সরেজমিন দেখা যায়, মহানগরীর অধিকাংশ সড়কে নির্মাণ কাজ চলছে। এতে সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তার ওপর অতিরিক্ত ইজিবাইক সেই সড়ক দখল করে রাখছে। এতে ঈদ ঘিরে কেনাকাটা করতে আসা যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব আর শব্দ দূষণরোধের লক্ষ্যে ২০১০ সালের শেষদিকে খুলনা মহানগরীতে নগরবাসীর চলাচলের সুবিধার্থে যাত্রা শুরু করে ইজিবাইক নামক বাহনটি। পরিবেশবান্ধব ও শব্দহীনতার কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে অল্প খরচে পৌঁছানোর জন্য বাহনটি খুলনার সর্বস্তরের মানুষের মন জয় করে। ফলে নগরীতে ক্রমেই বাড়তে থাকে এসব ইজিবাইকের সংখ্যা।
.png)
ইজিবাইকের মালিকেরা খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) নির্দেশিত নিয়মানুসারে নির্ধারিত ফি জমাদানের মাধ্যমে নিবন্ধন বা লাইসেন্স গ্রহণ করেন। কিন্তু সেই পরিবেশবান্ধব মন জয় করা বাহনটির অপরিমিত বৃদ্ধির কারণে আজ নগরবাসীর চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা, যানজট সৃষ্টিসহ চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সম্প্রতি সমৃদ্ধশালী শহরটি ক্রমেই বেমানান আর চলাচলের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এর অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইক।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) তথ্যমতে, খুলনায় প্রায় ১০ হাজার ইজিবাইকের লাইসেন্স রয়েছে। তবে কেসিসি নথিভুক্ত লাইসেন্স ছাড়াও শহরের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার ইজিবাইক অবাধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সচেতন নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ জানালেও তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না।
তারা অভিযোগ করছেন, কেসিসি ও পুলিশের নির্লিপ্ততা, রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব এবং কার্যকর তদারকির অভাবে শহরে অবৈধ ইজিবাইকের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। এতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
অফিসগামী পথচারী ও যাত্রীদের অভিযোগ, যত্রতত্র পার্কিং, চালকদের যাত্রী নেয়ার প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাব, অতিরিক্ত লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইকের চলাচলসহ বেশকিছু কারণে যানজটসহ ভোগান্তি বাড়ছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে পারছেন না বহু মানুষ। কেসিসির পক্ষ থেকে নগরীর প্রধান প্রধান সড়কে ইজিবাইকের সংখ্যা ও রুট নির্ধারণ করা হলেও কেউ তার তোয়াক্কা করেন না। পাশাপাশি শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার বিষয়টি যাদের দেখার কথা, তাদের ভূমিকাও নীরব।

খুলনা সিটি কর্পোরেশন থেকে বলা হচ্ছে- প্রতিদিনই নগরীতে লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইকের বিরুদ্ধে অভিযান ও আটক অব্যাহত আছে।
সরেজমিন দেখা যায়, খুলনা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক রূপসা, সাতরাস্তার মোড়, রয়েল চত্বর, ক্লে রোড, স্যার ইকবাল রোড, শামসুদ্দিন আহমেদ রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, খানজাহান আলী রোড, স্টেশন রোড, বড় বাজার রোড, কোর্ট চত্বর, গগনবাবু রোড, ডাকবাংলা, শিববাড়ী, নিউমার্কেট, সোনাডাঙ্গা, ময়লামোতা মোড়, গল্লামারী, নিরালা, বয়রা, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, দৌলতপুর, ফুলবাড়ীসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এখন অনিয়ন্ত্রিত লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইকের দখলে। অপ্রতিরোধ্য এসব ইজিবাইকের কারণে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সর্বক্ষণ জ্যাম লেগেই থাকে। এতে যানজট সংকটসহ দুর্ঘটনা ঘটনার ব্যাপক প্রবণতা বাড়ছে। অপরিমিত ইজিবাইকের কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাও রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, খুলনার অধিকাংশ ইজিবাইকের চলাচলের জন্য বৈধ কোনো অনুমতিপত্র নেই। অনেকের ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। এমনকি চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই। ফলে এসব চালকের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ব্যস্ততম সড়কে খেয়াল-খুশিমতো ইজিবাইক দাঁড় করানো, সড়কের ডান পাশ ঘেঁষে চলা, বেপরোয়া ওভারটেকিং, নির্দিষ্ট কোনো স্টপেজ না থাকা এবং টার্ন নিতে গিয়ে জটলা পাকানো ইজিবাইক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
নগরীর ময়লাপোতার বাসিন্দা মামুন বলেন, ইজিবাইক চালকদের কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণ বা ট্রাফিক নিয়ম কানুন না থাকায় প্রতিনিয়ত সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া সড়কে একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো ফলে যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে এ বাহনে চলতে হয়।
ইজিবাইক চালক হাসান জানান, নিয়মতান্ত্রিকভাবে কেসিসির ফিস দিয়ে লাইসেন্স গ্রহণ করেছি এবং যথারীতি নবায়নও করছি। কিন্তু শহরে লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইক এত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, আমরা প্রকৃত লাইসেন্সধারী হয়েও রাস্তায় নেমে ভাড়া পাই না। এ ব্যাপারে কেসিসির সুদৃষ্টি কামনা করছি।
নিরাপদ সড়ক চাইয়ের (নিসচা) খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মুন্না বলেন, ব্যস্ততম সড়কে খেয়াল খুশিমতো ইজিবাইক দাঁড় করানো, কখনো সোজা, কখনো উল্টো পথে চলাচল, ট্রাফিক আইন না মানা- এসব কারণে সড়কে বাড়ছে ঝুঁকি, বাড়ছে দুর্ঘটনা। আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি অবৈধ ইজিবাইক যেন শহরের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে। আর যেন নতুন করে কোনো লাইসেন্সও না দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আহমেদ বলেন, জাতীয় বা আঞ্চলিক মহাসড়কে ইজিবাইক চলাচল সরাসরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে হাইকোর্ট থেকে। এর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।