সনদ জালিয়াতি: ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ৩ ছেলের সরকারি চাকরি
বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন- এমনকি গ্রামের নামরেও মিল নেই। শুধু নামের মিল থাকায় মুক্তিযোদ্ধা সেজেছেন কুদ্দুস। আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি হয়েছে তার তিন ছেলের। এদের দুইজন পুলিশ সদস্য ও একজন কারারক্ষী।
বগুড়ার সোনাতলার মধুপুর ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস। তিনি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ি ইউনিয়নের মেছট গ্রামের আব্দুল কুদ্দুসের সার্টিফিকেট চুরি করে তা নকলভাবে তৈরি করেন। পরে পর্যায়ক্রমে তার তিন ছেলেকে সরকারি চাকরিতে যোগদান করান। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে ছেলেদের এমন সুযোগ করে দিলেও নিজের জন্য মুুক্তিযোদ্ধার কোনো সুবিধা নেননি অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হননি তিনি।
দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে কুদ্দুসের নামে পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। আসল মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজতে একপর্যায়ে গাইবান্ধার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসের বাড়িতে পৌঁছে কথা হয় তার সঙ্গে। বের করেন তার মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত নথিপত্র। সেখানে দেখা যায় আব্দুল কুদ্দুসের বেসামরিক গেজেট ১১২৭ ও লাল মুক্তিবার্তা নম্বর- ০৩১৭০৫০৪২১।
.png)
তিনি বলেন, অনেক বছর আগের কথা। তখন হঠাৎ আমার বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে সোনাতলার ভুয়া কুদ্দুস। দূর সম্পের্কের আত্মীয়তাও রয়েছে তার সঙ্গে। মাঝে মাঝেই শুনতে চায় মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার নানা গল্প। কাগজপত্রও দেখতে চায়। সরল মনে আমিও দেখাই। তাদের বাড়িতেও গেছি অনেকবার। ওই সময় আমার মনে এসব নিয়ে কোনো ধারণা ও সন্দেহ ছিল না। কারণ, আমার সার্টিফিকেট নিয়ে অন্য কেউ কাজে লাগাতে পাড়বে; এমন চিন্তা আমি কখনোই করিনি। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পাই, আমার সার্টিফিকেট চুরি করে নিয়ে গিয়ে ওটা আবার নকল তৈরি করে তার তিন ছেলেকে চাকরি দিয়েছে।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কুদ্দুস দুঃখ করে বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আমার ছেলেদের চাকরি দিতে পারলাম না আর অন্য কেউ সার্টিফিকেট চুরি করে তিন ছেলের চাকরি দিল; এটা কেমন দেশ? এজন্যই কি আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম?
এ সময় তিনি নানা আক্ষেপ ও আবেগের কথা বলতে থাকেন। ওই সময় তার তিন ছেলেও উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, আমরা দুই ভাই জিয়াউল হক ও উজ্জল জমিতে কাজ করি। আর জাহাঙ্গীর নৌবাহিনীতে সিভিলে চাকরি করে। আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে হয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পাই না আর অন্যরা সার্টিফিকেট চুরি করলেও চাকরি হয়।
কথা হয় মেছট গ্রামের বেশকিছু মানুষের সঙ্গে। তারা বলেন, আমরাও শুনেছি যে, নকল সার্টিফিকেটে সোনাতলার কুদ্দুসের তিন ছেলেকে চাকরি দিয়েছে। ওদিকে ওনারা লাখ লাখ টাকা বেতন তুলে রাজকীয় জীবন যাপন করলেও এদিকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কুদ্দুস বেকার ছেলেদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুদ্দুসের তিন ছেলের মধ্যে মিনার কারারক্ষী হিসেবে কর্মরত আছেন কাসিমপুর কারাগারে। শরিফুল ও মাসুদ পুলিশ সদস্য হিসেবে রাজারবাগে কর্মরত আছেন। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তারা বিষয়গুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন।
কুদ্দুসের বাড়িতে গিয়ে এসব তথ্য জানতে চাইলে বলেন, এসব তথ্য নিতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। আপনাদের কাছে আছে কি? অন্যদিকে, কুদ্দুসের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামী হার্টের রোগী। আপনারা এ বিষয় নিয়ে বেশি চাপাচাপি করলে আমার স্বামীর যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু আপনাদের ছাড়ব না। এমনকি এসব তথ্য অনুসন্ধান করলে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন মিনারের ছোট ভাই ও ভুয়া কুদ্দুসের কনিষ্ট ছেলে।
মুঠোফোনে চাকুরে তিন ব্যক্তির সঙ্গে বহুবার কথা বলার চেষ্টা করলেও তাদের কাছে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং তারাই বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখায়। তবে কারারক্ষীতে কর্মরত মিনারের সঙ্গে ছাতিয়ানতলা বাড়িতেই দেখা হয়। এ সময় তিনি বলেন, আমি আরএফএলে চাকরি করি। কুদ্দুস আমার বাবা নয়। দু-চার কথা বলতে বলতে তিনি সটকে পরেন।
উল্লেখ্য, সোনাতলা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় দেখা যায় ছাতিয়ানতলা নামের ওই গ্রামে কোনো মুক্তিযোদ্ধাই নেই। অর্থাৎ একটি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা না থাকলেও কুদ্দুসসহ আরো কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা ভুয়া সার্টিফিকেটে চাকরি করে যাচ্ছে। প্রশ্ন থেকে যায়, নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পরেই কাউকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। তবে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই কেন সঠিকভাবে হলো না কিংবা তদন্ত ছাড়াই কীভাবে নিয়োগ প্রদান করা হলো এ প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই দ্রুত সময়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক- এমন দাবি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন মহলের।
সোনাতলা ইউএনও স্বীকৃতি প্রামাণিক বলেন, আমরা এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। তবে নির্দেশনা পেলেই এসবের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।