কাশফুলের শুভ্রতায় মেতে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র
ঋতু পরিক্রমায় এখন শরৎকাল। শরৎকালের বৈশিষ্ট্যই কাশফুল। কাশফুলের আদিনিবাস রোমানিয়ায়। যুগের পর যুগ ধরে এটি বাংলাদেশেরও একটি পরিচিতি উদ্ভিদ। আমাদের দেশে এটি সবার কাছে অতিপরিচিত। কাশফুলের ইংরেজি নাম ‘ক্যাটকিন’। কাশফুলে রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। কাশ সাধারণত ছোট সময় গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বহুকাল আগে থেকে গ্রামাঞ্চলে ঘরের ছাউনি, বেড়া নির্মাণও করা হয়।
জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ও বানার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তীর্ণ এলাকা শরতে কাশফুলের শুভ্রতায় মেতে উঠেছে। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল ছেড়ে নদীর কলতান, শুনশান বালুচর, সাদা মেঘ ও কাশফুলের মিতালী উপভোগ করতে প্রতিদিন বিকেল হলেই ওই এলাকায় ভিড় করছেন অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমী নানা বয়সের মানুষ। বিকেলে শরিফপুর ও বানার এলাকায় ফুটন্ত কাশবন ঘুরে দেখা গেছে জেলার
বিভিন্ন স্থান থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুরা দলে দলে উপভোগ করছেন শরৎ এর অপরূপ দৃশ্য কাশবন।
কাশফুলের শুভ্রতা আর নদের কলতানে প্রকৃতির এক অপার লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে শরিফপুর, চরযথার্থপুর ভাটিপাড়া ও হামিদপুর বানার এলাকা। মোটরসাইকেল, ভটভটি, অটোভ্যান, অটোরিকশা, নৌকা যে যেভাবে পারছেন ছুটে চলেছেন কাশবন দেখতে।
.png)
কেউ কাশফুলের স্পর্শে ছবি তুলছেন। কেউ কাশফুল ছিড়ে হাতে নিয়ে ছবি তুলছেন। কেউ হাটা হাটাহাটি করছেন। আনন্দ গ্রহণ ও উপভোগ করছেন।
জানা যায়, কাশফুল সাধারণ দেশের বিভিন্ন নদ-নদীগুলোর অববাহিকার প্রকৃতির ঐশ্বর্য আর অপূর্ব শোভায় সুশোভিত কারুকার্যময় কাশফুলের বাগান। এটি সাধারণ চৈত্র মাস থেকে আস্তে আস্তে বড় হয়ে প্রকৃতির আপন খেয়ালে শরৎকালে আপনা-আপনি ফুল ফোটে। ছোট থেকে আস্তে আস্তে বড় হয়ে আশ্বিনে ফুল ফুটিয়ে চারদিকে বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে দেয়। আর সেই ছড়িয়ে দেয়া ফুল থেকেই নদীর পাড়, বালুরচরসহ বিভিন্ন স্থানে গো-খাদ্য হিসেবে জন্ম নেয় এ কাশফুলের গাছ।
আবু বক্কর বলেন, এখন আর আগের মতো কাশবন পাওয়া যায় না। আগে কাশবন দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকৃতি প্রেমিকরা আসতো। আমরা অনেক দূর থেকে কাশফুলের বাগান দেখে আসতাম তাদের সঙ্গে গিয়ে। সুন্দর কাশফুলের বাগান দেখে আমাদের খুব ভালো লাগতো।
ছাইদুর রহমান বলেন, কাশবাগান প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগের মধ্য দিয়ে যে কারো মন হারিয়ে যেতে পারে। একটু অপেক্ষা করলে হৃদয়ে নাড়া দেয় বাতাসে দোল খাওয়া ঢেউ খেলানো কাশফুল বাগানের বিমোহিতকর সৌন্দর্য্য। সন্ধ্যার আগে যখন সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে, তখন নদ-নদীর কোলজুড়ে আরো রোমাঞ্চকর মুহূর্ত সৃষ্টি করে সাদা কাশফুলের অপূর্ব দৃশ্য।
জামালপুরের বানার এলাকায় কাশবন ঘুরতে যাওয়া নান্দিনা এলাকার খড়খড়িয়ার বাসিন্দা ও তরুণ সমাজকর্মী শহিদুল ইসলাম জানান, কাশফুলের অপরুপ প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য প্রতিনিয়ত শত শত নারী-পুরুষ শিশু কিশোর উৎসুখ মানুষ এখানে আসছে। তাদের দেখাদেখি এবং শুনে আমরাও আজ এসেছি।
তিনি আরো জানান মাত্র এক, দেড় মাস এই কাশবনের স্থায়িত্ব। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। কাশফুলের এখন ভরা মৌসুম চলছে।
জামালপুর থেকে আগত শিউলী বেগম জানান, আমি আমার শিশু সন্তানদের নিয়ে কাশফুল দেখতে এসেছি। অনেক ভালো লেগেছে। অনেক সুন্দর পরিবেশ।
ছোট শিশু লুবনা জানান, কাশফুল দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তাই দেখতে এসেছি।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝি শফিকুল ইসলাম জানান, কাশফুলের সময় এলেই অনেক মানুষ নদীর পার হয়ে কাশফুল দেখতে আসে। মাত্র কিছুদিনের জন্য আমার নৌকায় নদ পারাপারে ভিড় লেগে যায়। এ সময় নদ পারাপারে জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া আদায় করি। ইনকাম কিছুটা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল হোসেন জানান, বহু বছর ধরে শরিফপুর ও বানারের বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে কাশবনের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর এ সময়টায় কাশফুল দেখতে লোকজন এখানে এসে ভিড় করেন।
জামালপুর পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের এলাকায় বিশাল বালুমহাল রয়েছে। এখানকার বালু বিক্রি
হচ্ছে নানাস্থানে। মাঠ, ঘাট, পুকুর, ডোবা, নালা ইত্যাদি এখানকার বালু দ্বারা ভরাট করা হচ্ছে। ট্রাকে করে নেয়া বালু যে স্থানটি ভরাট করা হচ্ছে সেখানেই কাশফুলের বীজ চলে যাচ্ছে। আর শরৎ এর সময়টাতে ওই ভরাটকৃত জায়গাটিতে বীজ অঙ্কুরিত হয়ে কাশফুলের জন্ম নিচ্ছে। এবং প্রকৃতির শোভা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আকাশে নীল মেঘের পাহাড় আর কাশফুলের ছোয়া নিতে চাইলে যেতে হবে কাশবাগানে। প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য্য যেনো ফুটে উঠেছে কাশবাগানে। মাথার ওপর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা খেলা আর নিচে অপূর্ব শোভায় কাশফুলের মেলায় সকলকেই কাছে টানে যুগ যুগ ধরে ফুটানো সাদা কাশফুল।