ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

৭ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় নালিতাবাড়ী

এম. সুরুজ্জামান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর) 
প্রকাশিত: ১৯:৫২, ৭ ডিসেম্বর ২০২২
৭ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় নালিতাবাড়ী
নালিতাবাড়ীর ঐতিহাসিক সোহাগপুর গণহত্যার স্মৃতিসৌধ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আজ ৭ ডিসেম্বর শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা পাক হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জীবনকে বাজী রেখে পাকহানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে নালিতাবাড়ীকে দখল মুক্ত করেন। 

সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি জনপদ নালিতাবাড়ীতে দুইদিন দুইরাত সরাসরি যুদ্ধের পর মুক্তির এই দিনটি এলাকার মানুষের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে আজও। এদিন পাকহানাদার বাহিনী বর্তমান উপজেলা পরিষদ, রামচন্দ্রকুড়া ফরেস্ট অফিস, হাতিপাগার বিডিআর ক্যাম্প, তিনআনী ও আহাম্মদ নগরে শক্তিশালী ক্যাম্প স্থাপন করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। 

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দীর্ঘ ৯ মাসে উপজেলার বিভিন্নস্থানে হানাদার বাহিনী নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় এতে নারী পুরুষসহ অসংখ্য মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ হারান। নাকুগাঁও স্থলবন্দর এলাকার নাকুগাঁও-ঢালু সীমান্তে ২৫ মে ভোরে পাকিস্থানী হায়েনার দল অতর্কিত হামলা চালিয়ে ৯ জন ভারতীয় বিএসএফসহ কয়েকশ বাংলাদেশিকে হত্যা করে ভোগাই নদীতে ভাসিয়ে দেয়। ৩০ জুন তন্তর গ্রামের ৭ জনকে হত্যা করে। 

একই দিন মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার অপরাধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ওই এলাকার অর্ধশতাধিক মানষকেও নির্মমভাবে হত্যা করে পাকহানাদার বাহিনী। নন্নী বারমারী সড়কে ১ জন ক্যাপটেনসহ ৬ জন সৈন্য জিপ দিয়ে যাওয়ার সময় মাইন বিস্ফোরণ ঘটলে পাকবাহিনী আতংকিত হয়ে পড়ে। শেষে কৌশল পরিবর্তন করে নালিতাবাড়ী থানা সদরে রাজাকার আল বদরদের সহায়তায় শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে। 

২৫ জুলাই উপজেলার কাকরকান্দি ইউপির সোহাগপুর গ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ১৮৭ জন পুরুষ ও অসংখ্য নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। এরপর থেকে ওই গ্রামের নাম হয় ‘বিধবাপল্লী বা বিধবা পাড়া’। ১ ডিসেম্বর এই ঘাঁটি থেকে শত্রুমুক্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা অভিযান চালালেও সফল হতে পারেনি। সেদিন হাছেন আলী মুন্সি ও আয়াত আলী নামে দুজন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত বরণ করেন। 

রাজাকার আলবদররা এই দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ নিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠে। তাদের পায়ে রশি বেঁধে টেনে হিচরে শহরের অদুরে মাটি চাপা দেয়। ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে পুণরায় ক্যাম্প দখলের লড়াই শুরু হয়। এ লড়াইয়ে মিত্রবাহিনীর একটি ও মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি দল অংশ গ্রহণ করে। টানা দুইদিন দুইরাত গুলিবর্ষণের পর ৬ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর জঙ্গী বিমান দিয়ে বোম্বিং করার পরিকল্পনা করে। এতে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা চিন্তা করে সে পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়। এদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা আক্রমণ শিথিল করে দেয়। এসময় ক্যাম্পের আলবদর, রাজাকাররা পালিয়ে যায়। সারারাত কোন সাড়া শব্দ নেই। আতংকগ্রস্ত এলাকাবাসী অপেক্ষা করতে থাকেন কখন ভোর হবে। 

অবশেষে ৭ ডিসেম্বর পূর্বদিগন্তে সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়লে বীর মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয়বাংলা-জয়বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত করতে করতে এলাকায় ঢুকতে থাকে। ক্রমেই স্লোগানের আওয়াজ স্পষ্ট হয়। কেটে যায় শংকা। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে মুক্তির উল্লাসে মেতে উঠে সর্বস্তরের মানুষ। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীরা এগিয়ে যায় সামনের দিকে। পিছু হটে হানাদার বাহিনী। শত্রুমুক্ত হয় নালিতাবাড়ী। পতপত করে উড়তে থাকে লাল সবুজের পতাকা। স্বাধীনতা লাভ করে সোনার বাংলা।   

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!