ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

যানজট যেন নিত্যদিনের সঙ্গী বগুড়া শহরবাসীর

আলমগীর হোসেন, বগুড়া
প্রকাশিত: ১৯:১৫, ৬ এপ্রিল ২০২৪
যানজট যেন নিত্যদিনের সঙ্গী বগুড়া শহরবাসীর
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

* শহরজুড়ে যত্রতত্র পার্কিং
* রাস্তার দু’পাশ দখল করে দোকানপাট নির্মাণ
* দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ অটোরিকশা
* কেউই মানছেন না ট্রাফিক আইন
* পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না

বগুড়া শহরে বেড়েই চলেছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। আর এসব যানবাহন রাস্তার ধারণ ক্ষমতার বেশি হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে যানজট। এতে নাভিশ্বাস উঠছে শহরবাসীর। শহরজুড়ে যত্রতত্র পার্কিং আর রাস্তার দু’পাশ দখল করে বসানো দোকানের কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিলেও তা যথেষ্ট নয়। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এমন যানজট অব্যাহত থাকছে। ফলে দুর্ভোগের কোনো সীমা নেই।

Advertisement

উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বগুড়া শহর। প্রাচীনকাল থেকে এ শহরের ইতিহাস ঐতিহ্য রয়েছে। এসব কারণে বগুড়ায় গড়ে উঠেছে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্কুল কলেজ। ফলে শহরের যানবাহনের চাপ বেড়েছে। এছাড়া অন্য জেলাগুলো থেকেও প্রতিদিনই বহু মানুষ বগুড়া শহরের ভিন্ন কাজে আসেন। সে কারণে বগুড়া শহরে আবাসিক ভবনসহ যানবাহন এবং মানুষের চাপ বেড়েই চলছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার পর থেকে বগুড়া শহরের যানজট তীব্র আকার ধারণ করেছে।অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজে যাতায়াতে অনেক সময় বেশি লাগছে। এতে করে কেউ সময়মতো অফিস, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সময় মতো যেতে পারছে না।

যেখানে রয়েছে ট্রাফিক বক্স সেই শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথাও অনেক সময় তীব্র যানজট দেখা যায়। শহরের স্টেশন রোড, গোহাইল রোডের সূত্রাপুর থেকে সাতমাথা, শেরপুর রোডের মফিজ পাগলার মোড় থেকে সাতমাথা, পার্ক রোড থেকে সাতমাথা, বড়গোলা, রাজাবাজার, দত্তবাড়ী থেকে সাতমাথা, ফতেহ আলী বাজার থেকে থানা মোড়, জলেশ্বরীতলা, আদালত এলাকা, ডিসি, এসপি অফিস রোড পর্যন্ত তীব্র যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন।

এছাড়া বাদুড়তলা এলাকায় ট্রান্সপোর্ট/কুরিয়ার সার্ভিস থাকায়, বড় কার্গো গাড়ি সারাদিন ঐ এলাকায় প্রবেশ করে। দিনের বেলা এই গাড়িগুলোর একটি ঐ এলাকায় প্রবেশ করলেই যানজটের সৃষ্টি হয়। যে যানজট মুক্ত হতে সময় লাগে কমপক্ষে ৪০ মিনিটে। একই অবস্থা বড়গোলা টিনপট্টি নামাজগড় এলাকায় দিনের বেলায় রড সিমেন্ট এবং টিনের ট্রাক থেকে মাল লোড-আনলোড করা হয়। ঐ রাস্তাটি সরু হওয়ায় একটি বৃহৎ আকারের ট্রাক প্রবেশ করলেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। যেটা নিরসনে প্রায় ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এভাবে একের পর এক মালবাহী ট্রাক প্রবেশ করায় দিনের পুরোটা সময়ই যানজট লেগে থাকে ঐসব এলাকায়।

অন্যদিকে, শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার প্রায় সবগুলো সড়কই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, অবৈধ পার্কিং, রাস্তার দু’পাশে বসা দোকানপাটের কারণে ভয়াবহ যানজটের কবলে পড়ে যায়। ফলে ব্যস্ত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক দফা যানজটে ঘণ্টারও বেশি সময় চলে যায়। এমনকি, ফুটপাত দখল করে বসা দোকানিদের কারণে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতেও স্বস্তি নেই এই শহরে। কিছুদিন ধরে ফুটপাত দখল মুক্ত করতে পুলিশ চেষ্টা করলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। একদিকে ফুটপাত থেকে দোকানপাট তুলে দিচ্ছে অপরদিকে পুনরায় বসছে। এই অবস্থায় চলছে শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করন অভিযান।

বগুড়া শহরে যানজটের প্রধান কারণ ৫০ হাজারেও বেশি ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশা। এসব অটোরিকশার অদক্ষ চালকরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন শহর ও শহরতলীজুড়ে। তারা মানছেন না কোনো ট্রাফিক আইন। যত্রতত্রভাবে করছে পার্কিং, রং সাইড, রাইট সাইড এবং কোনো সিগন্যালে তোয়াক্কা নেই তাদের। এর আগে ২০২১ সালের শুরুর দিকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো। শুধু পায়ে চালিত রিকশা সাতমাথায় প্রবেশ করতে পারতো। এতে করে সাতমাথা যানজট মুক্ত থাকলেও শহরে প্রবেশের সড়কগুলোতে যানজটে মারাত্মক আকার সৃষ্টি হতো। পরে এক সময় সেই নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয়।

বগুড়া শহরে যানজটের একাংশস্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট জাহানুর রহমান জাকি জানান, বগুড়া শহরের যানজট দিনদিন বেড়েই চলছে। যানজটের কারণে শহরের মধ্যে রাস্তাগুলো দিয়ে পায়ে হেঁটে যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় অফিস আদালত, স্কুল-কলেজগুলোতে সময় মতো শিক্ষার্থীরা পৌঁছাতে পারছে না। ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। এই অসহনীয় যানজটের কারণে বগুড়া শহরবাসীর নাভিশ্বাস উঠেছে। এ যানজট নিরসনের রোজার আগে প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণে মাইকিং করা হলেও তা কার্যকর হয়নি।

পথচারী রেজাদুল হক রেজা জানান, বগুড়া সাতমাথায় যখন যানজট লাগে তখন শহরের ছোট রাস্তাগুলোতে বিভিন্ন যান দিয়ে ভর্তি হয়েছে। তখন এসব ছোট রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটেও চলাচল করা সম্ভব হয় না। প্রায় প্রতিদিনই সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শহরের যানজট থাকে। এ যানজট শহরবাসীকে চরম দুভোর্গ পোহাতে হচ্ছে।

শহরবাসী খলিলুর রহমান জানান, কখনো কখনো সাতমাথায় যানজট নিরাসন করলেও এর আশপাশ রাস্তাগুলোতে যানজটে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় শহরবাসীকে। বগুড়া শহরের যানজট দিনদিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এ যানজট নিরসনে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলে শহরবাসী যানজটের কারণে বাসা থেকে বের হতে পারবে না।

বগুড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) সুমন রঞ্জন সরকার জানান, বগুড়া অনেক বড় শহর। রাস্তার তুলনায় শহরের যান চলাচল বেশি করছে। শহরের মধ্যে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে তার ৪ ভাগের ১ ভাগ যান চলাচল করাতে হবে, তাহলে যানজট হবে না।

বগুড়া পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী বলেন, বগুড়া একটি বৃহত্তর শহর। এ শহরের যানজট নিরসনে পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রোজার আগে শহরের কিছু রাস্তায় কিছু যান চলাচল নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু চালকরা কোনো নিষেধ মানছেন না। তারপরও শহরের যানজট কম রাখার জন্য চেষ্টার ত্রুটি নেই। যানজট নিরসনে ফুটপাতগুলোকে মুক্ত করা হচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় কিন্তু অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে অভিযান চলাকালীন যেটা হয়, ঐ সময় দোকানপাট গুটিয়ে তারা চলে যায়। অভিযান শেষে কিন্তু তারা আবার ফিরে আসার চেষ্টা করে। আমাদের সদর ফাঁড়ি এবং থানা পুলিশ মিলে চেষ্টা করছি।

তিনি আরো বলেন, যানজট মুক্ত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, ফুটপাতগুলোকে দখল মুক্ত করতে হবে। আমাদের কমিটি কাজ করছে। মাসখানেকের মধ্যে রূপরেখা হবে। বিশেষ করে থ্রি-হুইলারগুলোকে কন্ট্রল করা এবং শহরে নির্দিষ্ট সময় সীমার আগে যে বাসগুলো শহরে ঢুকে যায় সেগুলো কন্ট্রল করা এবং দুটো বাইপাস আছে, সেগুলোকে সচল করা হবে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে আশা করছি, শহরের যানজট কমে সহনীয় পর্যায়ে আসবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই/আরআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!