উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, পুরো উপজেলায় প্রায় ৮ শতাধিক পাহাড়-টিলা রয়েছে। ধীরে ধীরে সবগুলো টিলা বাগানের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে টিলার মালিকদের সঙ্গে আলাপ চলছে। তাদের উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে উপজেলার ৪০টি পাহাড়-টিলায় গড়ে উঠেছে আনারসের বাগান। আনারসের সঙ্গে মাল্টা, কাজুবাদাম, কফি, কমলা ও লেবুর চাষ হচ্ছে বাগানে। এসব বাগানে হরমোন ও ভিটামিনের ব্যবহার ছাড়াই আনারস উৎপাদন হচ্ছে।

.png)
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাশরেফুল আলম জানান, কৃষি বিভাগ চেষ্টা করছে এই উপজেলাকে পুরোপুরি কৃষি পর্যটন উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আনারস বাগান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সারাদেশে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। পর্যটকরা নানা জায়গা থেকে প্রতিদিন বাগান দেখতে আসেন। এলাকার কৃষক ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছর জেলার ১৯৬ হেক্টর জমিতে ৪৪টি বাগানে ১ হাজার ৬১০ মেট্রিক টন আনারস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন আনারস। এছাড়াও আনারস বাগানে মাল্টা, লেবু, কফি ও কাজুবাদামের আবাদ করা হয়েছে।
তথ্যমতে, সিলেটে অন্তত ২ হাজার ৬৬টি পাহাড়-টিলা রয়েছে। এসব টিলা লেবু, কমলা জাতীয় ফসল, কফি, কাজুবাদাম ও আনারস চাষের জন্য বেশ উপযোগী। পতিত বা অনাবাদি টিলাগুলোতে ফসল উৎপাদনে কৃষি বিভাগ এসব টিলার মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজ নিজ টিলাগুলো আবাদযোগ্য করার অনুরোধ জানাচ্ছে। অনেকে সাড়াও দিচ্ছেন। কৃষি বিভাগ আগ্রহীদের পরামর্শের পাশাপাশি নানাভাবে সহযোগিতা করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সিলেটের উপপরিচালক মোহাম্মদ খয়ের উদ্দিন মোল্লা বলেন, সিলেট অঞ্চলের সকল টিলা-পাহাড়কে ফলের টিলায় পরিণত করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। এতে কৃষি পর্যটন বৃদ্ধি হবে; স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়বে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন ফলের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে; ফলে আমাদের ফল আমদানি কমবে।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার দত্তরাইল গ্রামে ভাই ভাই আনারস বাগানে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা গাছ থেকে আনারস কেটে নিচে নামাচ্ছেন। টিলার কোথাও-কোথাও আনারস কেটে স্তূপ করে রেখেছেন শ্রমিকরা। আর সেখান থেকে কেউ কেউ কিনে ব্যাগ ভরে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে।
ভাই ভাই আনারস বাগানের মালিক মো. শাহজাহান আহমদ জানান, ১২ কেদার টিলায় রোপণ করেছেন সিলেটের স্থানীয় জলঢুপি আনারস। হরমোন আর ভিটামিন মুক্ত এ অনারস প্রচুর মিষ্টি। এজন্য প্রতিদিনই ক্রেতার সমাগত বাড়ছে। গত বছর প্রায় ২০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করেছি; এ বছর আশা করছি ৩০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি হবে।
বাগানে আনারস কিনতে আসা নুর মিয়া জানান, জলঢুপি আনারস আমাদের অঞ্চলে খুব পরিচিত। এই আনারস খেতে মিষ্টি হয়। এলাকায় যাদের টিলা রয়েছে তারা অনেকে বাগান চালুর উদ্যোগ নিচ্ছেন। কারণ এতে ফসল উৎপাদন ও পর্যটন বাড়বে। একই সঙ্গে টিলার মালিকরা লাভবান হবেন।

ভাই ভাই আনারস বাগানের অদূরে ১২০ কেদার টিলা-পাহাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন চাঁন মিয়া পাইনাপেল গার্ডেন। উপজেলায় সবচেয়ে বড় আনারস বাগান এটি। এই বাগানে আড়াই লাখ আনারসের গাছ লাগানো হয়েছিল ২০১৮ সালে। সঙ্গে আছে মাল্টা, লেবু, কাজুবাদাম ও কফি গাছ। দর্শনার্থীদের জন্য একটি টিলার চূড়ায় তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন পার্ক, ওয়াকওয়ে ও বসার জায়গা। ৩০টাকা মূল্যের টিকিট কেটে এই বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ভিড় করেন ভ্রমণপ্রেমীরা।
চাঁন মিয়া পাইনাপেল গার্ডেনের পরিচালক কাউসার রেজা জানান, বাগান তৈরি করতে তাদের প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল; তবে সেই টাকা উঠে গেছে। বাগানে আনারসের পাশাপশি আড়াই হাজার মাল্টা গাছ, আড়াই হাজার লেবু, এক হাজার ৫০০ কাজুবাদাম, ৫০০ কমলা গাছ, ৭০০ আম গাছ, পেয়ারা ২০০ গাছ, বড়ই গাছ ৫০টা, কলাগাছ ৫০০ ও বিভিন্ন জাতের ফলের গাছ আছে ৩০০টি।
তিনি আরো বলেন, বাগানে রেগুলার ১০ জন আর সিজন টাইমে ৪০ থেকে ৫০ জন লোক কাজ করে। সারাবছরই পর্যটক আসেন বাগানের সৌন্দর্য দেখতে। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার পর্যটক বাগান দেখতে আসেন।