সিন্ডিকেটের কবজায় ট্রেনের টিকিট
ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট কালোবাজারিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট চক্র। এতে জিম্মি হয়ে পড়েছে এই রেলপথের সাধারণ যাত্রীরা। অভিযোগ উঠেছে, সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে টিকিট কালোবাজারিতে জড়িত স্টেশনের অসাধু কর্মচারীরাই।
স্থানীয় রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রতিদিন ময়মনসিংহ রেলপথে আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে আটটি। এগুলো হলো- তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, অগ্নিবীণা, হাওড়, জামালপুর, মোহনগঞ্জ ও বিজয় এক্সপ্রেস। এসব ট্রেনে যাতায়াত করতে স্টেশনে প্রতিদিন যাত্রী থাকে কমপক্ষে এক হাজার। এর বিপরীতে সিটসহ টিকিট পায় মাত্র ২৩৭ জন। আর সিট ছাড়া কাউন্টারে টিকিট বরাদ্দ রয়েছে প্রায় সাতশ। প্রতিদিন ২৩৭টি সিটের জন্য অনলাইনে পাওয়া যায় অর্ধেক টিকিট এবং বাকি অর্ধেক পাওয়া যায় কাউন্টারে। সারাবছর এই নিয়মে টিকিট বিক্রি হলেও ঈদ উপলক্ষে শতভাগ সিটসহ টিকিট বিক্রি হয় অনলাইনে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিটসহ বিক্রি হওয়া টিকিটগুলোর বেশিরভাগই কবজায় নেয় কালোবাজারি চক্র। স্টেশন কর্মচারীরাদের বেশ কয়েকজন এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারাই এই কালোবাজারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিভিন্ন কায়দায় স্টেশনের কাউন্টার থেকে এসব টিকিট কালোবাজারিদের হাতে পৌঁছে দিয়ে অবৈধ পথে হাতিয়ে নিচ্ছেন অর্থ। সিট পাওয়া টিকিটগুলো কবজায় নিতে রেলওয়ের অসাধু কিছু কর্মচারী দায়িত্বপালনের সময় কাউন্টারে টিকিট কাটতে আসা সাধারণ যাত্রীদের মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংগ্রহ করে।
.png)
এরপর এগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত করে নিজেদের কাছে রেখে দেন। সময় সুযোগ বুঝে সাধারণ যাত্রীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন গন্তব্যের ভিন্ন ভিন্ন ট্রেনের টিকিট কেটে নিজে বাইরে গিয়ে পূর্ব পরিচিত দালাল ও কালোবাজারিদের কাছে সরবরাহ করেন। টিকিট বিক্রির লভ্যাংশ বিকাশ ও নগদ অ্যাপসের মাধ্যমে বুঝে নেন।
স্টেশনে সরেজমিনে দেখা যায়, অনলাইনে টিকিট না পেয়ে অনেকে আসছেন কাউন্টারে। সেখানে টিকিট কাটতে পারলেও পাওয়া যাচ্ছে না সিট। তবে কাউন্টারের একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেই কালোবাজারি সিন্ডিকেট চক্রের লোকজন এসে বলছেন- নিজের জন্যেই কেটেছিলেন টিকিট। তবে ব্যক্তিগত কারণে যাবেন না। কোনো যাত্রী বেশি টাকা দিলেই সিট পাওয়া যাবে এমন টিকিট বিক্রি করা হবে। টিকিট পাওয়া আর না পাওয়া মিলিয়ে স্টেশনে হাজারো যাত্রী অপেক্ষা করছেন ট্রেনের জন্য। ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গেই লাফালাফি করে উঠছেন যাত্রী।
যাত্রীরা জানান, অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ফলে শত শত যাত্রী ভিড় করেন কাউন্টারে। সেখানে মোট সিট থাকার অর্ধেক টিকিট বিক্রির কথা থাকলেও পায় হাতেগোনা কয়েক যাত্রী। ফলে বাধ্য হয়ে সিট ছাড়া টিকিট কিনে গন্তব্যে যেতে হয়। কখনো কখনো সিট পাবেন না এমন টিকিটও পাওয়া যায় না। তবে কাউন্টারের বাইরে গিয়ে চাহিদামতো টাকা দিলেই কালোবাজারি চক্র সিট পাওয়া যাবে এমন টিকিট দিচ্ছে।
সোহানুর রহমান নামে এক যাত্রী বলেন, আমি ট্রেনে যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কিন্তু টিকিট কালোবাজারি চক্র আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে অনেক টিকিট তারা কেটে নেয়। ফলে আমার মতো অনেক সাধারণ যাত্রীরা অনলাইনে টিকিট কিনতে পারে না। কাউন্টারেও ঠিক একই অবস্থা।

আরেক যাত্রী আজিজুল হক বলেন, সিটসহ টিকিটই পাওয়া বর্তমান সময়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেট চক্রের কারণেই এটি হয়েছে। মনে হচ্ছে, সিন্ডিকেট চক্রের কাছে আমরা জিম্মি হয়ে গিয়েছি।
জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নুরুল আমিন কালাম বলেন, হঠাৎ করে একদিন অভিযান চালিয়ে দীর্ঘদিন অভিযান চালানো হয় না। ফলে দিন দিন সক্রিয় হয় উঠছে টিকিট কালোবাজারি চক্রগুলো।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন সুপারিনডেন্ট মো. নাজমুল হক বলেন, এটি আমি একা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। তবে রেলওয়ের কোনো কর্মচারী যেনো এই কাজের সঙ্গে জড়িত না হয়, সেজন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় রেলওয়ে থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কালোবাজারি চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতে চেষ্টা চালাচ্ছি। কারণ আমরা চাই, তারা আইনের আওতায় আসুক।
ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. ফারুক হোসেন বলেন, রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হবে। কালোবাজারে টিকিট বিক্রির প্রমাণ মিললে গ্রেফতার করে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে।
জানা যায়, সবশেষ চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে স্টেশনে অভিযান চালিয়েছিল পুলিশ। এ সময় রেলওয়ের কর্মচারী (বুকিং সহকারী) মো. রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতাররকরা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় কালোবাজারির ১২টি টিকিট, কালোবাজারির ৫ হাজার ১০০ টাকা, দুটি মোবাইল, সাধারণ যাত্রীদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সম্বলিত তালিকা। যাত্রীদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর সাদা কাগজে সংরক্ষণ করে টিকেট সংগ্রহ করে কালোবাজারে বিক্রি করতেন রফিকুল। এরপর থেকে আর অভিযান চালানো হয়নি।