ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

ভোগান্তি ছাড়াই মিলছে শিশুর জন্মসনদ, প্রশংসায় ভাসছে সরকার

রনি মিয়াজী, পঞ্চগড়
প্রকাশিত: ১৭:৩২, ১৭ নভেম্বর ২০২৪
ভোগান্তি ছাড়াই মিলছে শিশুর জন্মসনদ, প্রশংসায় ভাসছে সরকার
শূন্য থেকে ৪৫ দিন বয়সী শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে নির্ভুল জন্মসনদ

প্রথমবারের মতো দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় শূন্য থেকে ৪৫ দিন বয়সী শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে নির্ভুল জন্মসনদ। স্থানীয় ইপিআই টিকাকেন্দ্রে নির্ভুল নাম, বয়স, পিতা-মাতা ও ঠিকানার তথ্য দিয়ে জন্মসনদ তৈরির পর দেওয়া হচ্ছে টিকা। জন্মের পরপরই কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়াই সন্তানদের জন্মসনদ পাওয়ায় খুশি প্রত্যন্ত এলাকার অভিভাবকরা। সরকারের এমন উদ্যোগের ফলে সময়ের অপচয় ও ভোগান্তি লাঘব হচ্ছে বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা।

শিশু কিংবা বয়স্ক প্রতিটি মানুষের সবক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হলো জন্মসনদ। আর এই জন্মসনদের জন্য সাধারণ মানুষকে প্রায় সময় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কেউ নতুন জন্মসনদের জন্য আবেদন, কেউ হাতের লেখা সনদ আপডেট করতে, আবার কেউ কেউ নিজের কিংবা সন্তানদের নাম, জন্ম তারিখ, পিতা-মাতার নাম সংশোধনের জন্য আবেদন করে সেবা পেতে হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন৷ এতে সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ অপচয় হয়৷ তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের কষ্ট ও ভোগান্তির লাঘব করতে নতুন সিস্টেম চালু করেছে সরকার৷ সন্তানদের জন্য আর ইউনিয়ন পরিষদের গিয়ে জন্মসনদ তুলতে হচ্ছে না অভিভাবকদের।

গত বুধবার দুপুরে জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়নের ভূট্টুজোত পাঠানপাড়া এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ির পাশেই শিশুদের নিজ নিজ টিকাকেন্দ্রে জন্মসনদ তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগটি চালু করে প্রশাসন৷ এতে প্রথম দিনেই ২৭ জন নবজাতককে নির্ভুল জন্মসনদ তুলে দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

Advertisement

প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের মধ্যে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়নে প্রথমবারের মতো এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে৷ উপজেলার ও জেলার সব ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের স্ব-স্ব ইপিআই টিকাদানকেন্দ্রে ইউনিয়ন পরিষদের টিম গিয়ে তৈরি করে দিচ্ছে শূন্য থেকে ৪৫ দিন বয়সী শিশুদের নির্ভুল জন্মসনদ। পরে জন্মসনদ নিশ্চিত হলে দেওয়া হচ্ছে টিকা৷

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জন্মসনদ নিয়ে কমবেশি বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির মধ্যে পড়েন সাধারণ মানুষ৷ অসচেতনতার কারণে নামসহ বিভিন্ন তথ্য ভুলের কারণে সংশোধনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের যেতে হয় সাধারণ মানুষদের৷ এতে সময় ও অর্থ অপচয়সহ নানান ভোগান্তি পোহাতে হয়৷ এছাড়া সন্তানদের নামের বানান ভুল, জন্ম তারিখ বাড়ানো বা কমানো, বাবা-মায়ের নামের বানান ভুলসহ বিভিন্ন তথ্যের কারণে সনদ, চাকরি ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে বিভিন্ন ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই সন্তান জন্মের পরপরই নির্ভুল তথ্য দিয়ে জন্মসনদ তৈরি করে টিকা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার৷

টিকাদানের সময় টিকার কার্ডে শিশুদের নাম ভুল বা অনেকের নাম পরে রাখা হয়। জন্ম তারিখ কাটাকাটি করাসহ নামের বানান ভুলের কারণে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হয়৷ তাই ০-৪৫ দিন বয়সে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়৷ এই সময়ে শিশুদের টিকাদানের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম সনদ তৈরি করায় অনেক উপকৃত হবেন তারা৷

তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়নের পাঠানপাড়া এলাকার মুন্নি আক্তার বলেন, আমার ছেলের জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে বিনা টাকায় বাড়ির পাশে টিকাদানকেন্দ্রে এসে নির্ভুল জন্মসনদ হাতে পেলাম। এতে আমার অনেক উপকার হলো। নয়তো এই জন্মসনদের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারের কাছে বারবার ধরনা দিতে হতো। হতে হতো ভোগান্তির শিকার। আর এখানে টিকা দিতে এসে জন্মসনদ হাতে পেলাম আমার সন্তানের।

একই কথা বলেন ওই এলাকার আব্দুল করিম নামে আরেক অভিভাবক। তিনি বলেন, একটি জন্মসনদ নিতে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয় আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের। কাজকর্ম ফেলে পরিষদে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। অথচ সরকার বাড়ির পাশে টিকাদানকেন্দ্রে টিকা দিতে গেলেই এখন জন্মসনদ তুলে দিচ্ছে সন্তানদের। এতে আমরা অভিভাবকরা হয়রানি ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেলাম। সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।

উপজেলা ইপিআই ইনচার্জ জমির উদ্দিন বলেন, আমরা যারা স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছি, শূন্য থেকে ৪৫ দিন বয়সী শিশুদের টিকা দান করে থাকি কেন্দ্রগুলোতে। টিকাদানের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানের নাম টিকা কার্ডে এক নাম, পরে আরেক নাম রাখেন, টিকাদানের সময় আর পরে আরেক তথ্য দিয়ে তারা জন্মসনদ তোলেন। নামের বানান, জন্ম তারিখ ও বাবা-মায়ের নামের বানান অনেক সময় ভুল হয়ে যায়। আর এই সংশোধনের জন্য অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয় অভিভাবকদের। অনেক সময় আমাদেরকেও দোষারোপ করেন তারা। আর এখন সন্তান জন্মগ্রহণের পরপরই টিকাদানের পূর্বেই তার নির্ভুল জন্মসনদ নিশ্চিত করার ফলে অনেক উপকৃত হচ্ছেন অভিভাবকরা। এখন আর কোথাও তাদের যেতে হবে না।

দেবনগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সলেমান আলী বলেন, জন্মসনদের কারণে জনপ্রতিনিধিদের অনেক ঝামেলায় পড়তে হয়৷ শিশুর জন্মের পরপরই নির্ভুল জন্মসনদ নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করায় উপকৃত হবেন জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ।

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি জানান, সরকারের এমন উদ্যোগে শিশুদের সব তথ্য নির্ভুল হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনো ঝামেলা বা ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। আমরা পর্যায়ক্রমে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে এই সেবা পৌঁছে দেব৷

পঞ্চগড় জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আনু মো. সানাউল্লাহ নূরী বলেন, আমাদের কর্মীরা প্রতিটি ওয়ার্ডের টিকাদান কেন্দ্রে ০-৪৫ দিন বয়সী শিশুদের টিকা প্রদান করেন৷ আমরা শিশুদের টিকাদানের সময় একটি কার্ড দেই, সেখানে অভিভাকরা তাদের সন্তানদের নাম, বয়স দেন এক, জন্মসনদ করতে গিয়ে দেন আরেক। এমন তথ্যের সমস্যার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয় অভিভাবকদের। তাই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টিকাদানের আগেই শিশুর নির্ভুল জন্ম নিশ্চিত করে টিকা প্রদান করা হচ্ছে। এতে সবাই উপকৃত হচ্ছে।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবেত আলী বলেন, ৬৪ জেলার মধ্যে শূন্য থেকে ৪৫ দিন বয়সী শিশুদের টিকাদানের সঙ্গে সঙ্গে নির্ভুল জন্মসনদ তৈরির সেবাটি পরীক্ষামূলকভাবে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার দেবনগড় ইউনিয়নে চালু হয়েছে৷ এতে উপকার পাচ্ছেন অভিভাবকরা। পর্যায়ক্রমে সব ইউনিয়ন ও উপজেলায় চালু হবে সেবাটি৷ এতে সময় ও ভোগান্তি হ্রাস পাবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!