ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

উৎকোচের বিনিময়ে বনাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ, হুমকিতে জীববৈচিত্র

সুজন সেন, শেরপুর
প্রকাশিত: ১৮:৪৭, ১২ জুন ২০২৪
উৎকোচের বিনিময়ে বনাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ, হুমকিতে জীববৈচিত্র
চার হাজার টাকার বিনিময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছেন শেরপুরের বনাঞ্চলের জমির অবৈধ দখলদাররা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ
  • নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গারো পাহাড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ
  • অর্থের বিনিময়ে বনের ভেতরে অবৈধ ঘরবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের একটি অসাধুচক্র
  • বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে জমির কোনো কাগজপত্র লাগে না।
  • বালিজুড়িতে ৪৩৭ একর, রাংটিয়ায় ১৩৯৬ একর, মধুটিলায় ৫৭৭ একর ভূমি বেদখল

ভোটার আইডি কার্ড ও চার হাজার টাকার বিনিময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছেন শেরপুরের বনাঞ্চলের জমির অবৈধ দখলদাররা। 

স্থানীয়রা বলছেন, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের একটি অসাধুচক্র কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গারো পাহাড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে যাচ্ছে। ফলে বন্য প্রাণী ভীত হয়ে নিজেদের আবাসস্থল হারিয়ে প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে। ঘটছে প্রাণহানির মতো ঘটনা।

অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃক্ষের নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে জেলা বন বিভাগ।

Advertisement

বনবিভাগের তথ্যমতে, জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তজুড়ে গারো পাহাড়। এই তিন উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে বেদখল হয়ে আছে প্রায় আড়াই হাজার একর ভূমি। তিনটি রেঞ্জের মধ্যে বালিজুড়িতে ৪৩৭ একর, রাংটিয়ায় ১৩৯৬ একর, মধুটিলায় ৫৭৭ একর ভূমি বেদখল রয়েছে।

ঝিনাইগাতীর গজনী এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আতাউর রহমান বলেন, এক সময় পাহাড়জুড়ে দেখা যেতো বহু টিলা। সে সময় বনের ভেতরে বিভিন্ন বন্য প্রাণী ছিল। এক পর্যায়ে মানুষজন টিলা কেটে ঘরবাড়ি তৈরি করে চাষাবাদ শুরু করে। এর ফলে সংকুচিত হয়ে আসে বনের জমি। এভাবে কেউ ৩০ বছর কেউবা ৪০ বছর ধরে অবৈধভাবে বসবাস করছেন। 

শিক্ষক আতাউর রহমান আরো বলেন, দখলদাররা প্রথমে পাহাড়ি টিলা কেটে ও জঙ্গল পরিষ্কার করে ছোট পরিসরে ঘর তোলেন। পরে ধীরে ধীরে অবৈধ বসতির সম্প্রসারণ করতে থাকেন। তারা কোনো নিয়ম না মেনে অর্থের বিনিময়ে বনের ভেতরে অবৈধ ঘরবাড়িতে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে বসবাস করছেন। 

সাইফুল ইসলাম নামে একজন বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের একটি অসাধুচক্র কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে উৎকোচের বিনিময়ে গারো পাহাড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে বনের ভেতরের অংশ আলোকিত থাকায় বন্য প্রাণীরা ভীত হয়ে পড়ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে বন্য প্রাণী।

একদিকে বন উজাড়, অন্যদিকে বিদ্যুতের আলো এসব কারণে বন্য প্রাণীরা দিশেহারা হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। হাতির তাণ্ডবে প্রায়ই মানুষ মারা যাচ্ছে। এছাড়া বনের মধ্যে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বন্য হাতিরও মৃত্যু ঘটেছে। 

ঝিনাইগাতীর পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা সুবল মারাক বলেন, কারেন্টের লাইন পেতে জমির কোনো কাগজপত্র লাগে না। শুধু ন্যাশনাল আইডি কার্ড আর ছবি লাগছে। ৪ হাজার টাকা এবং ঐসব কাগজপত্র দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে খুঁটি পুঁতে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে গেছে।

শ্রীবরদীর বালিজুড়ি এলাকার বাসিন্দা অমিত বলেন, বর্তমানে পাহাড়ে তেমন গাছগাছালি নেই, পাহাড়ে বড় টিলাও নেই। তাহলে পাখপাখালি কোথায় থাকবে, থাকার তো আর জায়গা নেই। তাই থাকে না। 

অমিত আরো বলেন, বনের মধ্যে তেমন খাবারও নেই। হাতি আসে, কিন্তু এক জায়গায় থাকে না, এদিক সেদিক যায়। জায়গা তো নেই, থাকবে কোথায়। 

একই এলাকার বাসিন্দা অবনিদ্র মারাক বলেন, সরকারি খাস জমিতে থাকি, তাই জমির কাগজ নেই। বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন প্রতি বাড়ি বাড়ি লিস্ট করেছে আর প্রতি বাড়ি থেকেই চার হাজার টাকা করে নিয়েছে। পরে কারেন্ট এসেছে। কাগজপত্রও লাগে না, কিছুই লাগে না।

নালিতাবাড়ীর পানিহাটা সীমান্তের বাসিন্দা অবিনাশ হাজং বলেন, আমাকে মিটার দেওয়া হয়েছে। আমার তেমন কোনো কাগজপত্র নেয়নি। ভোটার আইডি কার্ড ও চার হাজার টাকা লাগছে। এখন পাহাড়ের ভেতর আলোকিত হয়েছে। আগে তো অন্ধকার ছিল। এখন সব জায়গায় কারেন্ট আছে।

একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতা মেরাজ উদ্দিন বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিদ্যুৎ বিভাগ বনবিভাগের কোনো অনুমতি ছাড়াই বনে অবৈধভাবে গড়ে উঠা ঘরবাড়িতে সংযোগ দিচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বনে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে হাতি এবং অন্যান্য প্রাণীর অভয়ারণ্য গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের ট্রেইনার আদনান আজাদ বলেন, ২০-২৫ বছর আগেও গারো পাহাড় ছিল ডিপ ফরেস্ট। কিন্তু ধীরে ধীরে বন দখল হওয়ায় আজ বনে বন্যপ্রাণীদের আবাস হুমকিতে পড়েছে। অনেক প্রাণী টিকে না থাকতে পেরে চলে গেছে। এটা আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি। বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে হাতি মেরে ফেলা হচ্ছে। এর দায় বিদ্যুৎ বিভাগ এড়াতে পারে না।

রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা করিম মিয়া বলেন, বনের ভেতরে অবৈধ বসবাসকারীরা বিদ্যুতের লাইন নিয়েছে। তারা কীভাবে বিদ্যুতের লাইন পেল, সেটা আমরা জানি না। বিদ্যুতের লাইন নিতে হলে বসবাসকারীদের জমির মালিকানার দলিলসহ আরো অনেক কাগজপত্র দিতে হয়। কিন্তু যারা পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস করছেন তারা তো জমির কাগজপত্র দিতে পারবে না, জমি তো সরকারি। বিদ্যুৎ বিভাগের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংযোগ দেয়নি। বনের ভেতরে বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে বলে জানান অতি সম্প্রতি বদলি হওয়া জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আলী হোসেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: শেরপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!