‘সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি হলো যখন নৌবাহিনীর জাহাজ আসলো। অনেক্ষণ পরে, প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পরে নৌবাহিনীর জাহাজ আসল। একটা এয়ারক্রাফট আসল। তখন হঠাৎ পরিস্থিতির পরিবর্তন। পাইরেটসরা (জলদস্যু) খুব ছটফট শুরু করল।’
‘আমাদের খুব রেসট্রিক্টেড করে রাখা হয়। ওয়াশরুমেও যেতে পারছিলাম না। শুয়ে থাকো, দাঁড়ানো যাবে না, বসে থাকো, নড়াচড়া করবে না। অস্ত্র তাক করে রাখে আমাদের দিকে।’
.png)
আবার নৌবাহিনীর জাহাজও বলতেছে, ‘তোমরা থাম। না থামলে আমরা এখনই চার্জ করব। জোর করে তোমাদেরকে থামাব…’। তখন আরেকটা ভীতিকর পরিস্থিতি। এরাও মানতেছে না, ওরাও মানতেছে না। মাঝখানে পড়ে আমরা বলির পাঁঠা।
জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর এক অডিও বার্তায় এভাবেই সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা করছিলেন এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের চিফ অফিসার আতিকউল্লাহ খান।
ভারত মহাসাগর থেকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি হওয়ার পর জাহাজটি তখনও সোমালিয়ার উপকূলে প্রবেশ করেনি। এর আগেই আন্তর্জাতিক নোবাহিনীর একটি জাহাজ সহায়তায় এগিয়ে এলে এমন ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়। ঐ সময়টিতেই সবচেয়ে বেশি কড়াকড়ি আরোপ করে জলদস্যুরা। এক জায়গায় গাদাগাদি করে থাকা বন্দি নাবিকরা তখনই প্রথম গুলির শব্দ শুনতে পান, যা ভীতির মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়।
জাহাজের স্বস্তিকর আবাসের বদলে হুট করেই সবাইকে গাদাগাদি করে এক জায়গায় রাখার বিষয়টি বড় ধাক্কা দেয় নাবিকদের।
আতিকউল্লাহ খান বলেন, ব্রিজে ছিলাম আমরা সবাই। ব্রিজেই থাকতেছি। হঠাৎ করে একটা অন্যরকম পরিস্থিতি আর কি।
তিনি বলেন, জাহাজে আমাদের সবার জন্য আলাদা কেবিন, আলাদা ওয়াশরুম। যেমন আমরা যারা সিনিয়ররা আছি তাদের দুইটা রুম। একটা লিভিং রুম, আবার বেডরুম। মোটামুটি ভাল পরিবেশে আমরা থাকার চেষ্টা করি। হঠাৎ করে আমরা একসাথে ২৩ জন লোক গাদাগাদি করা, ব্রিজের মধ্যে।
ব্রিজে থাকা একটি বাথরুমই ২৩ নাবিক ও ১২ জলদস্যু ব্যবহার করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন আতিকউল্লাহ খান।
‘প্রস্তুত হওয়ার সুযোগও পাইনি’
ঘটনার শুরুর দিকে বর্ণনা দিয়ে আতিকউল্লাহ খান বলেন, আমি জাস্ট ৮টার সময় ডিউটি অফ করে একটু রেস্ট করছিলাম। দ্বিতীয় রোজা ছিল ওইদিন। হঠাৎ করে একটা ওয়ার্নিং দিল ইয়েতে, একটা এনাউন্সমেন্ট। তারপর আমরা বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি করলাম। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাইরেটসরা (জলদস্যু) চলে আসল। হঠাৎ করেই হয়ে গেল আরকি, এরকম একটা অবস্থা। মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগটা পাইনি আমরা।
