৬ দশকেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি রাজবাড়ী বিসিক
রাজবাড়ীতে ছয় দশক পার হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)। ৭৭টি প্লটের উপর ৫৩টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। এখন হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবগুলোই বন্ধের পথে। জনবল সংকটসহ রয়েছে বিভিন্ন সমস্যা।
জেলা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৪ সালে রাজবাড়ী শহরের নতুন বাজার সংলগ্ন রামকান্তপুর এলাকায় প্রায় ১৬ একর জমির উপর গড়ে ওঠে বিসিক নগরী। এতে ৭৭টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫৩টি (ইউনিট) শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। এখন মাত্র ১১টি শিল্প প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে চালু রয়েছে। রুগ্ন অবস্থায় আছে ১৭টি। বছরে দু-এক মাস চলে ১৫টি। একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে ৯টি। মামলা জটিলতায় আটকে আছে একটি।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিসিক এলাকায় সাধারণত ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’- এই চার শ্রেণির প্লট রয়েছে। প্রতিটি ‘এ’ শ্রেণির প্লটের আয়তন ১৫ হাজার বর্গ ফুট। ‘এ’ শ্রেণির মোট প্লটের সংখ্যা ১৪টি। ‘বি’ শ্রেণির প্রতিটি প্লটের আয়তন নয় হাজার বর্গফুট। এই শ্রেণির প্লটের সংখ্যা ২৩টি। ‘সি’ শ্রেণির প্রতিটি প্লটের আয়তন চার হাজার ৫০০ বর্গফুট এবং ‘ডি’ শ্রেণির প্লটের আয়তন তিন হাজার বর্গফুট। এই দুই শ্রেণির ২০টি করে প্লট রয়েছে।
আরো জানা যায়, প্লট বরাদ্দ পেতে হলে প্রথমে বিসিক বরাবর আবেদন করতে হয়। শিল্প নগরী পরিচালনা কমিটি যাচাই বাছাইয়ের পর প্লট বরাদ্দের জন্য অনুমোদন দেয়। বিসিক এলাকায় এক শতাংশ জমির সরকার নির্ধারিত মূল্য এক লাখ টাকা। বরাদ্দকৃত প্লট হতে প্রতিবর্গফুট জমির নির্ধারিত বাৎসরিক কর দুই টাকা। জেলা বিসিক কার্যালয়ে শিল্প নগরীর দফতরে পদ সংখ্যা ৮টি। এর মধ্যে শিল্প নগরী কর্মকর্তা একজন, কারিগরি কর্মকর্তা একজন, হিসাব রক্ষক তথা কোষাধ্যক্ষ একজন, করণিক তথা মুদ্রাক্ষরিক একজন, পাম্প ড্রাইভার একজন, পিয়ন একজন এবং দারোয়ান দুইজন।
এর মধ্যে জেলা বিসিকের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে শিল্প নগরী দফতরে দায়িত্ব পালন করছেন। কারিগরি কর্মকর্তা, মুদ্রাক্ষরিক ও দারোয়ানের পদ শূন্য রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ী পুলিশ লাইন মোড় পার হয়েই আধা কিলোমিটার দক্ষিণে বিসিক শিল্প নগরী এলাকা। বিসিক এলাকার মধ্য দিয়ে একটি পাকা সড়ক চলে গেছে। প্রবেশ পথের ডানপাশে বিসিক কার্যালয়। একটি পুরোনো দ্বিতল ভবন। ভবনে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দাফতরিক কাজ করেন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে আগাছা জন্মেছে। পরিবেশ নোংরা। কারখানার ভেতরে চরানো হচ্ছে গবাদিপশু। রাস্তাগুলো ভেঙে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো স্থান ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। চালু রয়েছে হাতে গোনা
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
আইনুদ্দিন টেক্সটাইলের মালিক খলিলুর রহমান বলেন, আমি এখানে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ইনভেস্ট করেছি। মূলধনের অভাবে আমার কারখানা বন্ধ রয়েছে। আগে ২০ শতাংশ জমির জন্য বাৎসরিক ট্যাক্স দিতো হতো পাঁচ হাজার টাকা। এখন ভ্যাটসহ প্রায় ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়। বিসিক আমার কাছে কিছু করের টাকা পাবে। এগুলো পরিশোধ করে খুব দ্রুতই কারখানা আবার চালু করার চেষ্টা করছি।

জেলা বিসিকের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার এখানে চারটি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। আগে এখানে অনেক সুবিধে ছিল। সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যেত। এখন নানা অসুবিধার মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হয়। অনেকে ব্যাংক ঋণ না পেয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ পুঁজির স্বল্পতার কারণে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছেন। আর এখন কেউ নতুন করে এখানে আসতে চাচ্ছেন না। এখানে ড্রেনেজ সিস্টেম খুব খারাপ। সবমিলিয়ে বিসিক খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
বিসিকের শিল্প নগরী কর্মকর্তা জিয়াউল হক জিহাদ বলেন, প্লটগুলো অনেক আগে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকে পুঁজি সংকটে ব্যবসা কন্ধ করে দিয়েছেন। কয়েকজন প্লট বরাদ্দ নিয়ে বসে আছেন। তারা উৎপাদনেও যাচ্ছেন না, আবার ছেড়েও দিচ্ছেন না। কিছু প্লট ভাড়ায় চলছে। অনেকের কাছে করের টাকা বাকি পড়ে আছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। নিয়মতান্ত্রিকভাবে এসব প্লট বাতিল বা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া আমাদের দফতরের জনবলেরও সংকট রয়েছে। আমার দফতরে মোট পদ রয়েছে আটটি। আমি নিজে সম্প্রসারণ কর্মকর্তা। এখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। এখানে কারিগরি কর্মকর্তা, করণিক তথা কোষাধ্যক্ষ ও দারোয়ানের পদ শূন্য রয়েছে। আমরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছি।
সহকারী ব্যবস্থাপক চয়ন বিশ্বাস বলেন, এখানে বেশ কিছু সমস্যা আছে। সবচেয়ে বড় দুইটি সমস্যা হলো- নিরাপত্তা প্রাচীর না থাকা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা। আবার বিসিকের মাঝখান দিয়ে জনসাধারণের যাতায়াত করার জন্য পাকা রাস্তা রয়েছে। অনেকেই এতে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন। এতে করে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালু রাখেনি। তবে অল্প সময়ের মধ্যে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।