মৎস্য বিভাগ ও জেলেদের সূত্রে জানা গেছে, এক মৌসুমে তালতলী উপজেলার আশারচর, সোনাকাটা,মরানিদ্রা, ছোট আমখোলা, বড় আমখোলা ও নিশানবাড়িয়া খেয়াাঘাটের চরে ৩-৪ হাজার মণ শুঁটকি উৎপাদন হয়ে থাকে। এই শুঁটকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তালতলীর শুঁটকি সম্পূর্ন বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত। তালতলীর শুঁটকি খেতে সুস্বাদু ও মজাদার হওয়ায় দেশে এবং দেশের বাইরেও এই শুঁটকির চাহিদা রয়েছে প্রচুর।

.png)
উপকূলীয় বরগুনার তালতলী উপজেলার আশারচর, সোনাকাটা, মরানিদ্রা, ছোট আমখোলা, বড় আমখোলা ও নিশানবাড়িয়া খেয়াাঘাটের চরে এখন শুঁটকি তৈরির ভরা মৌসুম। শুঁটকি পল্লীতে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাস ধরে চলে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩-৪ হাজার শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে কমপক্ষে ৩-৪ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। এই সময়গুলোতে সরব থাকে শুঁটকি পল্লীর ক্রেতা, বিক্রেতা ও শ্রমিকরা। প্রতিটি শুঁটকি পল্লী থেকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দেড়শ’ মণ শুঁটকি বিক্রি হয়।
বঙ্গোপসাগর থেকে কাঁচা মাছ শুঁটকি পল্লীতে নিয়ে আসার পর নারী-পুরুষ শ্রমিকরা সেগুলো পরিষ্কার করেন। এরপর মাছগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে মাচায় এবং মাটিতে বিছানো পাটিতে বিছিয়ে শুকানো হয়। ছয়-সাত দিনের রোদে মাছগুলো শুকিয়ে শক্ত হয়। প্রস্তত থাকে ক্রেতা, পাইকার ও ব্যবসায়ীরা। এই চরের শুঁটকি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, খুলনা ও জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান হয়।
বর্তমানে প্রতি কেজি ছুরি মাছের শুঁটকি ৭০০-৮০০ টাকা, রূপচাদা ১ হাজার থেকে দেড় হাজার, মাইট্যা ৮০০ থেকে এক হাজার, লইট্যা ৬০০ থেকে ৭০০, চিংড়ি ৭০০ থেকে ৯০০ এবং অন্যান্য ছোট মাছের শুঁটকি ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আশারচর শুঁটকি পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, শত শত শ্রমিক কাজ করছেন। সাগর থেকে একের পর এক ট্রলার এসে কিনারে ভিরছেন। ট্রলার নোঙ্গর করা মাত্র শ্রমিকরা ট্রলারের খোল থেকে মাছ তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠে পরছেন ট্রলারে। মাথায় মাছের ঝাকা নিয়ে ছুটছেন চরে। মাটিতে মাছ ফেলা মাত্র কেউবা মাছ ধুয়ে পরিষ্কার করছেন। কেউবা আবার বড় মাছ ফালি করছেন। কেউবা আবার পরিষ্কার করা মাছ মাচা কিংবা পাটিতে বিছিয়ে শুকানোর কাজ করছেন। এভাবেই ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। এখন যেন তাদের দম ফালানোর সময় নেই।
জেলে ইলিয়াস জানান, তালতলীর শুঁটকি পল্লীতে ২৫ প্রজাতির মাছের শুঁটকি তৈরি করা হয়। শুঁটকির মধ্যে রয়েছে রূপচাঁদা, ছুরি, কোরাল, সুরমা, লইট্টা, বেরাগী, ফাইসা, তপসী, বাইন ও ছোট পোয়া অন্যতম। এছাড়াও চিংড়ি, ভোল, মেদসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছেরও রয়েছে অনেক চাহিদা। এখান থেকে ছোট চিংড়ি মাছের শুঁটকি পোল্ট্রি ও ফিস ফিড তৈরির জন্য দেশের নামী-দামী কোম্পানিগুলোতে সরবরাহ হয়ে থাকে।
আরেক জেলে জাকির হোসেন জানান, তালতলীর আশার চর, সোনাকাটা, মরানিদ্রা, ছোটআমখোলা, বড় আমখোলা ও নিশান বাড়িয়ার চরে সম্পূর্ন বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন করে থাকি আমরা। মানুষের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে নিজেরাই আমরা সিদান্ত নিয়েছি শুঁটকিতে বিষ মিশাবো না। রোদে শুকিয়ে প্রাকৃতিক ভাবে শুঁটকি তৈরি করি আমরা। তাই আমাদের শুঁটকি দেশ এবং দেশের বাইরে অনেক চাহিদা রয়েছে।
ছোট আমখোলা গ্রামের শ্রমিক আবু তালেব বলেন, এই হানে মাছ হুগাইতে কোনো ওষুধ দেই না মোরা। ওষুধ দেওয়া মানুষের স্বাস্থ্যের লইগ্যা খুব খারাব।
শুঁটকি ব্যবসায়ী মো. রুপচাঁন হাওলাদার বলেন, তালতলীতে উৎপাদিত শুঁটকি বিষমুক্ত হওয়ায় চাহিদা খুব বেশী। এখানকার শুঁটকি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, খুলনা ও জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমরা চালান করি। তবে বিদেশেও তালতলীর শুঁটকির অনেক চাহিদা রয়েছে। এখানকার অনেক শুঁটকি স্থানীয় মানুষজনের মাধ্যমে ভারতে যাচ্ছে। সেখানে এর চাহিদা প্রচুর।

তালতলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম বলেন, তালতলী উপজেলায় উৎপাদিত শুঁটকি বিষমুক্ত এবং স্বাস্থ্য সম্মত। দেশ এবং দেশের বাইরে তালতলীর বিষমুক্ত শুঁটকির চাহিদা রয়েছে প্রচুর। বিদেশে শুঁটকি রফতানির ব্যবস্থা করা গেলে জেলেরা অনেক লাভবান হবে। তালতলীর শুঁটকি রফতানির জন্য মৎস্য অধিদফতরে সুপারিশ পাঠানো হবে।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, বরগুনার তালতলীর আশারচর, সোনাকাটা, মরা নিনদ্রা, ছোট আমভোলা, বড় আমখোলা ও নিশান বাড়িয়ার চরসহ ৫টি চরে উৎপাদিৎ শুঁটকি স্বাস্থ্য সম্মত এবং বিষমুক্ত। তাই দেশ এবং দেশের বাইরেও রয়েছে এর প্রচুর চাহিদা। বিষেশ করে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও দুবাইতে শুঁটকির চাহিদা অনেক বেশী। এসব দেশে তালতলীতে উৎপাদিত শুঁটকি রফতানি করা গেলে জেলেরা অনেক লাভবান হবে। আমরা এ বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব।