ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

সবজি চাষে স্বাবলম্বী শতাধিক কৃষক

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশিত: ১২:৪৭, ২১ নভেম্বর ২০২২
সবজি চাষে স্বাবলম্বী শতাধিক কৃষক
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউপির একটি গ্রাম কৃষ্ণনগর। এই গ্রামে শতাধিক পরিবার বসবাস করছেন। তবে ওই শতাধিক পরিবারই হলেন কৃষক। 

২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে নিজস্ব পতিত জমিতে দেশীয় পদ্ধতিতে মৌসুমী টমেটো, শিম, বরবটি, করলা,  ফুল কপি, বাঁধাকপি,মুলা, লাউ,পুইশাখ, লালশাখ, ঢেঁড়স, ঝিঙ্গা, বেগুনসহ নানা প্রকার সবজি চাষ করছেন। সবজি চাষে বদলে দিয়েছেন গ্রামের চেহারা। মৌসুম অনুযায়ী বছর জুড়ে সবজি আবাদ করে সবাই স্বাবলম্বী হয়েছেন। এই গ্রামে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আবাদের পরিমাণও। 

এক সময় এই গ্রামের লোকজনরা ধান আবাদের ওপর নির্ভর ছিলেন। ঝড় বৃষ্টি বন্যাসহ নানা প্রতিকুলতায় প্রতি বছর ধান চাষে লোকসান হওয়ায় এ চাষ ছেড়ে সবাই শাকসবজিতে মনোযোগী হন কৃষকরা। শাকসবজি চাষে কম শ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করে এখন অনেকেই লাখপতি হয়েছেন। তাছাড়া অনেকে নিজেদের অভাব অনটন ঘুছিয়েছেন। বর্তমানে এখানকার সবজি এ উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। সবজি বিক্রিতে ভালো দাম পাওয়ায় খুশি কৃষকরা। 

Advertisement

কৃষ্ণনগর গ্রামে সবজি চাষ করে না এমন পরিবার খোঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। এরই মধ্যে কৃষ্ণনগর গ্রামটি সবজির গ্রাম নামে জেলার মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। 

পুষ্টিমানের দিক থেকে সবজি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল। খাবারকে পরিপাকের মাধ্যমে শরীরের গ্রহণ উপযোগী করে তোলার জন্য সবজির বিকল্প নেই। সবজি যে কেবল খাবার পরিপাক করতেই সাহায্য করে তা কিন্তু নয়। আমাদের শরীরের জন্য দরকারি অনেক পুষ্টি উপাদানও যোগান দিয়ে থাকে। রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শরীরকে খাদ্যের শর্করা আমিষ ও চর্বির ব্যবহারে সাহায্য করে। 

এক সময় ক্ষুদ্র পরিসরে করা হলেও এখন বছর জুড়ে চাষ করে পারিবারিক পুষ্টিচাহিদা মিটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় করছেন এখানকার কৃষকরা। 

আখাউড়া পৌর শহর বড়বাজার থেকে প্রায় ৩  কিলোমিটার দূরে তিতাস নদীর পারে অবস্থিত কৃষ্ণনগর গ্রামটি। এ গ্রামটি ছোট হলেও বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে করছে সবজি চাষ। 

এখন শীতের সবজি ভরা মৌসুম হওয়ায় মাঠ জুড়ে শুধু সবজি আর সবজি নজরে পড়ে। এ গ্রামের কৃষকরা সবজি চাষে যেন এক নিরব বিল্পব ঘটিয়েছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই কৃষকরা সবজি পরিচর্যাসহ বাজার জাত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও বসে নেই। তারাও সবজির পরিচর্যাসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করছেন। এসব সবজি ক্ষেত গোটা গ্রামটিকে সাজিয়েছে যেন সবুজ আর সবুজ করে। তাছাড়া গ্রামের হতদরিদ্র অনেক লোকজন সবজি ক্ষেতে কাজ করে তাদের বেকারত্ব গুছিয়েছেন। 

সবজি চাষি মো. ইয়াছিন মিয়া জানান, এ মৌসুমে ৫০ শতক জায়গায় দেশীয় পদ্ধতিতে তিনি শীত কালীন ফুলকপি, মুলা, লাল শাক পুঁইশাকসহ নানা জাতের সবজির আবাদ করেন। এরমধ্যে ফুল কপির চারা লাগানো হয়েছে প্রায় ৬ হাজার। সবজি গাছের অবস্থা এখন পর্যন্ত খুব ভালো রয়েছে। প্রতিটি গাছে ১টি করে ফুলকপি ফলন হয়। অন্যদিকে মুলা, লাল শাক পুঁইশাক স্থানীয় বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে খরচ বাদে আশা করছি দেড় লাখ টাকার ওপর আয় হবে। 

তিনি আরো বলেন, ওই জমিতে যদি ধান আবাদ করা হতো তাহলে ১৫ হাজার টাকার বেশি ধান পাওয়া যেতো না। তাই ধান ছেড়ে সবজি আবাদ করছি।  

সবজি চাষি মান্নান মিয়া জানান, সারা বছরই তিনি মৌসুম অনুযায়ী সবজি চাষ করছেন। এবার তিনি ৬০ শতক জায়গায় শীতকালীন ফুলকপি, মুলা, লালশাক পুইশাক বেগুনসহ নানা জাতের সবজির আবাদ করেন। এরই মধ্যে মুলা, লালশাক বিক্রি শুরু করেছেন। আগামী ১০ দিনের মধ্যে ফুলকপি বিক্রি হবে। আগাম সবজি চাষ করায় অন্য বছরের তুলনায় এবার বিক্রিতে  ভালো দাম পাচ্ছেন। তিনি আশা করছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে শাকসবজি চাষ করে এ বছর যাবতীয় খরচ বাদে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করতে পারবেন। 

কৃষক ইউসুফ মিয়া বলেন, একই জমিতে দেশীয় পদ্ধতিতে বছর জুড়ে মৌসুম অনুযায়ী শিম, বরবটি,করলা, ফুল কপি, বাঁধাকপি, মুলা, পুইশাক, লালশাক, বেগুনসহ নানা প্রকার সবজি চাষ করছেন। বর্ষাকালে দুই থেকে তিন মাস পানি থাকায় ওই সময় কিছু করা যায় না। বাকী সময় নানা জাতে সবজি চাষ করছেন। তবে চাষকৃত ওইসব সবজি তারা নিজেরাই বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন। বছরে সবজি থেকে তার দুই লাখ টাকা আয় হয় বলে জানায়। 

কৃষক নুর মিয়া বলেন এখানকার মাটি সবজি চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় ২০ বছর ধরে সবজি চাষ করছেন। এখানে সেচ সুবিধা ভালো। পানির কোনো অভাব নেই। এবছর  বীজতলাসহ প্রায় দুই বিঘা জমিতে শীতকালীন বাঁধাকপি মুলা, লাল শাকসহ নানান সবজি আবাদ করেন। সবজি চাষে ধানের চেয়ে খরচ কম লাভ বেশি হয়। এ পযর্ন্ত মুলা আর লাল শাক, ২০ হাজার টাকা বিক্রি করা হয়েছে। ফুলকপি ১০-১২ দিনের মধ্যে বিক্রি শুরু হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে যাবতীয় খরচ বাদে এ মৌসুমে আশা করছি দুই লাখ টাকা আয় হবে।
 
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম বলেন, কৃষ্ণনগর গ্রাম সবজি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। দীর্ঘ বছর ধরে স্থানীয় কৃষকরা নানা জাতের শাকসবজি চাষ করছেন। এ গ্রামের কৃষকরা নিজ উদ্যোগে দেশীয় পদ্ধতিতে সবজি আবাদে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। 

তিনি আরো বলেন উপজেলা কৃষি অধিদফতরের মাধ্যমে কৃষকদেরকে প্রশিক্ষণ, সার, বীজ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অচিরেই আরো নতুন করে কৃষকরা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ সুবিধার আওতায় আসবে। আবহাওয়া অনুকূল এবং বাজার দর ভালো থাকলে শীতকালীন সবজি আবাদে লাভবান হবেন কৃষকরা। তবে ফলন ভাল করতে সব সময় কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!