পাইরেটসরা প্রথমেই একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এটার জন্য আমরা বেশি ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ আমরা জানতাম যে, সোমালিয়ান পাইরেটসরা সাধারণত সি-ম্যানদের তেমন ক্ষতি করে না। স্পেশাল কোনো কারণ ছাড়া। কিন্তু শুরুতে তারা একটু ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তো কীভাবে প্রথম ফেইস করব, এটা নিয়ে সবাই অনেক ভয়ের মধ্যে ছিলাম।
কারণ আমরা শুনেছি, শুরুতে তারা উঠে গোলাগুলি করে। কাউকে মারধর করে। একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য। পরবর্তীতে যাতে আমরা ভয়ের মধ্যে থাকি সবসময়। চিল্লাপাল্লা করতেছিল তারা। বাট আমরা তো খুব একটা বুঝতেছিলাম না। সবাই ভয়ের মধ্যে ছিলাম। আল্লাহ আল্লাহ করতেছিলাম।
তাদের কথামত চালাতে হচ্ছিল জাহাজ
জাহাজটি ছিনতাইয়ের শুরুতে অংশ নেয় ১২ জলদস্যু। তাদের কেউই ইংরেজি বলতে পারতো না। ফলে তাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছিল না নাবিকরা- যোগ করেন আতিকউল্লাহ খান।
তিনি বলেন, শুরুতে ওদের কথা আমরা বুঝতে পারছিলাম না। কারণ ওরা ইংরেজিতে একদম কাঁচা। আমরা তো নরমালি জাহাজ চালাই। আমাদের কথা মত জাহাজ চলে। এখন ওরা আমাদের চালাচ্ছে। ওদের কথা মত জাহাজ চালাতে হচ্ছে। কিন্তু ওদের কথা আমরা বুঝতে পারছিলাম না। এটাও একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। তারপরও সবাই চেষ্টা করছিলাম মানিয়ে নিতে।
তিনি আরো বলেন, শুরুতে ১২ জন পাইরেটস জাহাজটিকে হাইজ্যাক করে। পরবর্তীতে ৬৫ জনের মত ছিল। বাকিরা পরে ধাপে ধাপে আসে, সোমালিয়া পৌঁছানোর পরে। কিন্তু সাগরে ১২ জনই আমাদের অ্যাটাক করে।
‘ঠিক করলাম- পরিবারকে জানাব না’
আতিকউল্লাহ খান বলেন, আমাদের সবার মধ্যে ভয় ছিল পরিবারকে কীভাবে জানাব। এটা কীভাবে ফেইস করব। কারণ কারো পরিবারই এই পরিস্থিতি মেনে নিবে না। আর আমরা কি নিজেকে সান্ত্বনা দিব, নাকি পরিবারকে।
আমি ঠিক করি- পরিবারকে জানাব না। পরিবারকে মেসেজ দিই যে- আমাদের শিপের ওয়াইফাই নষ্ট হয়ে গেছে। দুই তিনমাস হয়ত কথা বলতে পারব না। যাতে করে তারা টেনশন না করে। পরে তারা আস্তে ধীরে জানতে পারলে যা হবার তা হবে।
‘মনে হচ্ছিল- এটাই পরিবারের সাথে শেষ কথা’
জাহাজ দখলে নেয়ার পর নাবিকদের সবাইকে জাহাজের ব্রিজে নিয়ে যায় দস্যুরা। তখনকার পরিস্থিতি বর্ণনা করে চিফ অফিসার বলেন, মোবাইল নিয়ে নিচ্ছিল। তখন আমরা সবাই খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। এখন তো যোগাযোগ শেষ। আর কথা বলতে পারব না পরিবারের সাথে। মনে হচ্ছিল এটাই পরিবারের সাথে শেষ কথা।
নোবাহিনীর জাহাজ আসতেই পাল্টে গেল পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক নোবাহিনীর জাহাজ আসলে হঠাৎ করে গোলাগুলির পরিস্থিতি তৈরি হয়- জানান আতিকউল্লাহ খান। তিনি বলেন, নৌবাহিনীর জাহাজ ওয়ার্নিং দেওয়া শুরু করল, কাউন্টিং শুরু করল যে না থামলে আমরা এখন ফায়ার শুরু করব। দেখি যে হঠাৎ করে ওরা ফায়ার শুরু করল, বাট আমরা দেখতে পারছি না কোথায় ফায়ার করছে। আসলে ফাঁকা ফায়ার করছিল তখন। পাইরেটসরাও টানটান, ওরা মোকাবেলা করবে। ওরা মোকাবেলা মানে আমাদের জিম্মি করে রাখবে এটাই আরকি। আমাদের দিকে অস্ত্র ধরে রাখছে।
