ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

জ্বীন-ভূতের ভয়ে যে মসজিদে যেত না মানুষ

মেহেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:১৮, ২৮ জানুয়ারি ২০২৪
জ্বীন-ভূতের ভয়ে যে মসজিদে যেত না মানুষ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দেয়ালে গজিয়ে ওঠা বটগাছের শেকড় বাকড়ে আগলে রেখেছে গোটা মসজিদটিকে। দেয়ালের কিছু কিছু অংশের ইট খসে পড়েছে। কিন্তু পরিত্যক্ত দেয়ালে তৎকালীন কারুকার্য খচিত নকশা মাটির প্রদ্বীপের মতো জ্বলছে গোসাইডুবি মসজিদটি। মসজিদটির চিহ্ন বিলুপ্ত প্রায়। এখন আর কেউ নামাজের জন্য সেখানে যায় না। 

জ্বীন-ভূতের বসবাস ভেবে একা সাহস করে কেউ সেখানে যেতে না পারায় সেটির সংস্কার কাজও হয়নি। ফলে মসজিদটি এখন ধ্বংসের পথে। ইতিহাসের সাক্ষী ধরে রাখা গোসাইডুবি মসজিদটি মেহেরপুর জেলার অন্তর্গত গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের করমদি গ্রামের দুর্গম মাঠে অবস্থিত। মসজিদের অবশিষ্টাংশ বুকে আগলে রেখেছে বিশাল আকৃতির এক বটবৃক্ষ। মসজিদটির সংস্কারের দাবি স্থানীয়দের।

জানা যায়, ১৮৬৪ সালে করমদি গ্রামের হাজী দশরাত বিশ্বাস নিজ খরচে মসজিদটি নির্মাণ করেন। হেঁটে হজ করার পর বাড়ি ফিরে নামাজের জন্য মসজিদটি নির্মাণের পর মসজিদটির আশেপাশে গড়ে ওঠে বসতি। তার মৃত্যুর পর মসজিদটি দেখভাল করার কেউ ছিল না। অন্যদিকে জ্বীন-পরীর ও ভূতের আছর হতে পারে এমন গুজবে এবং হনুমানের অত্যাচারে ওখানকার বসতিরা অন্যস্থানে চলে যান। 

মসজিদটির আশেপাশে জনবসতি না থাকায় নির্মাণের পর থেকেই মসজিদটি সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ ও ভগ্ন অবস্থা বিরাজ করে। মসজিদটির দেয়ালে গজিয়ে উঠে একটি বটগাছ। গাছটি বিশাল আকৃতি ধারণ করে। বটের শেকড় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে মসজিদটি অস্তিত্ব বিলীন করে ফেলে। বিশাল আকৃতির বটবৃক্ষের নেমে যাওয়া বওয়ার ফাঁক দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে মসজিদের কিছু অংশ। তার আশপাশে পড়ে আছে পাহাড়ি দৃশ্যের মাটির ভিটা। বংশ পরম্পরায় হাজী দশারতের মৃত্যুর পর তার ছেলে কফিল উদ্দীন বিশ্বাস ওই মসজিদটি দেখাশোনা করতেন। কফিল উদ্দীন বিশ্বাসের মৃত্যুর পর ছেলে আব্দুল জলিলের নামেই মসজিদ এলাকা স্থানটি এখন স্থাপনার নায়ক মৃত দশারত এর নাতি ছেলে আব্দুল জলিলের বটতলা নামে পরিচিত।

বটগাছে ঘেরা রহস্যময় প্রাচীন মসজিদ

এলাকাবাসী জানান, গোসাইডুবি মাঠের ভিতরে মসজিদটি তৈরি করায় তার নাম দেওয়া হয় গোসাইডুবি মসজিদ। সন্ধ্যার পর আর ওই গাছের পাশ দিয়ে কেউ মাঠে যায় না। 

