড় প্রাপ্তি কখনো হবে না। আমি বলার মতো ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমার পরিবারের সবাই অনেক খুশি। সবার দোয়া ও আর্শীবাদ কামনা করছি।

বর প্রদীপ কুমার রায় ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমার জীবন আজ ধন্য। এটা কখনো ভাবিনি শ্বশুর হিসেবে ডিআইজি স্যারকে পাবো। এটা আমার জীবনের বড় পাওয়া। বিয়ের আগে আমার পরিবারের সবাই বলেছিল যে শ্বশুর নেই বিয়ে করে কি পাবি। এখন আমার পরিবার আত্নীয় স্বজন সবাই খুশি। কারো কোনো আপত্তি নেই শ্রাবণীর পরিবারকে নিয়ে।

এই বিয়ের অন্যতম আয়োজক রঘুনাথ সিংহ রায় ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন,  আমি রাজ পরিবারের বিয়ে দেখিনি কিন্তু একটা জীর্ণ বাড়িতে রাজকীয় বিয়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলাম। সেদিন থেকে অনেক কথাই ভাবছি, কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব তা নির্ণয় করা আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এতটুকু বলবো পিংকির তার পূর্ব জন্মের অনেক অনেক সুকর্ম ছিল। আর আমার জীবনের একটা বড় প্রাপ্তি হলো মনুষ্যরূপে দেবতার দর্শন পাওয়া। পিংকির বাড়ি থেকে ফিরতে ফিরতে রাস্তায় ভোর হয়েছে, জীবনে এই প্রথম এত সুন্দর সুর্যোদয় দেখেছি, এত আত্মতৃপ্তি আর আনন্দ যা বর্ণনাতীত। 

বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন নীলফামারী পুলিশ সুপার মোখলেছুর রহমান, তার স্ত্রী, সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ থানার এএসপি (সার্কেল) সারোয়ার আলম, কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি ) রাজীব কুমার রায়।  আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী দিলীপ কুমার রায় ও রঘুনাথ সিংহ রায় প্রমুখ।

জেলা পুলিশের এসপি মোখলেছুর রহমান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আসলে মানুষ মানুষের জন্যই। অসহায়দের প্রতি বিত্তবানদের সহযোগিতার হাত খোলা থাকলে কোনো কাজই পিছিয়ে থাকবে না। চাইলেই একজন আর একজনের উপকারে পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। ডিআইজি স্যার যে দায়িত্ব নিয়ে প্রদীপ কুমার রায় ও পিংকি দম্পতির বিয়ে দিলেন, এটা আসলে স্যারের মহানুভবতা। আসলে এটা অত্যন্ত আনন্দের যে দায়িত্ব নিয়ে একটা মেয়ের জাঁকজমকভাবে বিয়ে দেওয়া। আমি চাইবো যাতে সবলরা দুর্বলদের সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। আপনার একটু সহানুভূতিই পারে অপর একজনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ফিরিয়ে দিতে। তবে আমাদের ডিআইজি স্যার যা করছেন  তা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
ট্যাগ: নীলফামারী
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!