একপর্যায়ে জলদস্যুরা এমভি আবদুল্লাহর ক্যাপ্টেনকে দিয়ে নৌবাহিনীকে বার্তা দিল যে, তারা সরে না গেলে নাবিকদের মেরে ফেলা হবে। এরপর ওরা (জলদস্যুরা) ক্যাপ্টেনকে দিয়ে ভিএইচএপে ওদেরকে বলাল যে, তোমরা চলে যাও, নইলে আমাদের মেরে ফেলবে। তখন একটু কান্নাকাটি অবস্থা।
চিফ অফিসার বলেন, তারপর নৌবাহিনী কিছুক্ষণ পর থামছে। এরপরও ওরা আমাদের সাথে সাথেই যাচ্ছিল খুব কাছ দিয়ে। এটাও পাইরেটসরা খুব ইয়ে…। তখন আমাদেরকে তারা রেস্ট্রিক্টেড করে রাখল। আমরা ব্রিজে ঘুমাইলাম।
‘এদিকেও অস্ত্র, ওদিকেও অস্ত্র’
আতিকউল্লাহ খান বলেন, এরকম পরিস্থিতিতে ঘুম তো হওয়ার কথা না। একে তো এমন পরিস্থিতি, আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল না। এদিকে ফিরলেও অস্ত্র। ওদিকে ফিরলেও অস্ত্রসহ পাহারা।
বুঝলাম যে- না, এখন আমরা তো জিম্মি। পরিস্থিতির সাথে কীভাবে মানিয়ে নিব। ওরকম প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম সবাই। আস্তে আস্তে সবাই ইউজ টু হতে লাগলাম। ব্রিজে থাকা, অস্ত্রশস্ত্রের সাথে ঘুমানো।
‘মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকলাম’
আতিকউল্লাহ খান বলেন, যেহেতু আমাদের কোম্পানির একটা জাহাজ আগেও এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল এবং কোম্পানি চেষ্টা করেছিল ওটাকেও তাড়াতাড়ি নিয়ে আসার। সব মিলিয়ে তিন মাসের মাথায় তাদের নিয়ে আসছিল। তাই শুরু থেকে সবাই মোটামুটি এটা আশ্বস্ত ছিলাম, মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যে দুই থেকে তিন মাস। এর আগে তিন মাস লেগেছে। এখনো হয়ত তিন মাস লাগতে পারে বা তার চেয়ে কমও লাগতে পারে। কারণ এখন তো কোম্পানির অভিজ্ঞতা হয়েছে। হয়ত তারা একটু আর্লিও করতে পারে।
তিনি বলেন, সব মিলিয়ে দুই থেকে তিন মাসের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমরা। সেভাবেই সবকিছু সেট করছিলাম। পানি কীভাবে ব্যবহার করব। যেটুকু আছে খাবার এটাকে দিয়ে কীভাবে দুই-তিন মাস চলবে। আমাদের কাছে মোটামুটি এক মাসের ছিল আরকি।
পরে আবার লোকসংখ্যা বেড়ে গেল। সোমালিয়ায় আসার পর আরো পাইরেটস যোগ দিল অনেক। একসাথে সবাই মিলে কম কম করে ব্যবহার করে, ওদের সাথে একটু পরামর্শ করে রেশনিং শুরু করলাম।
‘সময় কাটছিল না কারো’
আতিকউল্লাহ খান বলেন, জাহাজে সাধারণত আমরা কাজের মধ্যেই থাকি। যেহেতু কাজে থাকি আমাদের সময়টা কেটে যায়। এসে পরিবারের সাথে কথা বলি। খাওয়া-দাওয়া করি। আমাদের সময়টা কেটে যায়। আবার বিশ্রাম করি। নরমাল রুটিন এটাই আমাদের। কিন্তু এখন তো পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কাজ নেই। কোনো ডেইলি রুটিন নেই। বসেই থাকা। সময় তো কাটছিলই না। ঘুম হচ্ছিল না ঠিকমত। সব মিলিয়ে আস্তে আস্তে মানসিকভাবে সবার মাথার মধ্যে দুশ্চিন্তা ঢুকতেছিল। কত দিন এভাবে কাটবে, এটারও ঠিক নাই। অনিশ্চিত একটা পরিস্থিতি।
