এরমধ্যে কৃষিতে ক্ষতি হয়েছে ৩৫ কোটি ৮৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মৎস্য খাতে ১২ কোটি ৬৮ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ও প্রাণিসম্পদ খাতে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ক্ষতি হয়। যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক, মৎস্য চাষি ও খামারিরা। সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলার ৯৮.০৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে মোট গ্রাম রয়েছে ১৩০টি। এরমধ্যে ছোট বড় পুকুরসহ প্রজেক্ট রয়েছে ২৩৪৮টি, বিল রয়েছে ১৩টি, নদী ৩টি, খাল ৩টি ও প্লাবণ ভূমি রয়েছে ৮টি।
.png)
বন্যায় পৌর শহরসহ উপজেলায় প্রায় ৪৩০টি ছোট বড় পুকুর পানিতে তলিয়ে ভেসে গেছে ৪৫৬.৭৯০ টন মাছ। এরমধ্যে পোনা মাছ রয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ। বড় মাছের মূল্য ধরা হয়েছে ৯ কোটি ১৩ লাখ ৫৭ হাজার, পোনা মাছ ৩ কোটি ৪৫ লাখ এবং অবকাঠামো ১০ লাখসহ মোট ১২ কোটি ৬৮ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ক্ষতি হয়।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। রোপণকৃত জমির মধ্যে ব্রি-৭৫,৮৫,৮৭, ৯৩, ৯৫, ৯৬, ৯৭ ও ১০৩ জিআর-২২ সহ নানা জাতের উন্নত ফলনশীল ধান রয়েছে। কিন্তু অব্যাহত বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও হাওড়া বাঁধ ভেঙে ১৯৬৫ হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। এরমধ্যে রোপা আমন ১৭৭০ হেক্টর, সবজি ৭৫ হেক্টর ও বীজতলা ১২০ হেক্টর রয়েছে। যা ক্ষতির পরিমাণ ৩৫ কোটি ৮৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত খামার সংখ্যা হলো ২৭৮টি। এরমধ্যে গবাদিপশুর খামার রয়েছে ২৫৩টি হাঁস-মুরগির খামার ২৫টি। ক্ষতিগ্রস্ত গবাদিপশু ও পাখির সংখ্যা হলো- গরু ৬৯০০টি, মহিষ ৭৫টি, ছাগল ১৩৫০টি, ভেড়া ২০০টি, মুরগি ৪০৫০০টি ও হাঁস ৮৯৫০টি রয়েছে। মৃত গবাদিপশু ও পাখির সংখ্যা হলো গরু ৬৫টি, ছাগল ৯৫টি, ভেড়া ১৫টি, মুরগি ৫৫০০, হাঁস ১০৫০টি। প্রাথমিকভাবে প্রাণিসম্পদ বিভাগে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকারও বেশি। যা আরো বাড়তে পারে।
সরেজমিনে উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে দেখা গেছে, জমি থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে মাচা থাকলেও নেই সবুজ গাছ। পানি সরে গিয়ে ভেসে উঠছে আমন জমি, আগাম বিভিন্ন সবজির ক্ষেত আর পুকুর। বেশির ভাগ জমি পানির নিচে থাকার কারণে নষ্ট হওয়ার পথে।
কৃষকরা নতুন করে আবাদ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কায় পড়েছেন। একইভাবে পুকুর থেকে মাছ ভেসে যাওয়ায় মৎস্য চাষিদের চোখে মুখে রয়েছে অন্ধকারের ছাপ। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরে গিয়ে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। ধার-দেন করে অনেকেই মৎস্য চাষ করেছেন। বন্যায় এতো বড় ক্ষতি হওয়ায় এখন কিভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন তা নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
উপজেলার বঙ্গেরচর গ্রামের মো. ইসহাক মিয়া বলেন, গত কয়েক বছর ধরে গরু পালন করছি। পাশাপাশি শখের বসে হাঁস-মুরগি পালন করছি। খামারে থাকা ১৮টি গরুর মধ্যে বন্যায় আমার ৩টি গরু মারা গেছে। তাছাড়া ৫০টির ওপর হাঁস ও মুরগি ভেসে যায়। বন্যায় আমার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
পৌর শহরের তারাগন এলাকার মো. টিপু চৌধুরী বলেন, বাড়ি সংলগ্ন বড় একটি মৎস্য প্রজেক্ট রয়েছে। বছরে কোটি টাকার ওপর মাছ বিক্রি হয়। বন্যায় প্রজেক্ট পানিতে তলিয়ে গিয়ে মাছ ভেসে গেছে। এখন চোখের সামনে মানুষ জাল দিয়ে মাছ ধরছে। আমরা কিছুই করতে পারছি না। এ বন্যায় আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেল। এখন কি করব বুঝতে পারছি না।
একই এলাকার মো. নান্টু মিয়া বলেন, একটি পুকুরে দেশীয় নানা জাতের মাছের পোনা ছাড়া হয়। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর হাওড়া বাঁধ ভেঙে পুকুর তলিয়ে সব মাছ ভেসে গেছে। আমার প্রায় ২ লাখ টাকার ওপরে ক্ষতি হয়েছে।
মোগড়া এলাকার মো. ফরিদ মিয়া বলেন, ছোট বড় মিলে পাঁচটি পুকুরে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ ছিল। এই বন্যায় সব মাছ ভেসে খাল বিল জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই বন্যায় আমার বড় ধরনের ক্ষতি হলো।
উপজেলার মোগড়া গ্রামের কৃষক মো. আবু জাফর মিয়া বলেন, বাড়ি সংলগ্ন জমিতে বেগুন, শসা, লালশাক আবাদ করেছি। সেইসঙ্গে ৬ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করি। কিন্তু বন্যায় সব তলিয়ে গেছে।
কৃষক মো. জমির খাঁন বলেন, চলতি মৌসুমে আমন ধান আবাদ করতে ৬ বিঘা জমি প্রস্তুত করি। এরমধ্যে ৪ বিঘা জমিতে আমন ধানের চারা লাগানো শেষ হয়। দু’এক দিনের মধ্যে বাকি জমি চারা লাগানোর কথা ছিল। কিন্তু বন্যায় আমার সব জমি বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে চারা লাগানো জমি। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।
আখাউড়া উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, এরই মধ্যে প্রাথমিকভাবে একটি ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এগুলো সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। এরপরও আমরা এলাকায় খোঁজ খবর নিচ্ছি।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাসসুম বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এই উপজেলায় ১৭৭০ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এরই মধ্যে জমি থেকে পানি সরে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হয়েছে।
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাজালা পারভীন রুহি বলেন, এ উপজেলায় বন্যার পানি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। বন্যার্তদের বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।