যৌথবাহিনীর ওপর ইসকন সমর্থকের হামলার প্রমাণ মিলেছে: পুলিশ
চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার হাজারি গলি এলাকায় যৌথবাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় ইসকন সমর্থকদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একইসঙ্গে এ ঘটনায় রাজনৈতিক মদদ রয়েছে কিনা তাও খাতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বুধবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নগর পুলিশের ডিসি (অপরাধ) রইছ উদ্দিন।
তিনি বলেন, ইসকনকে নিয়ে দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ওসমান আলী নামে একজনকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে- জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে এমন তথ্য পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় কোতোয়ালি থানা পুলিশ। যাওয়ার পর অবরুদ্ধ ওসমান আলীকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে উচ্ছৃঙ্খল জনতা। পরিস্থিতির অবনতি হলে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ এবং সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত হন। ওসমান আলীকে ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় উচ্ছৃঙ্খল জনতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ইটপাটকেল ও এসিড নিক্ষেপ করে। এতে আমাদের নয়জন সদস্য আহত হন। যার মধ্যে একজন এসিড দগ্ধ হয়েছেন।
ডিসি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে যাদের আটক করা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে- তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ইসকন সমর্থক। কয়েকজন মুসলিম থাকতে পারে। এটিও যাচাই-বাছাই চলছে।
গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তারা ‘জয় শ্রীরাম’ বলে স্লোগান দিয়েছে। আর ফেসবুকে যে মিথ্যা প্রচার-প্রচারণা করা হয়েছে, সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছি- ইসকন সমর্থকরাই জড়িত রয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। কোনো রাজনৈতিক মদদ রয়েছে কিনা সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। শান্ত নগরীকে যারা বিশৃঙ্খল করতে চায়, তাদের বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম চলমান। অস্থিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে যেন নাশকতা বা লুটতরাজ করতে না পারে, সেই কার্যক্রম আমাদের আগেও ছিল এখনো রয়েছে।
ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া ওসমান আলীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা- জানতে চাইলে ডিসি বলেন, ওসমান আলী বর্তমানে কাস্টডিতে আছে। ধর্মীয়ভাবে সংক্ষুব্ধ হয়েছে- এমন অভিযোগ কেউ দিলে ওসমান আলীর বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। বুধবার (৬ নভেম্বর) কোতোয়ালি থানা পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করে। এতে ৪৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয়ের আরো ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের এডিসি (জনসংযোগ) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর এসিড ও ইটপাটকেল দিয়ে হামলার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। ৪৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয়ের আরো ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে আসামি করে মামলাটি করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ৮২ জনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪৯ জনকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। বাকি ৩৩ জনকে যাচাই-বাছাই করে পরিবারের জিন্মায় দেওয়া হয়েছে।
যা ঘটেছিল সেখানে
যৌথবাহিনীর টাস্কফোর্স-৪ চট্টগ্রাম থেকে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ওসমান আলীর ইসকনবিরোধী একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে হাজারি গলি এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ জন দুষ্কৃতিকারী ওসমান আলী ও তার ভাইকে হত্যা এবং তাদের দোকান জ্বালিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে জড়ো হয়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের একাধিক দল সেখানে পৌঁছায়।
বিশৃঙ্খলাকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় জানমাল রক্ষা এবং মবজাস্টিস রোধে যৌথবাহিনী ওসমান আলী ও তার ভাইকে উদ্ধার করে। উত্তেজিত জনতাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়টি আশ্বস্ত করা সত্ত্বেও একপর্যায়ে উগ্র বিশৃঙ্খলাকারীরা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
দুর্বৃত্তরা এ সময় যৌথবাহিনীর ওপর অতর্কিতভাবে জুয়েলারির কাজে ব্যবহৃত এসিড হামলা চালায় এবং ভারী ইটপাটকেলসহ ভাঙা কাঁচের বোতল ছুঁড়তে শুরু করে। এতে পাঁচ সেনাসদস্যসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। আহত সেনাসদস্যরা বর্তমানে চট্টগ্রামে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনাস্থলে ইট ছুঁড়ে সেনাবাহিনীর একটি গাড়ির সামনের কাঁচ ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। উদ্ধার অভিযানের পর দুর্বৃত্ত শনাক্তকরণে যৌথবাহিনীর ১০টি টহল দল আনুমানিক ৯টার দিকে ঐ এলাকায় গেলে লুকিয়ে থাকা দুষ্কৃতিকারীরা ফের যৌথবাহিনীর ওপর এসিড সদৃশ ছুঁড়তে শুরু করে। এ সময় যৌথবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজনদের আটক করে।