জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরা তাদের বেতন, বোনাস এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আদায়ের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনটি কারখানার স্থায়ী ও অস্থায়ীসহ সব শ্রমিকের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং কর্মবিরতি আকারে রূপান্তরিত হয়। শ্রমিকদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- প্রোডাকশন বোনাস, হাজিরা বোনাস, নাইট বিল, টিফিন বিল, কাজের মজুরি বৃদ্ধি এবং ছুটির দিনে কাজ করলে আলাদা বোনাস দেওয়া।
স্থানীয় ও আন্দোলনরত শ্রমিকদের সূত্রে জানা যায়, কারখানার শ্রমিকেরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন-ভাতা ও কাজের মজুরি বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন। শ্রমিকেরা তাদের দাবিগুলো নিয়ে বেশ কয়েকবার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, কিন্তু কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। অবশেষে তারা তীব্র আন্দোলনে নেমে আসেন।
.png)
বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যা শুক্রবার ও শনিবার পুরো কারখানা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার সকাল থেকে শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে দেন এবং কারখানার গেটে বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভের মধ্যে তারা ৮ দফা দাবি উত্থাপন করেন, যা তাদের অতিরিক্ত মজুরি, বোনাস এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করে ছিল।
আরো জানা যায়, শনিবার ইকো নিটস কারখানার হেড অফ অপারেশন এন কে সানজিনাইওয়ালা শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান বের হয়নি। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কিছু শ্রমিক ভাঙচুর শুরু করে। উত্তেজিত শ্রমিকেরা কারখানার বিভিন্ন সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেন এবং একপর্যায়ে কারখানার হেড অফ অপারেশন এন কে সানজিনাইওয়ালাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন। তাকে মারধর করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে কারখানার চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
রোববার সকালে শ্রমিকেরা পুনরায় কারখানায় ফিরে এসে কর্মবিরতি পালন করেন এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এ সময় কালিয়াকৈর থানা পুলিশ ও শিল্প পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। কারখানার এমডি কাজী আরহাফ নিজে উপস্থিত থেকে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনায় বসেন এবং তাদের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আহ্বান জানান। কিছু শ্রমিক তার আহ্বান মেনে কাজ শুরু করলেও অন্যরা নতুন দাবি উত্থাপন করে এবং কর্মবিরতি চালিয়ে যায়।
এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের মধ্যেই বিভক্তি দেখা দেয়। যারা কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন, তাদের ওপর বাকি আন্দোলনকারী শ্রমিকেরা হামলা চালান। এই সংঘর্ষে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও হিমশিম খায়। ক্রমেই পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীর সহায়তা চায়। মৌচাক স্কাউট জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প এবং সাভার সেনানিবাস থেকে প্রায় শতাধিক সেনা সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। শ্রমিকদের অধিকাংশই কাজে যোগ দিয়েছেন এবং কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের দাবি-দাওয়া সমাধানের চেষ্টা চলছে।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় ইকো নিটস কারখানার এমডি কাজী আরহাফ বলেন, আমরা শ্রমিকদের দাবি নিয়ে আলোচনা করছি এবং তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নেয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক রয়েছি। আমরা চাই সবাই শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করুক এবং কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় থাকুক।
শ্রমিকদের একজন প্রতিনিধি বলেন, আমরা আমাদের ন্যায্য দাবির জন্য লড়াই করছি এবং কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের দাবিগুলো পূরণ না করে, তাহলে আমরা আবারো আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলন নতুন নয়। তবে এই আন্দোলনটি বেশ তীব্র রূপ নেয় এবং সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও শ্রমিকদের দাবি নিয়ে আলোচনার ফলাফল কী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।