মসজিদটির কাছে গিয়ে দেখা গেছে, চুন সুরকীর গাঁথুনি ও আস্তরণ খসে পড়লেও এর গায়ে যে কারুকার্য খচিত নকশা ছিল তা বিলীন হয়ে যায়নি। মসজিদটি এখন আর সংস্কার করাও পথ নেই। কয়েক বছর পর কাগজ-কলমে গোসাইডুবি মসজিদ থাকলেও এর অস্তিত্ব খুঁজে পাবে না ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। তবে জ্বীন-ভূতের ভয়ে এলাকায় মানুষ সেখানে যেতে এখনো ভয় পান। 

স্থানীয় প্রবীণদের মুখ থেকে শোনা যায়, মেহেরপুর জেলার এটিই প্রথম মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদটি সংস্কার করে এর অস্তিত্ব ধরে রাখার দাবি করেন এলাকাবাসী।

করমদী গ্রামের আলমগীর হোসেন জানান, আমরা গল্পে শুনেছি, জেলার এটি প্রথম মসজিদ নামে খ্যাত।  যেহেতু এর অস্তিত্ব এখনো বিলীন হয়ে যায়নি, তাই সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া উচিত।

করমদি জামে মসজিদের ঈমাম মো. খাদিমুল ইসলাম বলেন, কয়েকশ বছরের পুরাতন জরাজীর্ণ এই মসজিদটি সংস্কারের জন্য স্থানীয়দের উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। মসজিদটি পুনঃসংস্কার করা হলে প্রচলিত জ্বীন-ভূত যে কুসংস্কার আছে তাও দূর হবে। মানুষ শূন্য এলাকায় আবারো মানুষ চলাচলে সাহস যোগাবে।

স্থানীয় তেঁতুলবাড়ীয়া ইউপির সাবেক সদস্য দানিয়াল হক জানান, ভিন্ন জেলার মানুষ গোসাইডুবির মসজিদ দেখতে আসেন। কিন্তু স্থানীয়দের মধ্যে অনেক ভয় রয়েছে। ওই এলাকায় একা কেউ যেতে পারে না। মসজিদটি জেলার ঐতিহাসিক মসজিদ হিসেবে সরকারি উদ্যোগে সংস্কার করা হলে পুরাতন মসজিদটি যেমন সৌন্দর্য্য ফিরে পাবে, তেমনি এলাকার মানুষের মধ্যকার আতঙ্ক আর ভয়ের অবসান হবে।

তেঁতুলবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা বিশ্বাস জানান, মসজিদটি সংস্কারের জন্য এলকাবাসী উদ্যোগ নিলে আমি আমার ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করব। তবে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার করা হলে বিভিন্ন দফতরের নজরে আসবে। তাহলে সরকারিভাবে এটি হয়তো সংস্কার কিংবা সংরক্ষণের ব্যবস্থা হতে পারে।

বটগাছে ঘেরা রহস্যময় প্রাচীন মসজিদ

গাংনী উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তদারক কর্মকর্তা (সুপারভাইজার) মনিরুল ইসলাম জানান, ২০০৫ সালের দিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় জেলার ঐতিহাসিক মসজিদ হিসেবে প্রস্তাবনা চেয়েছিল। মেহেরপুর জেলার একমাত্র ঐতিহাসিক মসজিদ হিসেবে সংস্কারের জন্য গোসাইডুবি মসজিদটি সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। আস্তে আস্তে হয়তো এক সময়কার এই মসজিদ খাতা-কলম ও মেহেরপুরের ইতিহাসে থাকবে। তবে বাস্তবে তার অস্তিত্বের দেখা মিলবে না।

গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রীতম সাহা জানান, মেহেরপুর জেলার ইতিহাসে গোসাইডুবি মসজিদের নাম উল্লেখ রয়েছে। মসজিদের অনেক কাঠামো এখনো টিকে রয়েছে আমি স্থানীয়দের মুখে শুনেছি।  তবে  মসজিদটি আমার উপজেলার মধ্যে অবস্থিত। সংস্কারের জন্য সরকারিভাবে চেষ্টা করা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!