খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- শহরে চরপাড়া, নয়াপাড়া, কপিক্ষেত, ব্রাহ্মপল্লী, বাঘমারা, ভাটিকাশর, কৃষ্টপুর, পাটগুদাম, রামকৃষ্ণমিশন রোড, সাহেবআলী রোড, চামড়াগুদাম ও কালিবাড়ি রোডসহ বিভিন্ন অলিগলিতে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এগুলোতে নেই স্থায়ী চিকিৎসক বা নার্স। রোগী এলে চিকিৎসক ও নার্স ডাকা হয়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা চলার পাশাপাশি অপারেশনও হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের অপারেশন থিয়েটারগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক।
অভিযোগ রয়েছে, এসব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবের সঙ্গে মমেক হাসপাতালের এক শ্রেণির কমিশনভোগী চিকিৎসকের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মমেক হাসপাতালে পরীক্ষার সব ব্যবস্থা থাকলেও এই হাসপাতালের রোগীদের এসব ক্লিনিক-ল্যাবে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হচ্ছে। কমিশনভোগী এসব চিকিৎসকের অধিকাংশই একাধিক গাড়ি-বাড়ির মালিক। তবে এসব চিকিৎসকের কারণে একদিকে যেমন হাসপাতালের ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে রোগীদেরও গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
.png)
স্থানীয়রা বলছেন, মূলত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে টার্গেট করে বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের নাকের ডগায় গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসাসহ রোগীরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হলেও কোনো প্রতিকার মিলছে না।
ময়মনসিংহ মহানগরীর চরকালিবাড়ী এলাকার সাজ্জাদ হোসেন রাসেল বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে আমার অন্তঃসত্ত্বা শালিকা সাজেদা আক্তারকে পূর্বপরিচিত ইমরান নামের এক লোকের পরামর্শে শহরের বসুন্ধরা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকে নিয়ে গিয়েছিলাম। ইমরান ঐ হাসপাতালের ম্যানেজার। রাত ১০টার দিকে হাসপাতালটিতে সিজারের পর চিকিৎসক চলে গেলে সাজেদার অবস্থা খারাপের দিকে যায়। ধীরে ধীরে পেট ফুলতে থাকে। এ সময় হাসপাতালে ছিল না কোনো ডিউটি চিকিৎসক। এমতাবস্থায় তড়িঘড়ি করে ইমরান নিজেই রোগীকে ৪-৫টা ইঞ্জেকশন পুশ করেন। এতে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়। এমতাবস্থায় ইমরানের পরামর্শে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক রোগীকে মৃত ঘোষণা করেন।
একই এলাকার নজরুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, কয়েক মাস আগে আমার স্ত্রীকে দ্বিতীয়বার সিজারের জন্য পরিচিত লোকের মাধ্যমে শহরের এপেক্স হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলাম। সিজারের পর স্ত্রীসহ নবজাতক সন্তান সুস্থ ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই স্ত্রীর পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে পেট ফুলতে থাকে। এমতাবস্থায় ভুল চিকিৎসা হয়েছে এমন সন্দেহ হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের পরামর্শে আল্টাসনোগ্রাফ করা হলে রিপোর্টে ধরা পড়ে পেটের ভেতর গজ রেখেই সেলাই করা হয়েছে।
এছাড়াও জেলার ত্রিশাল উপজেলার আউটিয়াল গ্রামের রিকশাচালক আনিসুর রহমানের স্ত্রী হাসিনা অপচিকিৎসার শিকার হয়েছেন। গত বছরের ১৭ জুন সকালে হাসিনার প্রসব ব্যথা শুরু হয়। পরে তাড়াহুড়ো করে ঐ দিন সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া ব্রাহ্মপল্লী ১৩/বি হেলথ কেয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে সিজারে ছেলে সন্তান জন্ম হয়। ২০ জুন ক্লিনিক থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তবে হাসিনার ক্ষত সারছিল না।
হাসিনা শুধু বলতেন, তার পেটে ব্যথা করে। পরে ১৪ আগস্ট হাসিনাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আলট্রাসনোগ্রাফিতে ধরা পড়ে জরায়ুতে গজের মতো কিছু একটা রয়েছে। যে কারণে ভেতরে ইনফেকশন হয়ে গেছে। খুব দ্রুত অস্ত্রোপচার করাতে হবে। পরে অস্ত্রোপচারে ৭৫ শতাংশ জরায়ু ও ফেলোপিয়ান টিউব কেটে ফেলে দিতে বাধ্য হন চিকিৎসক।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ শহরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক-ল্যাব রয়েছে প্রায় ২০০টি। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা কমপক্ষে দ্বিগুণ। সরকারি তালিকায় যেসব প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক ল্যাব রয়েছে তাদের বেশিরভাগ বছরের পর বছর ধরে নবায়ন করছে না। হাসপাতাল পরিচালনার অনুমোদন নিয়ে অনেকে ল্যাব খুলে বসেছে। অনেকে আবেদন করে লাইসেন্স না পেয়েও বড় সাইনবোর্ডে আবেদিত লিখে নিজের হাসপাতালে রোগী ভর্তি করছে। এছাড়া এসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ল্যাবে নেই কোনো ডিপ্লোমাধারী নার্স ও প্রশিক্ষিত আয়া।
একটি ১০ শয্যার ক্লিনিকে তিনজন ডিউটি চিকিৎসক ও ছয়জন নার্স সার্বক্ষণিক থাকতে হবে। এর চেয়ে বেশি বেডের প্রতিষ্ঠান হলে দ্বিগুণ ডিউটি চিকিৎসক ও নার্স থাকতে হবে। কিন্তু লাইসেন্স পেয়েছে এমন অনেক প্রতিষ্ঠানে একজন ডিউটি চিকিৎসকও রাখা হয় না। সার্বক্ষণিক চিকিৎসক দেখানো হয় কেবল খাতায়, আয়াদের নার্সের পোশাক পরিয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করা হয়।
বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অনার্স অ্যাসোসিয়েশন ময়মনসিংহের সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ চাইলে অনুমোদনহীন ও মানহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাব সিলগালা করে বন্ধ করে দিতে পারে। এতে আমাদের মতপার্থক্য নেই। কারণ আমরা চাই, সব রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত হোক। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে অপচিকিৎসা না হওয়াসহ রোগী মৃত্যুর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ চিকিৎসকদের আরো সচেতন হওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জেলার অনুমোদনবিহীন বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবগুলোর তালিকা করে অভিযান চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি অনেকগুলো মানহীন প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার নামে চলতো বাণিজ্য। কাউকে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করতে দেওয়া হবে না। অভিযান চলবে।