মর্যাদার লড়াইয়ে ভয়ংকর সাপ
বীণ কিংবা বাঁশির সুরে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সাপ। নাম তার গোখরা। সামনে শত শত মানুষ থাকলেও ফণা তোলা বিষধর সাপটির নেই কোনো অস্থিরতা। উল্টো মনিবের ইশারায় নিজের মর্যাদার লড়াইয়ে চালিয়ে যাচ্ছে আপ্রাণ চেষ্টা।
আর এ লড়াইয়ে অন্যদের মাঝে নিজেকে সেরা জানান দিতে আকর্ষণীয় কসরত প্রদর্শন করেন সাপুড়ে। ঢাক-ঢোলের বাজনার তালে তালে নেচে গেয়ে দর্শকদের মন ভরিয়ে তোলেন তিনি। এমনই দুর্লভ দৃশ্যের দেখা মেলে ঐহিত্যবাহী ঝাপান খেলায়। বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী আয়োজিত ঝাপান খেলা দেখতে ভিড় জমান হাজারো মানুষ।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাগান্না ইউনিয়নের বৈডাঙ্গা সাহেবনগর গ্রামে এ কেলার আয়োজন করা হয়। মনসা পূজাকে ঘিরে প্রতি বছর এ আয়োজন করে আদিবাসী সম্প্রদায়।

শত শত মানুষ আর মাঝে কাঠের মাচায় রাখা বিষধর সাপ। সাপুড়েরা বাদ্যের তালে তালে গান গাইছেন, আর সাপগুলোও সাপুড়ের দিকে তাকিয়ে ছোবল মারতে চাইছে। এভাবেই চলে সাপ-সাপুড়ের প্রেমের মিতালী। এক সাপুড়ের গান শেষ হলে তিনি বসে যান নিজের সাপগুলোকে নিয়ে। এরপর আসেন নতুন সাপুড়ে। তিনিও তার সাপগুলোকে প্রদর্শন করেন। এভাবেই দিনভর চলে সাপের খেলা।
এ খেলায় অংশ নিয়েছে তিনটি দল। এ বছরের ঝাপান খেলায় প্রথম হয়েছেন আবু বক্কর সাপুড়ে, তাকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
সাপের খেলা দেখতে আসা মিনতী রাণী বলেন, পাশের চুয়াডাঙ্গা জেলা থেকে এ পূজা ও সাপের খেলা দেখতে বাবার বাড়িতে এসেছি। মনসা পূজাকে ঘিরে আমাদের সঙ্গে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

ঝাপান খেলা দেখতে আসা জুয়েল নামে এক দর্শনার্থী বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেলা আর কোথাও দেখা যায় না। এবারই প্রথম ঝাপান খেলা দেখতে এসেছি।
সাপুড়ে গোলাপ হোসেন জানান, শৈশব থেকেই তিনি পেশায় একজন সাপুড়ে। গ্রামের লোকের বাড়ি এবং মাঠ থেকে বিষধর সাপ ধরেন তিনি। সেগুলোকে পেলে পুষে বিক্রয় করেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খেলা দেখান। এ সাপের খেলা (ঝাপান) দেখিয়ে সংসার না চললেও এ পেশাকেই জীবনধারণের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
সাপুড়ে আবু বক্কর জানান, ১৬ বছর বয়স থেকেই তিনি সাপুড়ে। এখন আর সাপ ধরেন না। গোমা, আড়ল বেকা, গোখরা ও কেউটেসহ বিভিন্ন বিষধর সাপের খেলা দেখান তিনি। মানুষকে আনন্দ দেয়াই মূল উদ্দেশ্য বলে জানান এ সাপুড়ে।
পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি প্রেম বিশ্বাস বলেন, আমরা আদিবাসী সম্প্রদায়। বিল-বাউড়ের মাছের ওপরেই আমাদের নির্ভরতা। বাপ-দাদা পূর্বপুরুষদের আমল থেকে মনসা পূজাকে ঘিরে সাপের খেলা বা ঝাপান খেলা দেখে আসছি। তাদের দেখাদেখি আমরাও আয়োজন করে আসছি। দরিদ্র হিসেবে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে তাতেই ছোট পরিসরে আমরা এ আয়োজন করি।