রোববার (২৫ আগস্ট) ফেনীর লালপোল এলাকায় বাবা শহীদুল ইসলামের লাশ সামনে রেখে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন আবদুর রহিম। তাকে ঘিরে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্থানীয় কয়েকজন। খবর পেয়ে ছুটে আসলেন শহিদুল ইসলামের আরেক ছেলে সাইফুল ইসলাম। বাবাকে হারিয়ে দুই ভাইয়ের কান্নায় তখন ভারী হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ। অসুস্থ বাবাকে বন্যার পানির স্রোতে হারিয়ে ফেলেছিলেন তার সন্তান।
সাইফুল ইসলাম জানান, ক্যান্সার আক্রান্ত ষাটোর্ধ্ব শহিদুল ইসলামকে চিকিৎসা নিয়ে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম থেকে ফিরেছেন তার ভাই আবদুর রহিম। ওইদিন সন্ধ্যায় তারা বাড়ি নোয়াখালী ফেরার পথে বন্যার কারণে ফেনীর লালপোলে নেমে যান। সেখানে ছেলের হাত ধরেই সেই স্রোত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বৃদ্ধ শহিদুল ইসলাম। কিন্তু স্রোতের তোড়ে শেষ পর্যন্ত রহিম বাবার হাত ধরে রাখতে পারেননি। রহিমের চোখের সামনেই বানের পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায় বৃদ্ধ বাবাকে। এরপর থেকে বাবাকে লালপোলের বিভিন্ন এলাকায় পাগলের মতো খুঁজেছেন রহিম। চার দিনের মাথায় পেলেন বাবার লাশ।
.png)
সাইফুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাবাকে উদ্ধার করতে গত তিন দিনে অনেকের সাহায্য চেয়েছি, কিন্তু কাউকে পাইনি। আজ পেলাম বাবার লাশ।’
বাবা হারানো আবদুর রহিম বলেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে বাবাকে নিয়ে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। ফেরার পথে পড়ে গেছি বানের স্রোতে। বাবাকে শক্ত করে ধরে লালপোল এলাকা অতিক্রম করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পানির স্রোত আমার হাত থেকে বাবাকে ছিনিয়ে নেয়। বাবার এমন চলে যাওয়া মানতে পারছি না কিছুতেই।
বোগদাদিয়া হাইওয়ে থানার ওসি রাশেদ চৌধুরী জানান, শহিদুল ইসলাম নামে যে ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেছে, তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বার গ্রামে।
এদিন লালপোল এলাকায় ভেসে এসেছে অজ্ঞাত আরেকটি শিশুর লাশ। আর একই স্থানের কয়েক কিলোমিটার দূরে পানিতে পড়ে নিখোঁজ ভাই কালাচান কর্মকারকে খুঁজছিলেন পলাশ কর্মকার। তিনি জানান, ফেনীর ছাগলনাইয়ার শান্তিরহাট বাজারে স্বর্ণের দোকান আছে তাদের। দোকানের স্বর্ণ নিরাপদ স্থানে রাখতে গিয়ে চার দিন আগে বন্যার পানিতে নিখোঁজ হন কালাচান। দিগ্বিদিক ঘুরেও গত চার দিনে ভাইয়ের কোনো হদিস পাননি।
ফেনীতে স্মরণকালের এই ভয়াবহ বন্যায় ঠিক কতজন মারা গেছেন কিংবা নিখোঁজ রয়েছেন, তার হিসাব এখনো জেলা প্রশাসনসহ কোনো কর্তৃপক্ষের কাছেই নেই। তবে কালাচানের মতো স্বজনদের খোঁজে পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়াসহ গোটা ফেনী জেলার অনেক মানুষ রয়েছেন বলে জানা গেছে।বন্যায় যারা পানিবন্দি হয়ে আছেন, তারাও কাটাচ্ছেন অবর্ণনীয় ভোগান্তি।
ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার মধুগ্রামের নেপাল কর্মকার জানান, পরিবারের ৮ সদস্য নিয়ে গত বুধবার রাত থেকে বাড়ির ছাদে আটকে আছেন। বন্যার পানিতে তান তিনটি গরু ভেসে গেছে। গত চারদিনে তারা কোনো ত্রাণ পাননি। এক আত্মীয় নৌকা নিয়ে এসে কিছু শুকনো খাবার ও পানীর বোতল দিয়ে গেছে।
ফেনী জেলা প্রশাসক শাহীন আরা জানান, এই পর্যন্ত একজনের মৃতুর খবর তার জানা আছে। নিখোঁজ ও মৃতদের বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছে প্রশাসন।