জলদস্যুরা যাতে বিরক্ত কিংবা উত্তেজিত না হয়, সেজন্য তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন নাবিকরা- জানান আতিকউল্লাহ খান।
তিনি বলেন, শুরু থেকে পাইরেটসদের সাথে ভালো ব্যবহার করতাম। কারণ জিম্মি হয়ে গেলে ভালো ব্যবহার করা ছাড়া কিছু করার নেই। হয়ত ভালো ব্যবহার করলে তারা আমাদের একটু সুযোগ সুবিধা দিবে। এটুকু এটলিস্ট আশা করতে পারেন। আর যদি তাদের সাথে ঘাড়ত্যাড়ামি করেন তারা আরও বেশি চাপ দেবে।
তো সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হল- যেন সবাই ওদের সাথে ভালো ব্যবহার করে। দেখি একসময় তারা আশ্বস্ত হল। তখন দেখি তারা দিনের বেলা নামাজ, সেহেরি, ইফতারের জন্য নিচে যেতে দিত।
‘দেশের খবর দেখে আশাবাদী হলাম’
আতিকউল্লাহ খান বলেন, এক নাবিকের লুকানো মোবাইল ফোনে দেশের সংবাদ মাধ্যমে এমভি আবদুল্লাহর ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনার খবর দেখে আশাবাদী হয়ে উঠেন নাবিকরা। এর মধ্যে হঠাৎ করে একজন নিচে গেল কোনো একটা উছিলা দিয়ে। তার কাছে একটা লুকানো মোবাইল ছিল। সেটাতে জাহাজের ওয়াইফাই দিয়ে একটু করে দেখল যে আমাদের ঘটনা অলরেডি সবাই দেশে জানে। মিডিয়াতে বলাবলি করছে। এসে আমাদের বলল। তখন আশ্বস্ত হলাম।
তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের পরিবারের সাথে পুরো বাংলাদেশ কথা বলছে। এমনকি মন্ত্রণালয় থেকেও কথা বলছিল। তো আমরা আশ্বস্ত হলাম যে, আমাদের পরিবার অন্তত সারাদেশকে পাশে পেয়েছে।
ঈদের আগেই মুক্তির আশা ছিল নাবিকদের
দস্যুদের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে কিছু না জানলেও ঈদের আগেই মুক্তি মিলতে পারে, এমনটিই আশা ছিল নাবিকদের। এ প্রসঙ্গে আতিকউল্লাহ খান বলেন, মাঝে মধ্যে শুনতাম যে, ঈদের আগে হয়ে যাবে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর ছিল। অথবা পাইরেটসরা এটা জানত। এরা বলত যে, ঈদের আগে। আমরাও এভাবে আস্তে আস্তে...হলেও হতে পারে। আল্লাহ যদি চায় আরকি। পরে দেখলাম ঈদের আগে হল না। সেটা নিয়েও আমরা আবার অনিশ্চিত। এখন তো ঈদের আগে হল না। তার মানে এটা একটা গুজব ছিল।
অনুমতি নিয়ে নামাজ-রোজা
দস্যুদের অনুমতি নিয়ে নামাজ-রোজাও করেন নাবিকরা। ঈদের নামাজও পরার সুযোগ দেওয়া হয় তাদের- জানিয়ে আতিকউল্লাহ খান বলেন, ওরা তো জানে ঈদ হচ্ছে মুসলমানের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। আর আমরা সবাই রোজা করতাম। নামাজ পড়তাম। তারা জানে আমাদের কালচার। এজন্য ওরা আমাদের পারমিশন দিল ঈদের নামাজ পড়ার। আমরা নামাজ পড়লাম। ওদের পারমিশন নিয়ে একটা ছবি তুললাম। ছবিটা মিডিয়ায় আসছিল। পরে যখন পাইরেটসরা জানল যে, এই ছবিটা মিডিয়াতে এসেছে তখন তারা এটা নিয়ে আমাদের চার্জ করেছিল। আমাদের ওপর একটু কড়াকড়ি করছিল।
