ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

প্রতিযোগিতা করে বিসিএস জয় প্রতিবন্ধী উল্লাসের 

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:১০, ১৯ জানুয়ারি ২০২৪
প্রতিযোগিতা করে বিসিএস জয় প্রতিবন্ধী উল্লাসের 
বিসিএস ক্যাডার প্রতিবন্ধী উল্লাস। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আর পাঁচটা শিশুর মতো স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেননি উল্লাস পাল। জন্ম থেকেই হাত ও পা বাঁকা তার। ফলে লিখতে সমস্যা হয়। ডান হাতে কোনো শক্তি পান না শারীরিক প্রতিবন্ধী উল্লাস পাল। হাঁটতেও সমস্যা হয়। তবে নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ এবং স্বাভাবিক মনে করেন উল্লাস। এই চিন্তা থেক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী কোটায় পরীক্ষা দেননি তিনি।

 সাধারণ প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ৪৩তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। ৪০ ও ৪১তম বিসিএসে মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। তবে ৪১তম বিসিএসে পাস করলেও নন-ক্যাডার আসে তার। শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় তার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করেন এলাকাবাসী ও তার শিক্ষক। 

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার কার্তিকপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন উল্লাস পাল। উত্তম কুমার পাল ও আন্না রাণী পাল দম্পতির তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে মেজ উল্লাস। বাবা মৃৎশিল্প ব্যবসায়ী, আর মা গৃহিণী। 

Advertisement

দুই হাত দুই পা ছোট ও বাঁকা নিয়ে জন্ম নেয় উল্লাস। পায়ের গঠন অস্বাভাবিক হওয়ায় ছোটকাল থেকে অন্য আর পাঁচজন শিশুর মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না তিনি। সন্তানকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন যায়গায় চিকিৎসা করান তার বাবা-মা। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। তাই ভারতের মাদ্রাজে নিয়ে চিকিৎসা করান। তাতেও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি উল্লাস পালের। 

স্থানীয় কার্তিকপুর পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে কার্তিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে ঢাকা নর্দান কলেজ বাংলাদেশ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পান। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৪৬৩তম হয়েছিলেন তিনি। তিনি চাকরির জন্য ৮টি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। পরে চাকরি হয় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে। ২০২৩ সালের ১ মার্চ থেকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক নড়িয়া শাখায় চাকরি করছেন তিনি। মোবাইল ও কম্পিউটার চালনায় দক্ষ তিনি। লেখালেখি ও স্বাক্ষর সব কাজই বাম হাত দিয়ে করে থাকেন তিনি।

৪৩তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়া উল্লাস পাল বলেন, শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করি। স্বাভাবিকভাবে ছোট সময় অন্যান্য শিশুদের মতো হাঁটতে পারতাম না। পরে হাঁটতে শিখেছি। ৪৩তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। তবে আমার এডমিন ক্যাডার হওয়ার ইচ্ছা।

তিনি আরো বলেন, নিজেকে একটু অন্য রকম লাগত। কারণ, সবাই আমার চেয়ে আলাদা। ছোটবেলা থেকেই একটা লজ্জাবোধ কাজ করত। স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে খেলতে চেষ্টা করতাম, কিন্তু সেসব কঠিন খেলা (হাডুডু, গোল্লাছুট ও ক্রিকেট) আমার দ্বারা সম্ভব হতো না। তাই আমি দর্শক। স্কুলে যাওয়ার পথে অনেক অবুঝ বাচ্চারা আমার গঠন দেখে হাসি-তামাশায় ব্যস্ত থাকত। পড়াশোনায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম, তাই শিক্ষকদের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছি। বন্ধুদের সাহায্য পেয়েছি সব সময়। পরিবার সব সময় পাশে ছিল। না হলে এত দূর আসা সম্ভব ছিল না।

উল্লাসের মা আন্না রাণী পাল বলেন, উল্লাস আমার গর্বের ধন। সেই ছোটকাল থেকে মানুষের নানা কটুক্তি সহ্য করেও আমি তাকে পরম যত্নে বড় করেছি। আজকে তার সাফল্যের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

কম্পিউটারে কাজ করছেন বিসিএস ক্যাডার প্রতিবন্ধী উল্লাস

উল্লাসের বাবা উত্তম কুমার পাল বলেন, আমাদের উল্লাস জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। আমরা চেষ্টা করেছি ডাক্তার দেখিয়ে ওকে সুস্থ করে তুলতে। পরিবারে কেউ ওকে কখনো প্রতিবন্ধী হিসেবে দেখিনি। ছোটবেলা থেকে বিশেষভাবে যত্ন করে বড় করেছি। আমাদের চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখিনি। নিজেও অনেক পরিশ্রম করেছে। ওর কষ্ট সার্থক হয়েছে। আমরা ওকে নিয়ে অনেক বেশি গর্বিত ও আনন্দিত।

স্থানীয় শামীম হোসেনসহ অনেকেই জানান, সাধারণ মানুষের চেয়ে উল্লাসের বিষয়টি আলাদা। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও বিসিএস ক্যাডার তিনি। উল্লাস এলাকার গর্ব বলে জানান তারা।
 
কার্তিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক তুষার কান্তি বলেন, উল্লাস পাল আমাদের ছাত্র। সে এই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল নিয়ে মাধ্যমিক পাস করেছে। তবে অন্য শিক্ষার্থীদের চেয়েও সে একটু ব্যতিক্রম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ঠিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারতো না। বাম হাত দিয়ে লেখালেখি করতো। কিন্তু ভীষণ রকমের মেধাবী ছিল। এখন বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। আমরা উল্লাসকে নিয়ে গর্ববোধ করি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!