চিফ অফিসার বলেন, একদিন পরই দেখতেছি জাহাজের পরিবেশ পরিবর্তন হচ্ছিল। দস্যুদের মুভমেন্ট চেঞ্জ হয়ে গেল। তাদের মধ্যে দেখলাম যে, একটা বাড়ি যাওয়া বাড়ি যাওয়া ভাব আসতেছিল। সবার মধ্যে। তারা খুব উৎফুল্ল। তখন আমাদের মনে হচ্ছিল, সামথিং ইজ গোয়িং টু হেপেন মেবি। মনে হচ্ছিল, তাদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। বা কোনো একটা নেগোসিয়েশন। আমরা তখন খুব রেস্ট্রিক্টেড শেষ কয়েকদিন। খুব কনফিডেনশিয়ালভাবে হচ্ছিল। শুনলাম যে, আজকে পাইরেটসরা চলে যাবে।
শেষ মুহূর্তে চাপা উত্তেজনা
মুক্তির আগে সেই চাপা উত্তেজনা নির্ঘুম করে দিয়েছিল নাবিকদের। তিনি বলেন, আগে ঘুম যা-ও হইত দুয়েক ঘণ্টা দিনের বেলা। রাতে তো ঘুম হত না কারোরই। উত্তেজনায় সেটাও মোটামুটি ইয়ে হয়ে গেছে। কারণ উত্তেজনা, পাইরেটসরা চলে যাবে। তাদের চেঞ্জেস দেখে আমাদের মধ্যে খুব এক্সাইটমেন্ট কাজ করতেছিল। পরে এভাবে আস্তে আস্তে সকাল থেকে যাবে যাবে করতে করতে আস্তে আস্তে রাত ১২টার দিকে তারা গেল আরকি। পাইরেটসরা যাবার সাথে সাথে আমাদের মাথা থেকে এক জাহাজ পরিমাণ যে বোঝা ছিল ওটা নেমে গেল হঠাৎ করেই। এক মাসের একটা রুটিন ছিল একরকম। মেন্টালি প্রেশারাইজড ছিলাম। এখন আস্তে আস্তে..।
মুক্তির পরও পিছু ছাড়ছে না আতঙ্ক
দস্যুদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর গন্তব্যস্থল আরব আমিরাতের আল হামরিয়া বন্দরের দিক এগিয়ে যাচ্ছে এমভি আবদুল্লাহ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অপারেশন আটলান্টার যুদ্ধ জাহাজের প্রহরার পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে জাহাজের অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। তবু যেন আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না নাবিকদের।
এ প্রসঙ্গে চিফ অফিসার বলেন, আমরা এখনো হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠলে মনে হয় দুঃস্বপ্ন দেখেছি। মনে হয় পাইরেটসরা এখনো আছে। তাড়াতাড়ি ব্রিজে যাই, দেখি যে ওরা আছে কিনা, ও নাই। রেস্ট্রিকশন তাদের ছিল যে, এর বাইরে যাওয়া যাবে না। গিয়েই দাঁড়াই যাই।
তিনি বলেন, পাইরেটসরা তো আমাদের এর বাইরে যাওয়ার জন্য নিষেধ করত। এর বাইরে যেতে গেলে আমাদের মধ্যে ভয়টা এখনো কেটে ওঠেনি। দুয়েক দিনের মধ্যে হয়ত ইনশাল্লাহ অ্যাডজাস্ট করে নিতে পারব। আস্তে আস্তে রিবিল্ট করার চেষ্টা করছি। জাহাজকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সবকিছু মেনটেইন করার চেষ্টা করছি। সব মিলে আমরা রিলিফড। আলহামদুল্লিাহ, শুকরিয়া আল্লাহর কাছে। এত কম সময়ে হবে আমরা কেউ কল্পনা করিনি।
‘সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা’
জিম্মি দশা থেকে মুক্তির জন্য সরকার, জাহাজের মালিকপক্ষ ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আতিকউল্লাহ খান।
তিনি বলেন, এরকম একটা ব্যাপার যখন দেখলাম তখন অনেক ইমোশন কাজ করেছে আমাদের মধ্যে। দেশের মানুষ যে ভালোবাসা দেখিয়েছে, চিরজীবন আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। এটা আমাদের সারাজীবনের প্রাপ্তি যে- পুরো দেশের মানুষ আমাদের জন্য দোয়া করেছে।